আগামীর সময়

আন্তর্জাতিক শিশু পাঠ্য দিবস

ভুল তথ্যের বেড়াজালে শৈশব, মানসম্মত পাঠের সংকট

  • পাতায় পাতায় গুগল ট্রান্সলেটের বৈজ্ঞানিক বিভ্রাট
  • জেন্ডার স্টেরিওটাইপ ও সাংস্কৃতিক অসংগতি
  • কারিগরি ও কাগজের নিম্নমান
  • বিভ্রান্তির রাজ্যে পিছিয়ে নেই বাংলা একাডেমিও
  • ‘বানান সমতা বিধান’ কমিটি গঠন একাডেমির
ভুল তথ্যের বেড়াজালে শৈশব, মানসম্মত পাঠের সংকট

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়

ভুলভাল তথ্য, বানানে অমার্জনীয় ভুল, যতি বা বিরাম চিহ্নের অপব্যবহার, অসম্পূর্ণ বাক্য, পাতায় পাতায় গুগল ট্রান্সলেটের বৈজ্ঞানিক বিভ্রাটের ছাপ, সূচিপত্রে লেখার শিরোনাম আছে তো, ভেতরে নেই সেই লেখা। পাশাপাশি কারিগরি ও কাগজের নিম্নমান। এমনই দশা দেশের বাজারে থাকা অধিকাংশ শিশু পাঠ্যের। এমনকি শিশুদের পাঠ্যবইয়ে পড়েছে রাজনীতির ছায়া, রয়েছে ঐতিহাসিক বিভ্রান্তিও। এমন প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়েই আজ ২ এপ্রিল পার হলো আন্তর্জাতিক শিশু পাঠ্য দিবস। দিবসটি পালিত হচ্ছে বিশ্বজুড়েই। ১৯৬৭ সাল থেকে বিখ্যাত ডেনিশ লেখক হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখতে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। শিশুদের বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং মানসম্মত শিশুসাহিত্য প্রসারের লক্ষ্য নিয়ে দিবসটি পালিত হলেও, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আমাদের দেশের শিশুতোষ বই—তা সে পাঠ্যবই হোক কিংবা মেলার দোকানে থাকা গল্পের বই—সবখানেই তথ্যের নির্ভুলতা এবং উপস্থাপনার মান নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

বানানের ‘অমার্জনীয়’ ভুল ও প্রুফ রিডিংয়ের অভাব

শিশুতোষ সাহিত্যের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে বানান ভুল। অমর একুশে বইমেলা বা সাধারণ বাজারে পাওয়া শিশুতোষ বইগুলোয় ‘খরগোশ’ হয়ে যাচ্ছে ‘খরগোস’, ‘চড়ুই’ হচ্ছে ‘চড়ই’। শুধু তাই নয়, বাক্যের গঠনগত অসামঞ্জস্য এবং অযাচিত বিরাম চিহ্নের ব্যবহারে অনেক বই-ই এখন পড়ার অযোগ্য। অভিযোগ রয়েছে, দ্রুত বই বাজারজাত করার প্রতিযোগিতায় প্রুফ রিডিংয়ের ধাপটিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হচ্ছে।

অনুসরণ করা হচ্ছে না প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম। আবার একই বইয়ের একেক জায়গায় একেক রকম বানান, (যেমন : ‘পাখি’ কোথাও ‘পাখী’) থাকার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। বাংলায় অনুবাদ করা উইলিয়াম শেকসপিয়ারের ‘মারচেন্ট অব ভেনিস’-এর চরিত্র ‘পোর্শিয়া’কে বইয়ে ‘পোর্টিয়া’ উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করলেন এক অভিভাবক। ‘প্রায় বইয়েরই প্রচ্ছদ খুব ভালো, প্রিন্টও খুব ভালো। কিন্তু ভেতরের বানানগুলো ভুলে ভরা। বানান ভুলের কারণে আমি দুই পাতাও পড়তে পারি না।’ খেদোক্তি এই অভিভাবকের।

পাঠ্যবইয়ে রাজনীতির ছায়া ও ঐতিহাসিক বিভ্রান্তি

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রণীত পাঠ্যবইগুলোতেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের তথ্য বদলে যাওয়ার একটি নেতিবাচক ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে। শিক্ষাবিদদের মতে, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষণা বা বিশেষ ব্যক্তিদের অবদান-সংক্রান্ত তথ্য বিকৃত বা অতিরঞ্জিত করায় শিশুদের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। প্রকৃত দালিলিক প্রমাণের চেয়ে রাজনৈতিক ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়ায় শিক্ষার মৌলিক ভিত্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অস্বাভাবিক ছবি

শিশুদের বইয়ে এমন কিছু ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, যা বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। শিশুদের পাঠ্যবই বা বোর্ড বইয়ে অস্বাভাবিক বা বিতর্কিত ছবি ব্যবহারের পেছনে মূলত অদক্ষ চিত্রশিল্পী নিয়োগ, তদারকির অভাব এবং ব্যয় সংকোচনের মতো কারণগুলো প্রধান হিসেবে দায়ী করা হয়। বিভিন্ন পশুপাখির ছবি থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক ছবিগুলো বাস্তবের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় না। এনসিটিবি অনেক সময় নামমাত্র সম্মানীর বিনিময়ে অদক্ষ বা আনাড়ি শিল্পীদের দিয়ে বইয়ের অলংকরণ করায়। ফলে ছবির মান অত্যন্ত নিম্নমানের এবং বাস্তবতার সঙ্গে অমিল তৈরি হয়।

ভুলভাল তথ্য

বিভিন্ন ভুল তথ্যের পাশাপাশি সাল, তারিখ, স্থানের নাম, চরিত্রের নাম ইত্যাদি ভুলও পাওয়া যাচ্ছে শিশুদের বইয়ে।

প্রযুক্তির অপব্যবহার : গুগল ট্রান্সলেটের বৈজ্ঞানিক বিভ্রাট

অষ্টম ও নবম শ্রেণির বিজ্ঞানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের বইগুলোয় বিদেশি ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি ‘গুগল ট্রান্সলেট’ করে তথ্য বসিয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে অনেক বৈজ্ঞানিক পারিভাষিক শব্দ ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, যা শিশুদের কাছে বিষয়টিকে দুর্বোধ্য করে তুলছে। ভাষাগত এই দীনতা এবং অনুবাদের যান্ত্রিকতা শিশুদের শেখার আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।

জেন্ডার স্টেরিওটাইপ ও সাংস্কৃতিক অসংগতি

আগের সংস্করণে ঘরোয়া কাজগুলোয় পুরুষ-নারী উভয়ের অংশগ্রহণ দেখানো হলেও, নতুন কিছু সংস্করণে ঘর পরিষ্কার বা কাপড় গোছানোর মতো কাজগুলো শুধু নারী চরিত্রকে দিয়ে করানো হচ্ছে। এছাড়া অলংকরণে বিদেশি কার্টুনের হুবহু অনুকরণ করতে গিয়ে আমাদের দেশীয় পোশাক ও সংস্কৃতির সঙ্গে মেলে না এমন চিত্র বইয়ে ঢুকে পড়ছে। অদক্ষ চিত্রশিল্পী নিয়োগ এবং তদারকির অভাবে অনেক সময় প্রাণীর ছবির জায়গায় অস্বাভাবিক বা অবাস্তব চিত্রায়ণ দেখা যাচ্ছে—যেমন সাপের ডিমের জায়গায় মুরগির ছবি।

কারিগরি নিম্নমান ও কাগজ-কালির সংকট

তথ্যের ভুলের পাশাপাশি বইয়ের ভৌত মান নিয়েও অভিযোগের শেষ নেই। নিম্নমানের নিউজপ্রিন্ট কাগজে বই ছাপানোর ফলে ছবিগুলো অস্পষ্ট হয়ে থাকে এবং কালির ঘষায় অনেক সময় লেখাই পড়া যায় না। এটি শিশুদের পাঠাভ্যাসে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

বাজারে থাকা বেশ কিছু শিশুপাঠ্য সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করে দেখেছে আগামীর সময়। এর মধ্যে শিশুদের ‘ঈশপের গল্পসমগ্র’ বইয়ে বিভিন্ন ধরনের ভুল লক্ষ করা যায়। বইয়ে বিদ্যমান সব গল্পের নাম সূচিপত্রে না থাকার পাশাপাশি বানান ভুল (যেমন : খরগোশকে খরগোস, চড়ুইকে চড়ই), বাক্যের অসামঞ্জস্য (যেমন : গাধাটা অনেক খাবার খেতো চারটি গাধার খাবার একাই খেতো), ছবির অসামঞ্জস্য (যেমন : সাপের ডিমের স্থানে মুরগির ডিমসহ মুরগির ছবি দেওয়া), শব্দ বা বর্ণের বাহুল্য (যেমন : তারদিকে দিকেই, এমন কাউকে সে কাউকে), বিভিন্ন যোগ্যতাবিহীন বাক্য ব্যবহার করা (এলোমেলো করে বিভিন্ন শব্দ বসিয়ে দেওয়া), অযাচিত সব বিরাম চিহ্ন ব্যবহারসহ বিভিন্ন ধরনের ভুল পাওয়া গেছে।

চাই জবাবদিহি ও বিশেষজ্ঞ প্যানেল

প্রকাশকদের পক্ষ থেকে ‘ভুল সংশোধনের’ আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন সামান্যই। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকট থেকে উত্তরণে কিছু করণীয় রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে : শক্তিশালী বিশেষজ্ঞ প্যানেল- বিষয়ভিত্তিক গবেষক, শিশু মনোবিজ্ঞানী এবং ভাষাবিদদের সমন্বয়ে একটি প্যানেল গঠন করতে হবে।

শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ আর বই হলো সেই ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর। আন্তর্জাতিক শিশু বই দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত শিশুদের হাতে একটি নির্ভুল, সুন্দর এবং মানসম্মত বই তুলে দেওয়া। রাজনৈতিক বা আদর্শিক প্রভাবমুক্ত হয়ে একটি সুস্থ ও শুদ্ধ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

বিদেশি কার্টুন বা ছবির হুবহু অনুকরণ করতে গিয়ে তাদের সংস্কৃতির পোশাক বা বিভিন্ন আদর্শিক বিষয়বস্তু অনেক সময় আমাদের দেশীয় পোশাক বা সংস্কৃতির সঙ্গে মেলে না- এমন চিত্র বইয়ে ঢুকে পড়ছে, যা শিশুদের মনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছে।

এমন অসংগতির কথা স্বীকারও করলেন ইমন প্রকাশনীর মিজানুর রহমান। ‘বইয়ের ভুল সম্পর্কে আমি অবগত হয়েছি গত বছর, কিন্তু পরে সেগুলো সংশোধন করে বইমেলায় দেওয়া হয়নি। এ বছর ঈশপের বইগুলো সংশোধন করা হলেও তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। পরে যাতে এ ধরনের ভুল না হয়, সেদিক খেয়াল রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব’- স্বরল স্বীকারোক্তি এই প্রকাশকের।

শুধু বেসরকারি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোই নয়, বিভ্রান্তির রাজ্যে পিছিয়ে বাংলা একাডেমিও। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন অভিধান ও প্রকাশনা সংস্করণে অন্তত ২৫০টির মতো শব্দ চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে একই বানান বিভিন্ন রকমভাবে লেখা আছে। ফলে বাংলা একাডেমির বানান অভিধান ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বানান নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়তে হচ্ছে অনেককে।

ইতিমধ্যে বাংলা একাডেমি থেকে ‘বানান সমতা বিধান’ নামে একটি কমিটি করা হয়েছে, তারা ইতিমধ্যে যে শব্দগুলো চিহ্নিত করেছে, সেগুলোর সমতা বিধানের জন্য কাজ করছে।

বাংলা একাডেমির বানান সমতা বিধান কমিটির সদস্য শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক অধ্যাপক মানবর্দ্ধন পাল বললেন, ‘আমাদের দেশে তো শিশুসাহিত্যিকের সংখ্যা খুব বেশি নয়। আবার যারা শিশুদের জন্য লেখেন, তাদের কেউ কেউ বানান বিষয়ে যত্নবান হন না। তারা যদি বাংলা একাডেমির বানান বিধির সর্বশেষ সংস্করণটা অনুসরণ করেন, তাহলে বানান বিভ্রান্তি কিছুটা হলেও কমবে।’

‘বাংলা একাডেমির বানান বিধিও পরিমার্জন হচ্ছে। কিছু শব্দের একাধিক বানান বিধি আছে। সেসব শব্দের সমতা বিধানের জন্য কাজ চলমান। তবুও বাংলা একাডেমি যেহেতু সরকারস্বীকৃত প্রতিষ্ঠান এবং বাংলা ভাষার বিকাশে কাজ করে। তাই বাংলা একাডেমির বানান বিধি অনুসরণ করা উচিত বলে আমি মনে করি’- যোগ করলেন অধ্যাপক মানবর্দ্ধন।

    শেয়ার করুন: