আগামীর সময়

মানুষের গল্প

এক কাদি কলা আর মায়া ছড়ানো বৃদ্ধ

এক কাদি কলা আর মায়া ছড়ানো বৃদ্ধ

ছবিঃ আগামীর সময়

ইট-পাথরের শহরটা যেন দিনদিন আরও নির্দয় হয়ে উঠছে। ধোঁয়া, ভিড়, ঠেলাঠেলি আর নির্লিপ্ত মুখের ভিড়ে আমরা যেন প্রত্যেকে আলাদা একেকটা দ্বীপ। এ যেন কাছাকাছি থেকেও দূরে। প্রতিদিনের রুটিন, অফিস-বাসা-যাতায়াতের একঘেয়ে ছকে মানুষ ধীরে ধীরে আবেগহীন হয়ে পড়ছে। কিন্তু সেই যান্ত্রিকতার মাঝেও হঠাৎ ঘটে যাওয়া এক ছোট্ট ঘটনা কখনো কখনো ভেঙে দেয় ভেতরের সব কঠিন দেয়াল।

আজ ফার্মগেট এলাকায় ঠিক তেমনই এক মুহূর্তের সাক্ষী হলাম। আমার ভেতরের সেই পাথরটা মুহূর্তে চূর্ন-বিচূর্ণ হয়ে গেল।

জ্যাম কাটিয়ে বাসটা যখন ফার্মগেটে এসে থামল, তখন চোখে পড়ল এক বৃদ্ধ মানুষকে। বয়সের ভারে মেরুদণ্ডটা ধনুকের মতো নুয়ে পড়েছে, প্রতিটি পদক্ষেপে যেন দীর্ঘ জীবনের ক্লান্তি। তবুও দুই হাতে শক্ত করে ধরে আছেন একটি বড় কলার কাঁদি। হলদে, টাটকা কলাগুলো যেন তার হাতে নয়, যেন এক অদৃশ্য দানের ঝুড়িতে ভরা আশীর্বাদ।

কষ্ট করে বাসে উঠে তিনি এক কোণে বসতেই শুরু হলো এক অদ্ভুত দৃশ্য। কাঁদি থেকে এক এক করে কলা ছিঁড়ে তিনি যাত্রীদের হাতে তুলে দিতে লাগলেন। কোনো চাওয়া নেই, কোনো পরিচয় নেই—শুধু দিয়ে যাওয়ার এক অদ্ভুত তাড়না। তার চোখে ছিল এক প্রশান্ত মায়া, যা এই শহরে খুব কমই দেখা যায়।

বাসের ভেতর তখন নানা প্রতিক্রিয়া—কেউ বিস্মিত, কেউ মুগ্ধ, কেউবা চুপচাপ মাথা নুইয়ে নিচ্ছে। কিন্তু বৃদ্ধের যেন কিছুতেই থামার সময় নেই। তিনি যেন ঠিক করেছেন, এই কাঁদি শেষ হওয়ার আগেই যতটা পারেন ভালোবাসা বিলিয়ে যাবেন।

কলার কাদিটা টেনে টেনে একসময় তিনি আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। কাঁপা হাতে বাড়িয়ে দিলেন দুটো কলা। শহুরে সংকোচে আমি প্রথমে না বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তার একটিমাত্র শব্দ—‘নাও!’— আমার দ্বিধাটাকে নিমেষেই ধূলিসাৎ করে দিল।

সেই ‘নাও’ ধমকে কোনো রাগ ছিল না, ছিল এক গভীর স্নেহের কর্তৃত্ব। যেন বহুদিনের পরিচিত কেউ, খুব আপন একজন, ভালোবেসে কিছু দিতে চাইছেন। আমি নির্বাক হয়ে গেলাম। তিনি নিজেই কলা দুটো আমার ব্যাগের ওপর রেখে দিলেন। পাশের সিট থেকে কয়েকজন ফিসফিস করে বলল, ‘নিয়ে নেন মা, দাদুর আশীর্বাদ।’

আমিও পরম যত্নে কলা দুটো কাগজে মুড়িয়ে ব্যাগে রাখলাম। মনে হলো, এগুলো আর সাধারণ ফল নয়, এগুলো এই নিষ্ঠুর শহরের বুকে লুকিয়ে থাকা এক টুকরো নির্মল ভালোবাসা।

বাস থেকে নামার পর বুকের ভেতরটা অদ্ভুত ভারী হয়ে উঠল। একবার পেছন ফিরে তাকালাম। জানলার ওপাশে সেই বৃদ্ধ তখনো যাত্রীদের মাঝে কলা বিলিয়ে যাচ্ছেন। হয়তো নিজের জন্য কিছুই রাখবেন না, তবুও তার মুখে এক অপার্থিব তৃপ্তির আলো।

এখন এই অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে আমার কেবল হাউমাও করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। এই কান্নার কোনো নির্দিষ্ট কারণ নেই। এটা হয়তো জমে থাকা ক্লান্তি, অথবা হঠাৎ পাওয়া একফোঁটা নির্মল মায়ার স্পর্শ। এই শহর যতই কঠিন হোক, এর ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে আছে এমন অগণিত অচেনা ভালোবাসা।

আমরা হয়তো ভাবি, আমরা একা। কিন্তু না—যতদিন এমন কোনো ‘দাদু’ এক কাঁদি কলা হাতে নিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসেন, ততদিন এই শহর পুরোপুরি নির্জীব হয়ে যেতে পারে না। এখানেই, এই ছোট ছোট মানবিক মুহূর্তেই লুকিয়ে আছে বেঁচে থাকার সবচেয়ে গভীর শান্তি।

    শেয়ার করুন: