হরমুজ সচলে যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে ৪০ দেশের কূটনৈতিক উদ্যোগ

সংগৃহীত ছবি
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের জেরে অচল হয়ে পড়া হরমুজ প্রণালী আবার সচল করতে ৪০টির বেশি দেশকে নিয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ শুরু করেছে যুক্তরাজ্য। বৃহস্পতিবার ভার্চুয়াল বৈঠকে অংশ নেওয়া দেশগুলো প্রণালীতে নিরাপদ নৌযাত্রা নিশ্চিত করার উপায় নিয়ে আলোচনা করেছে। বৈঠকে জোর দেওয়া হয়েছে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপের ওপর, সামরিক বিকল্পের ওপর নয়।
বৈঠকের শুরুতে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার ইরানের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে জিম্মি করার অভিযোগ তোলেন। তার ভাষ্য, ‘আমরা দেখেছি, ইরান একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ দখল করে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে জিম্মি করে রেখেছে।’
কুপার জানান, এই সংকটের প্রভাব শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। তার ভাষায়, ‘কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ওমান ও ইরাকের বাণিজ্যপথ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর অর্থ এশিয়ার জন্য তরল প্রাকৃতিক গ্যাস, আফ্রিকার জন্য সার এবং সারা বিশ্বের জন্য জেট জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘যেসব দেশ এই সংঘাতে জড়িত নয়, তাদের প্রতিও ইরানের এমন বেপরোয়া আচরণ, যা আমরা এবং জাতিসংঘে ১৩০টি দেশ নিন্দা জানিয়েছি, তা শুধু যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াচ্ছে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।’ কুপারের ভাষায়, তেল ও খাদ্যের দামের ‘অসহনীয়’ বৃদ্ধি বিশ্বের সর্বত্র মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ তৈরি করছে।
পারস্য উপসাগরকে বিশ্বের অন্যান্য জলপথের সঙ্গে যুক্ত করা হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পথে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ইরানের হামলা এবং আরও হামলার আশঙ্কায় প্রায় সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল থমকে আছে।
শিপিং তথ্যপ্রতিষ্ঠান লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে ২৩টি সরাসরি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে ১১ জন নাবিক নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার এক ব্রিফিংয়ে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, বর্তমানে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধের মুখে। যেগুলো চলছে, তার বেশির ভাগই ইরানের তেল বহনকারী নিষেধাজ্ঞা এড়ানো ট্যাংকার। একই সঙ্গে একটি অস্বচ্ছ ব্যবস্থার মাধ্যমে কে চলাচল করতে পারবে, তা কার্যত ইরানই নির্ধারণ করছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথের ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় আছে।
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কয়েক সপ্তাহে ব্যারেলপ্রতি ৭৩ ডলার থেকে ১০০ ডলারের বেশি হয়েছে। এতে অনেক দেশেই জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়েছে।
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেয়নি। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তার দেশের দায়িত্ব নয়। বুধবার রাতে দেওয়া এক ভাষণে তিনি জানান, এ জলপথের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোকেই এটি আবার সচল করার দায়িত্ব নিতে হবে।
ট্রাম্প বলেছেন, ‘মিত্রদের আগেই এটা করা উচিত ছিল। ওখানে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ নিন, রক্ষা করুন, নিজেদের জন্য ব্যবহার করুন।’
ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপীয় মিত্রদের সমালোচনা করে আসছে এই বলে যে, তারা নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বা যুদ্ধ প্রচেষ্টায় যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে না৷ ট্রাম্প আবারও ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই সামরিক জোট যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘খুব খারাপ আচরণ’ করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে অনেকেই ইউরোপের পক্ষ থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্দেশে একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখছেন। বার্তাটি হলো, ইউরোপ নিজের নিরাপত্তা প্রশ্নে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে প্রস্তুত।
এ উদ্যোগকে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির পর নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’-এর সঙ্গেও তুলনা করা হচ্ছে।
কিংস কলেজ লন্ডনের মধ্যপ্রাচ্য নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডেভিড বি রবার্টসের মতে, হরমুজ নিয়ে এই জোট গঠনের প্রচেষ্টা ‘নিঃসন্দেহে ট্রাম্পের ন্যাটো–বিরোধী মনোভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত।’
তার ভাষায়, ‘যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স এখানে নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজেদের গুরুত্ব দৃশ্যমানভাবে তুলে ধরা যায়।’
রবার্টস যোগ করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এখন তেল রপ্তানিকারক দেশ। তাই উপসাগরে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের তাৎক্ষণিক প্রভাব ইউরোপ ও এশিয়ার ওপরই বেশি পড়ে।’
কূটনৈতিক মহলে এ বৈঠককে প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এরপর বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তা ও সামরিক পরিকল্পনাবিদদের পর্যায়ে আরও বৈঠক হবে, যেখানে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে। যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে কয়েকটি দেশের সামরিক পরিকল্পনাকারীরা বৈঠক করবেন। যুদ্ধ শেষ হলে কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে সেখানে আলোচনা হবে। এর মধ্যে মাইন অপসারণ এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে আস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ও থাকবে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বুধবার বলেছেন, ‘প্রণালীটি পুনরায় চালুর জন্য আমরা সব ধরনের কূটনৈতিক পথ খতিয়ে দেখছি।’ তিনি জানান, যুদ্ধ বন্ধ হলে কীভাবে এ নৌপথকে আবার নিরাপদ ও সচল করা যায়, তা নিয়েও পরিকল্পনা চলছে। তার মতে, প্রণালীটি আবার চালু করা ‘সহজ হবে না’। এর জন্য ‘সামরিক সক্ষমতা ও কূটনৈতিক তৎপরতার সমন্বিত অবস্থান’ এবং সামুদ্রিক খাতের অংশীজনদের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।
তবে আপাতত বলপ্রয়োগে প্রণালী খুলে দেওয়ার পক্ষে কোনো দেশকেই দেখা যাচ্ছে না। কারণ, যুদ্ধ চলমান অবস্থায় ইরান এখনো জাহাজ লক্ষ্য করে অ্যান্টিশিপ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, দ্রুতগতির হামলাকারী নৌযান ও মাইন ব্যবহার করতে সক্ষম। এক পর্যবেক্ষকের ভাষায়, ‘এটি বিস্তৃত একটি জোট। শুধু পশ্চিমা দেশ বা শুধু ন্যাটো নয়। এখানে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্ক্যান্ডিনেভীয় ও বাল্টিক দেশগুলোর পাশাপাশি বাহরাইন, ইউএই, পানামা, নাইজেরিয়ার মতো দেশও আছে। তবে প্রশ্ন হলো, এরা বাস্তবে কী করতে পারবে? এদের নৌ সক্ষমতা কতটা?’
বিশ্লেষক চ্যাল্যান্ডসের মতে, স্টারমার খুব স্পষ্টভাবেই অসামরিক সমাধানের পক্ষ নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কিয়ার স্টারমারের এই যুদ্ধে জড়ানোর কোনো আগ্রহ নেই। সমবেত দেশগুলোর বেশির ভাগেরও একই অবস্থান।’
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁও সামরিক উপায়ে প্রণালীটি খুলে দেওয়ার ধারণা নাকচ করেছেন। দক্ষিণ কোরিয়া সফরে বৃহস্পতিবার তিনি জানান, এটি ‘বাস্তবসম্মত নয়”। তার ভাষায়, ‘এটি কখনোই আমাদের সমর্থিত বিকল্প ছিল না। এটি কেবল ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করেই সম্ভব। তাই সবার আগে যুদ্ধবিরতি এবং আলোচনায় ফিরে যাওয়া প্রয়োজন।’
ম্যাখোঁর মতে, সামরিক উপায়ে প্রণালীটি সচল করতে গেলে ‘অনেক সময় লাগবে’ এবং জাহাজগুলো ‘উপকূলীয় হুমকির’ মুখে পড়বে। বিশেষ করে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড করপসের হাতে ‘উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র’ রয়েছে। তার মতে, সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা।
ফ্রান্স প্রস্তাব দিয়েছে, সংঘাতের সবচেয়ে তীব্র পর্যায় শেষ হলে ইউরোপীয় ও ইউরোপের বাইরের দেশগুলোর অংশগ্রহণে একটি আন্তর্জাতিক মিশনের মাধ্যমে তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালী পারাপার করানো যেতে পারে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর বৃহস্পতিবারের বৈঠকে অংশ নেওয়া দেশগুলোর পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করেনি। তবে বুধবার ৩৫ দেশের কথা বলা হলেও বৈঠকের সময় অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা ৪০ ছাড়িয়ে যায়। যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, অংশগ্রহণকারীরা প্রণালীটি নিরাপদে পুনরায় চালুর কূটনৈতিক পরিকল্পনার পাশাপাশি সেখানে আটকে পড়া প্রায় দুই হাজার জাহাজের ২০ হাজার নাবিকের নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা করেছেন।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ তিন ডজনের বেশি দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানকে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও প্রণালি অবরুদ্ধের চেষ্টা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা নিরাপদ নৌযাত্রা নিশ্চিত করতে ‘উপযুক্ত উদ্যোগে অবদান রাখার’ অঙ্গীকার করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রণালীতে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে উপযুক্ত উদ্যোগে আমরা অংশ নিতে প্রস্তুত। এ বিষয়ে পরিকল্পনায় যুক্ত দেশগুলোর অঙ্গীকারকে আমরা স্বাগত জানাই।’

