নিভৃতে বৈশ্বিক ফুটবলীয় সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনছেন নারীরা

আহমেদ শারজিন শরীফ। গ্রাফিকস- আগামীর সময়
টেলিভিশন, মুঠোফোন কিংবা কম্পিউটার স্ক্রিনে ঝুঁকে সবাই এখন একটাই খোঁজ রাখছেন- ফিফা বিশ্বকাপের আপডেট। স্ক্রিন ছোট হোক বা বড়, আগ্রহের কমতি নেই ফুটবলভক্তদের। বল পায়ে স্ট্রাইকার যখন ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করে শ্যুট করেন তখন সমস্বরে চিৎকার ভেসে আসে এঘর থেকে ওঘরে। সুযোগ থাকলে ছাদে বা খোলা জায়গায় অনেকে জড়ো হন খেলা দেখতে। প্রিয় দলের সমর্থনে তারা কেবল গলাই ফাটান না, গায়ে জড়ান জার্সিও।
জার্সিগুলোতে আজকাল নানান কারুকার্য করেন ভক্ত-সমর্থকরা। এই কারিকুরির প্রচলিত নাম ‘জার্সি কাস্টমাইজেশন’। এক্ষেত্রে নারী দর্শকেরাই অনেকটা এগিয়ে। রাত জেগে বিশ্ববিদ্যালয় হলের টিভিরুমে তারা যেমন খেলা দেখেন, তেমনি তুখোড় আলোচনা-সমালোচনা করেন মিডফিল্ড ট্রান্সজিশন কিংবা রেফারিদের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে।
ফুটবল নিয়ে নারীদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা আজকাল বিরল কোনো ব্যাপার নয়। বহুদিন পর্যন্ত ফুটবলের দর্শক, বোদ্ধা, সমালোচক সবকিছুতে এককভাবে ছিল পুরুষদের বিচরণ। এক্ষেত্রে মেয়েরা এতদিন ছিলেন ধৈর্যশীল মা, উৎসুক বোন, সান্ত্বনার প্রিয়জন অথবা খুব বেশি হলে সবার সঙ্গে বসে থাকা এক সাধারণ দর্শক। তবে ভেঙে গেছে সেই পুরোনো প্রথা। মেয়েরা এখন কেবল ফুটবলীয় সংস্কৃতির অংশীজনই নন; অন্যতম চালিকাশক্তিও বটে।
আধুনিক ফুটবলীয় সংস্কৃতির বিবর্তনের ধারা ডিজিটাল বিশ্বের সঙ্গে জড়িত ওতপ্রোতভাবে। একসময় বাড়িতে থাকা একমাত্র টেলিভিশন সেটটি খেলার সময় চলে যেত পুরুষদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু এখন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া নারী শিক্ষার্থীরা ল্যাপটপ কিংবা স্মার্টফোনে ফুটবল দেখতে পারেন ইচ্ছেমতো। ম্যাচের আগে-পরে খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ দেখতেও বাধা নেই কোনো। এভাবে অনেক নারী দর্শকই ধীরে ধীরে ফর্মেশন বুঝতে শিখছেন, জেনে নিচ্ছেন টেম্পো কন্ট্রোলার কিংবা ডেস্ট্রয়ারের ভূমিকা। ফলে তাদের কাছে খেলা হয়ে উঠছে আরও উপভোগ্য।
অনেকের ধারণা নারীরা খেলা নয়, তারকা খেলোয়াড়দের দর্শক। এমন দাবি ধোপে টেকে না যখন- ইউটিউব, ফেসবুক কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় ম্যাচের সম্ভাব্য গোল, গেগেন প্রেসিং আর অফসাইড ফাঁদের মতো জটিল বিষয়গুলোতে সুচিন্তিত মতামত আসে নারীদের কাছ থেকে। খেলা বুঝতে কি কারও অনুমতির প্রয়োজন আছে? মনে হয় না। আবার প্রযুক্তির এই যুগে সমস্ত জটিল নিয়ম-কানুন শিখে নিতেও দ্বারস্থ হতে হয় না কারও। ফলে মেয়েরা এখন বুঝেশুনেই খেলা দেখছেন।
দ্বিতীয় সারির দর্শক থেকে বোদ্ধার আসনে উঠে এসে মেয়েরা প্রমাণ করেছেন বিশ্বময় ফুটবলকেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন আসছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে আসর জমিয়ে প্রোজেক্টরে খেলা দেখতে বসেন ছেলেরা, ওদিকে ঘরের ভেতরে বসে মেয়েরা চুপিসারে বৈশ্বিক প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে হচ্ছেন সমৃদ্ধ। প্রথাগত জনপরিসর তাদের সাইডলাইনে ঠেলেছে। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে নিয়েছেন এই বৈশ্বিক সংস্কৃতিতে।
দর্শকসারি থেকে উঠে এসে মেয়েরা এখন ফুটবল খেলার গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। দশ বছর আগেও সম্প্রচারমাধ্যমের খেলাধুলা বিভাগে দেখা যেত কেবল পুরুষ কর্মীদেরই। কিন্তু কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের আধিপত্যের যুগে পাল্টে যাচ্ছে সব হিসেব। আজকাল নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বহু কন্টেন্ট ক্রিয়েটর খেলাধুলার ট্যাকটিক্যাল অ্যানালাইসিস করেন। ম্যাচ উপলক্ষে বিশেষ ভ্লগ বানান। তাদের কন্টেন্ট দেখেন লাখ লাখ মানুষ। প্রশংসা যেমন কুড়ান, আগ্রাসী কটূক্তিও সহ্য করেন তারা।
পরিবর্তনের স্রোত সমানভাবে আছড়ে পড়েছে মূলধারার সাংবাদিকতায়ও। ফক্স স্পোর্টস থেকে শুরু করে দেশের সম্প্রচারমাধ্যমগুলোকেও ভাবতে হচ্ছে নতুন করে। দেশের বড় বড় টেলিভিশন চ্যানেলের স্পোর্টস শো-তে এখন বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়মিত কথা বলেন নারীরা। ক্রীড়া সাংবাদিকতা, বিশ্লেষণ, অনুসন্ধান কোথায় নেই তারা? নারী ধারাভাষ্যকাররা এক নিঃশ্বাসে বলে যান আন্দ্রে রাবিও থেকে ডুয়ে হয়ে বাড়ানো পাসে এম্বাপের বিদ্যুৎগতির ফিনিশিংয়ের বর্ণনা। অচিরেই তাদেরই কেউ পিটার ড্রুরির মতো কাব্যকথা করবেন, এ বিশ্বাস রাখাই যায়।
দর্শকসারি থেকে প্রচারমাধ্যম পর্যন্ত পরিবর্তনের এই বৈশ্বিক ধারায় প্রধান অনুঘটক নারীদের জন্য আয়োজিত টুর্নামেন্টগুলো। ফিফা নারী বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে ইংলিশ উইমেন্স সুপার লিগে সময়ের ধীরগতিতে হলেও দর্শকসংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে সম্প্রচার ও বিজ্ঞাপনসত্ত্বের মূল্য।
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের মেয়েদের জয় পুরো দেশকে ভাসিয়েছে এক অভূতপূর্ব আনন্দের বন্যায়। ঋতুপর্ণা-সাবিনাদের অভিনন্দন জানাতে বহু মানুষ ছুটে গিয়েছেন বিমানবন্দরে। ছাদখোলা বাসে বিজয়ীর বেশে পুরো রাজধানী ঘুরে মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন বাঘিনীরা। এই বিজয়ের পর দেশবাসী জেনেছে একেকজন খেলোয়াড়ের অসামান্য জীবনসংগ্রামের কাহিনি। তাদের অদম্য মনোবল বৃষ্টির মতো ঝরে প্রেরণা যুগিয়েছে অসংখ্য মেয়েকে। মারিয়া মান্দার স্ট্রাইক আজ নিঃসন্দেহে বহু মেয়ের প্রাণে সঞ্চার করে সাহসের।
মেয়েদের ফুটবলের প্রসার খেলাধুলার জগতে এক অভূতপূর্ব উন্নতির লক্ষণ। প্রথাগতভাবে অনেক দেশেই নারী খেলোয়াড়দের বেতন, চিকিৎসা এবং সম্মানের মতো মৌলিক অধিকারগুলো নিয়ে লড়তে হয়। এসব কারণে ফুটবলের মতো জননন্দিত আয়োজনে খেলোয়াড় কিংবা বোদ্ধা অথবা ধারাভাষ্যকার- যে ভূমিকাতেই হোক মেয়েদের এই ব্যাপক অংশগ্রহণ আশাব্যঞ্জক।
এত আশার ভিড়ে হতাশারা কিন্তু উঁকি দিতে ভোলেনি আজও। বিংশ শতাব্দীতেও ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশে মেয়েরা অনুমতি পেতেন না অফিসিয়াল পিচে অনুশীলনের। সেই ধারাবাহিকতায় ফুটবলের বৈশ্বিক সংস্কৃতিতে নারীদের অংশগ্রহণ আজও কণ্টকময়। অনলাইনে তেড়ে আসা তীর্যক মন্তব্য যেমন পোড়ায়, তৃণমূল স্তরে পর্যাপ্ত সুবিধার অভাব তাদের অগ্রগতিকে থামিয়ে দেয়। এ যেন দূরে ঠেলে রাখার সেই পুরোনো রীতির পুনর্জন্ম।
সময়ের পরিবর্তনে আজ মেয়েরা নিয়মতান্ত্রিক বেড়াজাল থেকে অনেকখানি মুক্ত। তবে সমাজের ভ্রুকুটি পুরোপুরি পিছু ছাড়েনি। পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় নারী সাংবাদিকরা অনলাইনে বেশি হেনস্তার শিকার। নারী দর্শকদের প্রমাণ করতে হয়, তারা আসলেই খেলা বোঝেন! কোনো পুরুষ ভক্ত পুরোনো পরিসংখ্যান ভুলে গেলে অসুবিধা নেই, কিন্তু প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে রোনালদিনহোর নারী ভক্তকে বলতেই হবে- এল মায়েস্ত্রো কবে প্রথম গোলটি করেছিলেন! তবে আজকাল এসব বাধা আর আক্রমণকে পাত্তা না দিয়ে মেয়েরা বেছে নিচ্ছেন প্রিয় দল। পছন্দের খেলোয়াড় উইঙ্গার নাকি ফুলব্যাক সে খবর তারা ভালোই জানেন।
আমাদের নতুন প্রজন্মের অনেক মা-ই রূপকথা যতটা জানেন, তার চেয়েও হয়ত বেশি জানেন কিলিয়ান এম্বাপে নামে অদম্য গতিতে ছুটে চলা এক স্ট্রাইকারের গল্প। হয়তো এই বিশ্বকাপের আসরে মায়ের কোলে বসে বহু শিশু শিখবে ডিফেন্ডার, মিডফিল্ডার আর ফরোয়ার্ডদের ভূমিকা। ফুটবলীয় সংস্কৃতিতে মেয়েরা নিভৃতে যে পরিবর্তনটা আনছেন তা হয়তো কোনো ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে না। চিরভাস্বর হয়ে বইবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
লেখক: সাংবাদিক ও লেখক
ইমেইল-sharjin.2015@gmail.com




