এসি ল্যান্ডের ‘গোপন নিলাম’
উন্নয়নের নামে ঈদের ছুটিতে কাটা হলো ২৮ গাছ

ছবিঃ আগামীর সময়
বিজ্ঞপ্তিতে এক, বাস্তবে হয়েছে আরেক। বিধি ভেঙে মাইকিংবিহীন নিলাম। ঘোষণা এক স্থানে, নিলাম অন্যখানে। ২১ গাছের কথা বলে একে একে কাটা হয়েছে ২৮টি। সাড়ে ৩ লাখ টাকার গাছ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার টাকায়। উন্নয়নের আড়ালে হয়েছে এমনই সব অনিয়ম, যা গোপন রাখতে সময় হিসেবে বেছে নেওয়া হয় এবারের ঈদুল ফিতরের টানা কয়েক দিনের ছুটিকে। তবে শেষমেশ আর গোপন থাকেনি, এক কান-দুকান করে জানাজানি হয়েছে উপজেলা জুড়ে। সরকারি বিধি অনুযায়ী যেকোনো প্রকাশ্য নিলামের মূল শর্ত স্বচ্ছতা এবং জনসম্মুখে প্রচার। কিন্তু কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নতুন ভবন নির্মাণের উছিলায় কাটা পড়েছে এই ২৮টি গাছ।
সরকারি এসব গাছ বিক্রিতে খোদ সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ডের বিরুদ্ধে উঠেছে ‘গোপন আঁতাত’ ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ। নির্ধারিত স্থান পরিবর্তন করে নিজ কার্যালয়ে নিলাম সম্পন্ন, মাইকিং না করা এবং নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে অতিরিক্ত গাছ কেটে ফেলার মাধ্যমে এই ‘পুকুর চুরি’র ঘটনা ঘটেছে বলে ভাষ্য এলাকার মানুষের।
বিজ্ঞপ্তিতে এক, বাস্তবে আরেক
আগামীর সময়ের অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ২১টি গাছ বিক্রির জন্য নিলাম ডাকেন (আহ্বান) এসি ল্যান্ড আরিফুল ইসলাম। নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল, নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিস চত্বরে। কিন্তু অজানা কারণে ১৫ মার্চ সেই নিলাম হয় জেলা শহরে এসি ল্যান্ডের নিজ দপ্তরে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জনসমাগম এড়িয়ে প্রভাবশালী কাউকে সুবিধা পাইয়ে দিতেই গোপনে পরিবর্তন করা হয়েছে নিলামের স্থান।
মাইকিংবিহীন নিলাম ও ঈদের ছুটিতে গাছ কাটা
সরকারি নিলামের ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে মাইকিং করা বাধ্যতামূলক হলেও এলাকাবাসীর দাবি, তারা এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না। এমনকি নিলাম প্রক্রিয়াটি হয়েছে ঈদুল ফিতরের ছুটির মাত্র দুদিন আগে, যখন সাধারণ মানুষের মনোযোগ ছিল ঈদ উৎসবের দিকে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, গাছগুলো কাটার সময় ভূমি অফিসের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন না। ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. মঞ্জুরুল ইসলাম নিজেই এই অনুপস্থিতির কথা নিশ্চিত করেছেন।
সংখ্যা ও মূল্যের গরমিল
নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে ২১টি গাছের কথা উল্লেখ থাকলেও স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে কাটা হয়েছে ২৮টি গাছ। উপজেলা উপসহকারী প্রকৌশলী জুল জালাল বলছেন, নির্মাণাধীন ভবনের লে-আউটের প্রয়োজনে অতিরিক্ত দু-একটি গাছ কাটা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফুল হকের মতে, কেটে ফেলা গাছগুলোর বাজারদর সাড়ে ৩ লাখ টাকার বেশি। অথচ নিলামে তা মাত্র ১ লাখ ১২ হাজার টাকায় তুলে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ দরদাতার হাতে। সরকারি দরের বাইরে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে হয়েছে এই যোগসাজশ। ‘আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই। কেন গোপনে এমন নিলাম হলো, আমরা কিছুই জানলাম না! আবার নিলাম হলো এসি ল্যান্ডের অফিসে! আবার গাছ কাটা হলো বেশি’- টানা কথাগুলো বলে গেলেন আশরাফুল।
নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, নিলামের আহ্বানপত্রে বলা হয়- কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নতুন ভবন নির্মাণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে কিছু গাছ কাটা প্রয়োজন। আহ্বানপত্রে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়, একটি আমগাছ, একটি কাঁঠালগাছ, একটি চাগুয়া গাছ, একটি শিবগাছ ও ১৭টি মেহগনি গাছসহ ২১টি গাছ কাটা জরুরি। পরে চলতি বছরের মার্চে ঘোষণা করা হয় নিলাম বিজ্ঞপ্তি। সেখানে প্রকাশ্য নিলামের স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয় কাঁঠালবাড়ী পৌর ভূমি অফিস। এলাকাবাসী বলছেন, নিলামের কোনো মাইকিংও তারা শোনেননি। অথচ নথিপত্রে তিনজন দরদাতার মধ্যে নিলাম হয়েছে দেখিয়ে সর্বোচ্চ দরদাতা উল্লেখ করা হয় মো. নুর আলম নামে এক ব্যক্তিকে।
কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, নতুন দোতলা ভবন নির্মাণের জন্য কাটা হয়েছে বড়, মাঝারি ও ছোট আকারের গাছগুলো। ঈদের ছুটির সময় গোপনে গাছগুলো কাটার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন না ভূমি অফিসের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী। এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. মঞ্জুরুল ইসলাম।
‘উন্নয়ন’ বনাম ‘আইন’
অভিযোগের বিষয়ে এসি ল্যান্ড আরিফুল ইসলাম ‘তাড়াহুড়ো’র কথা স্বীকার করেন। তার দাবি, বরাদ্দের টাকা ফেরত যাওয়ার আশঙ্কায় এবং ‘জনসেবার মান উন্নয়নের’ লক্ষ্যেই দ্রুত এমন পদক্ষেপ নিয়েছেন। ‘দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অফিসটি অবহেলায় রয়েছে। সেখানে কাজ করার উপযুক্ত পরিবেশ নেই। তাই ভূমি অফিসের উন্নয়নের জন্য নিলাম প্রক্রিয়াটি কিছুটা তাড়াহুড়ো করে হয়েছে।’
ঈদের ছুটিতে গাছ কাটার কারণ জানতে চাইলে তার সপক্ষেও গাইলেন সাফাই। ‘আসলে ঈদের পর কাজ শুরু করার একটা তাগাদা ছিল। তা না হলে বরাদ্দের টাকা ফেরত যাওয়ার একটা আশঙ্কা থাকে। তাই দ্রুত কাজটি শুরু করার জন্য এমনটি করা হয়েছে।’
নিলামের নথিতে উল্লেখ থাকা সংখ্যার চেয়ে বেশি গাছ কাটা পড়ার অভিযোগ স্বীকার করে বিষয়টি হালকাভাবে নিলেন এসি ল্যান্ড আরিফুল। ‘২১টি গাছের নিলাম হয়েছে। হয়তো দু-একটি ছোট গাছ বেশি কেটেছে, এর বেশি কিছু নয়। আমি যা করেছি, আপনাদেরই উন্নয়নের জন্য, জেলার উন্নয়নের জন্য করেছি’- যোগ করেন তিনি।
তবে জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকরা বলছেন, উন্নয়নের দোহাই দিয়ে সরকারি নিলামের স্বচ্ছতা ও আইনি প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের কোনো সুযোগ নেই।
তারা মনে করেন, সরকারি সম্পদ রক্ষায় যেখানে এসি ল্যান্ডের ভূমিকা হওয়ার কথা ছিল প্রহরীর মতো, সেখানে তার বিরুদ্ধেই গোপনে গাছ বিক্রির অভিযোগ প্রশাসনের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই অনিয়মের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও জানান তারা, যাতে সরকারি সম্পদ আত্মসাতের সংস্কৃতি বন্ধ হয়।
কাঁঠালবাড়ী বাজার সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুল হক মনে করেন, এই নিলাম প্রক্রিয়া ছিল ত্রুটিপূর্ণ। ‘এসি ল্যান্ড গোপনে তার নিজ অফিসে এই নিলাম করেন। আমরা কিছুই জানি না এ সম্পর্কে।’ ক্ষোভ ঝাড়লেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা সাদেকুল ইসলাম মিলন বললেন, নিলামের নথিপত্রে সর্বোচ্চ দরদাতার দেওয়া যে মূল্য দেখানো হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে নেওয়া হয়েছে তার চেয়ে বেশি টাকা। ‘নিলামে গাছের সরকারি রেট ছিল ১ লাখ ১ হাজার ৪১০ টাকা। যিনি গাছ কিনেছেন, তিনি নিলামে মূল্য দেখিয়েছেন ১ লাখ ১২ হাজার টাকা। কিন্তু সরকারি রেটের বাইরে আরও ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়ে যোগসাজশ করে গাছ বেচে দিয়েছেন এসি ল্যান্ড’- খেদোক্তি সাদেকুলের।
যদিও নিলামের সদর উপজেলা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইসমাইল হোসেন দায় চাপিয়েছেন স্থানীয়দের ওপর। তার দাবি, নিয়ম মেনেই নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। বিশৃঙ্খলা এড়াতেই এসি ল্যান্ডের কার্যালয়ে নিলাম সম্পন্ন হয়েছে।

