আগামীর সময়

গুরুত্বপূর্ণ রাডার বিমান ধ্বংসে বড় সংকটে যুক্তরাষ্ট্র

গুরুত্বপূর্ণ রাডার বিমান ধ্বংসে বড় সংকটে যুক্তরাষ্ট্র

সংগৃহীত ছবি

ইরানের হামলায় সৌদি আরবের একটি ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর ই-৩ সেন্ট্রি বিমান ধ্বংস হওয়ায় দূর থেকে আসা হুমকি শনাক্ত করার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

সিএনএন যাচাই করা ছবিতে দেখা গেছে, প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে থাকা বিমানটির  পেছনের অংশ ভেঙে গেছে এবং এর এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঘূর্ণায়মান রাডার ডোম মাটিতে পড়ে রয়েছে।

সিএনএনের সামরিক বিশ্লেষক ও সাবেক মার্কিন বিমান বাহিনীর কর্নেল সেড্রিক লেইটন জানান, এই এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম হারানো যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি সক্ষমতার জন্য ‘গুরুতর আঘাত’।

তার মতে, এটি যুদ্ধবিমান নিয়ন্ত্রণ, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং শত্রুপক্ষের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র থেকে সেগুলোকে সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেমের বিমান আকাশে থেকে মাটি থেকে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার পর্যন্ত প্রায় এক লাখ ২০ হাজার বর্গমাইল এলাকা নজরদারি করতে সক্ষম এবং এটি বহু দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৭টি ই-৩ বিমানের বহর এবং এগুলোর দীর্ঘদিনের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের বড় সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হয়।

সপ্তাহান্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধ্বংস হওয়া বিমানের ছবি ছড়িয়ে পড়ে। সিএনএন ১১ মার্চের একটি স্যাটেলাইট ছবির সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত করে যে বিমানটি একই স্থানে ছিল।

এর আগে সিএনএন জানিয়েছিল, ওই ঘাঁটিতে হামলায় অন্তত ১০ জন মার্কিন সেনা আহত হন, তবে কেউ নিহত হননি। একটি মার্কিন ট্যাংকার বিমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

ই-৩ বিমান শুধু নজরদারি প্ল্যাটফর্ম নয়, এটি একটি শক্তিশালী আকাশভিত্তিক কমান্ড সেন্টারও। এটি একসঙ্গে বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, বড় ড্রোন এমনকি ট্যাংকের মতো প্রায় ৬০০টি লক্ষ্যবস্তু ট্র্যাক করতে পারে।

এই বিমানে থাকা সদস্যরা এসব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে কমান্ডারদের, সমুদ্রের জাহাজে বা পেন্টাগনে পাঠাতে পারেন। একই সঙ্গে তারা প্রতিরক্ষামূলক ফাইটার জেটকে নির্দেশনা দিতে বা স্থলবাহিনীকে সহায়তার জন্য আক্রমণাত্মক বিমান পাঠাতে পারেন।

এক প্রতিবেদনে এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেমকে যুদ্ধক্ষেত্রের ‘কোয়ার্টারব্যাক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—যা তাৎক্ষণিক সমন্বয় ও পরিস্থিতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়।

গ্রিফিথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের গবেষক ও সাবেক অস্ট্রেলিয়ান বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা পিটার লেইটন জানান,  এটি আকাশভিত্তিক রাডার হুমকি শনাক্তের সময় অনেক বাড়িয়ে দেয়।

বর্তমান সংঘাতে একটি ই-৩ বিমান ২০০ মাইল দূর থেকে আসা একটি শাহেদ ড্রোনকে ভূমিভিত্তিক রাডারের তুলনায় প্রায় ৮৫ মিনিট আগেই শনাক্ত করতে পারে।

নিরাপত্তা ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন

বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, কীভাবে এই বিমানটি হামলার ঝুঁকিতে পড়ল।

লেইটন জানান, সাধারণত এই ধরনের বিমানকে সুরক্ষিত রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়—যেমন ফাইটার জেটের পাহারা দেওয়া এবং শত্রু এলাকায় না পাঠানো। তাই মাটিতে থাকা অবস্থায় এটি ধ্বংস হওয়া ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের ব্যর্থতা’।

তিনি আরও জানান, ইরান সম্ভবত লক্ষ্য নির্ধারণে বাইরের সহায়তা পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সীমিত সক্ষমতা ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন করে হামলা চালাচ্ছে।

পুরনো ও সীমিত বহর

মার্কিন বাহিনীতে এই ধরনের বিমান মাত্র ১৭টি রয়েছে এবং এগুলোর বেশিরভাগই পুরনো, প্রথমটি ১৯৭৮ সালে যুক্ত হয়েছিল। ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩২।

এই চার ইঞ্জিনের বিমানে সাধারণত ৪ জন ফ্লাইট ক্রু এবং ১৩ থেকে ১৯ জন মিশন বিশেষজ্ঞ থাকেন।

যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও সৌদি আরব, ফ্রান্স ও চিলি এই বিমান ব্যবহার করে, আর ন্যাটোর নিজস্ব ১৪টি এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এই পুরনো বহরের বিকল্প খুঁজছে, তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষতি শুধু একটি বিমান হারানো নয়—বরং যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার ওপর বড় আঘাত।

    শেয়ার করুন: