অপারেশন ইন্টারকন্টিনেন্টাল: যে রাতে কেঁপেছিল ঢাকার বুক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
৯ই জুন, ১৯৭১। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের জন্য দিনটি ছিল ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকায় আসবে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দল, সঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) প্রধান প্রিন্স সাদরুদ্দিন আগা খান। উদ্দেশ্য—পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি স্বাভাবিক কি-না তা যাচাই। সব ঠিক থাকলে পাকিস্তানকে বিপুল অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দেবে বিশ্বব্যাংক। আর সেই টাকায় অস্ত্র কিনে বাঙালি নিধনে নামবে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। যে ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু ছিল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, যা তখন জাতিসংঘ ঘোষিত নিরাপদ এলাকা। কিন্তু প্রতিবেশী দেশ ভারতের মেলাঘরে বসে একদল অদম্য তরুণ পণ করেছিলেন ইন্টারকন্টিনেন্টালের নিরেট নিরাপত্তার দেয়াল ভেঙে ইতিহাস ওলটপালট করে দেওয়ার।
আগরতলা থেকে ৫০ কিলোমিটার আর বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ১১ কিলোমিটার দূরের ২ নম্বর সেক্টরের সদর দপ্তর মেলাঘর ক্যাম্প। জুনের কাদা-পানিতে ঘেরা সেই দুর্গম ক্যাম্পেই চলছিল ঢাকার প্রগতিশীল, উদার ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাধারায় বিশ্বাসী একদল তরুণের কমান্ডো ট্রেনিং। সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ ও ক্যাপ্টেন এটিএম হায়দারের মূল দীক্ষা ছিল- ‘হিট অ্যান্ড রান’।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদের আগমন আটকাতে মেজর খালেদ ডাকলেন হাবিবুল আলমকে (বীর প্রতীক)। নির্দেশ দিলেন ১৭ জনের একটি গেরিলা দল প্রস্তুতের। যে তালিকায় স্থান পেলেন ঢাকারই একঝাঁক দুঃসাহসী তরুণ। তারা হলেন- আলী আহমেদ জিয়াউদ্দীন, মাহবুব আহমাদ (শহীদ), শ্যামল, ভাষণ (নাট্যকার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর ছেলে), ফতেহ আলী চৌধুরী, আবু সাইদ খান, আনোয়ার রহমান (আনু), মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী (মায়া), ইঞ্জিনিয়ার সিরাজ, গোলাম দস্তগীর গাজী, তারেক এম আর চৌধুরী, নজিবুল হক, রেজা (ধানমন্ডি), আব্দুস সামাদ (আড়াইহাজার), জব্বার (রুপগঞ্জ), ইফতেখার এবং হাবিবুল আলম নিজে। ক্যাপ্টেন হায়দার ও শহীদুল হক খান বাদল অপারেশন সম্পর্কে গেরিলাদের দিলেন সবকিছু বুঝিয়ে। তাদের হাতে তুলে দেওয়া হলো গাঢ় কালচে বাদামি রঙের মাত্র ১২টি ‘পাইনঅ্যাপেল’ হ্যান্ড গ্রেনেড, একটি করে বেয়োনেট আর পাকিস্তানি ১৬০ টাকা। লক্ষ্য- প্রতিনিধি দলকে বোঝানো, শান্ত নেই ঢাকা।
গাড়ি ছিনতাইয়ে নাটকীয়তা
৩ জুন মেলাঘর থেকে রওনা হয়ে নানা পথ পেরিয়ে ঢাকায় পৌঁছাল দলটি। কখনো নৌকা, কখনো ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে আবার কখনোবা বিরানভূমি পায়ে হেঁটে গেরিলারা ঢোকে ঢাকায়। বসে অপারেশনের পরিকল্পনায়। প্রাথমিকভাবে জিয়া, মায়া, স্বপন, ভাষণ, হাবিবুল আলম এবং ভাষণের মামা মুনির আলম মির্জাকে (বাদল) নির্বাচন করা হয় অপারেশনের জন্য। স্বপন আগেই জানিয়েছেন, তার কাছে একটা পিস্তল আছে কাভারিং ফায়ার দেওয়ার জন্য। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী অপারেশনের জন্য প্রয়োজন একটি গাড়ি। ৭ জুন থেকেই গুলশান গোলচত্বর এলাকায় গাড়ি ছিনতাইয়ের চেষ্টা শুরু করেন তারা। কিন্তু বাধ সাধলেন সহযোদ্ধা ভাষণ! তিনি ঢাকায় এত বেশি পরিচিত যে, প্রথম দুই দিন যে গাড়িই তারা টার্গেট করেন, দেখা যায় ভেতরে বসে আছেন ভাষণের কোনো না কোনো আত্মীয়, শিক্ষক কিংবা বাবার সহকর্মী।
বিরক্ত হয়ে আস্তানায় ফিরে জিয়াউদ্দীন ঝাড়লেন ক্ষোভ, ‘ঢাকা শহরে এত আত্মীয় যার, ওরে যুদ্ধে পাঠাইছে কে?’ মায়া সিদ্ধান্ত নিলেন, মূল অপারেশনে রাখা যাবে না ভাষণকে অবশেষে ৯ জুন বিকেলে ভাষণের অনুপস্থিতিতে একটি নীল ডাটসান ১০০০ গাড়ি সফলভাবে হাইজ্যাক করলেন গেরিলারা।
৯ জুন সন্ধ্যা। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসলেন বাদল। পাশে পিস্তল হাতে কভার দেওয়ার জন্য স্বপন। পেছনে তিনটি করে গ্রেনেড নিয়ে বসা মায়া, জিয়া ও হাবিবুল আলম। প্রেসিডেন্ট ভবন (বর্তমান সুগন্ধা) পেরিয়ে গাড়ি ধীরগতিতে ঢুকল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সীমানা দেয়ালে। আর ঠিক তখনই সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের প্রটোকলসহ বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দলের গাড়ি বহর ঢুকছিল হোটেলে। এরই মধ্যে সাদা ডাটসান থেকে বেরিয়ে নিঃশব্দে চার মুক্তিযোদ্ধা হেঁটে এসে দাঁড়িয়েছেন পেছনের ছোট গেটটির কাছে, কেউ কিছু ঠাউরই করে উঠতে পারেননি। এই চার যুবকের নাম আলম, মায়া, জিয়া ও স্বপন। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসে ছিলেন বাদল।
টুপি পরা বিহারী ও পাকিস্তানপন্থী দালালদের ভিড় তখন হোটেলের গেটে। পাকিস্তান জিন্দাবাদ সুর তুলে দিচ্ছিল স্বাগতিক স্লোগান। কেউ টেরই পায়নি গেরিলাদের গাড়ি এসে থেমেছে পাশেই। স্বপন গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালেন একটু দূরে। শার্টের নিচে পিস্তলের বাঁটে হাত রেখে অপেক্ষা। বিপদের আভাস পেলেই দ্রুত ট্রিগার দেবেন চেপে। যুদ্ধের ভাষায় যাকে বলে কাভার দেওয়া। প্রতিনিধি দলের গাড়ি থামতেই চোখের পলকে পিন খুলে প্রথম গ্রেনেড ছুড়লেন জিয়া। বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হলো তা। উল্টে গেল প্রতিনিধি দলের একটি শেভ্রোলেট গাড়ি। এরপর মায়া ও আলম পর পর আরও দুটি গ্রেনেড ছুড়লেন রিভলভিং দরজার সামনে। দালালরা জুতো-টুপি ফেলে পালাল দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে। পাহারারত পাকিস্তানি সেনারা পজিশন নেওয়ার আগেই জিয়া চতুর্থ গ্রেনেডটি ছুড়লেন উল্টে যাওয়া গাড়ির ভেতরে। ধোঁয়া আর বারুদের গন্ধে ইন্টারকন্টিনেন্টাল যেনো পরিণত হলো নরককুণ্ডে। অন্যদিকে চার সহযোদ্ধা গাড়িতে উঠতে না উঠতেই এক্সিলেটরে পা দাবিয়ে গাড়ি টান দিলেন বাদল।
এক রাতে তিন আঘাত
ইন্টারকন্টিনেন্টালের মিশন সফল করেই বাদল ঝড়ের গতিতে গাড়ি ছোটালেন মিন্টো রোড হয়ে বেইলি রোডের দিকে। কিন্তু গেরিলাদের ক্ষুধা মেটেনি তখনও। দৈনিক ‘মর্নিং নিউজ’ পাকিস্তান সরকারের প্রধান দালালি পত্রিকা, প্রোপাগণ্ডা মেশিন। চলন্ত গাড়ি থেকে হাবিবুল আলম দুটি গ্রেনেড ছুড়ে মারলেন পত্রিকাটির অফিসের বাউন্ডারির ভেতর। বিকট শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ।
সেখান থেকে গাড়ি ছুটল মগবাজারের দিকে। লক্ষ্য- বাঙালি গণহত্যার অন্যতম চক্রান্তকারী, জামায়াতে ইসলামীর আমির গোলাম আজমের বাড়ি। মায়া নিখুঁত নিশানায় পর পর দুটি গ্রেনেড ছুড়লেন গোলাম আজমের ঘরের দোতলায়। গ্রেনেড ফাটলেও সেদিন ভাগ্য ভালো যে গোলাম আজম ছিলেন না বাড়িতে। এরপর নিমিষেই ঢাকার অন্ধকার অলিগলিতে ভূতের মতো মিলিয়ে গেল গেরিলাদের গাড়ি।
জন্ম হলো ‘ক্র্যাক প্লাটুন’-এর
পরদিন বিশ্বজুড়ে তোলপাড়। বিবিসি ও অল ইন্ডিয়া রেডিওতে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে প্রকাশ হলো ঢাকার সুরক্ষিত জোনে গেরিলা হামলার খবর। বিশ্বব্যাংক ও ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি দল স্তম্ভিত হয়ে তড়িঘড়ি করে ছাড়ল ঢাকা। পাকিস্তানের ঋণের গুড়ে পড়ল বালি।
এই দুঃসাহসিক অভিযানের খবর শুনে মেলাঘর ক্যাম্পে বসে সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ আনন্দের আতিশয্যে, কপট রাগ দেখিয়ে বলে উঠলেন, ‘দিজ অল আর ক্র্যাক পিপল!’ (এরা সবাই পাগল!)। কমান্ডারের সেই মন্তব্য থেকেই ইতিহাসের পাতায় চিরতরে খোদাই হয়ে গেল এই আরবান গেরিলা দলটির নাম- ‘ক্র্যাক প্লাটুন’। আর ঢাকার বুকে শুরু হলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিনিদ্র রজনী। ক্র্যাক প্লাটুনের একের পর এক সফল অপারেশন ও চোরাগোপ্তা হামলায় ভয়ে এক পর্যায়ে সন্ধ্যার পর টহল পর্যন্ত বন্ধ করে দেয় পাকিস্তানি হানাদাররা।
কৃতজ্ঞতা
ব্রেইভ অফ হার্ট– হাবিবুল আলম, বীরপ্রতীক; বারে বারে ফিরে যাই- ডা. মেজর আখতার, বীরপ্রতীক ও আলতাফ- অমিত গোস্বামী।




