বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিদায়
নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়

তোমার চোখের ভেতর আজ কোনো স্টেডিয়াম নেই। শুধু একটি দীর্ঘ করিডর। সেখানে করতালির শব্দ এসে পৌঁছায় না, পৌঁছায় শুধু ফিরে না-আসা কয়েকটি সন্ধ্যা, বর্ণিল প্রেম।
সম্ভবত মানুষের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এই— সে যা পেয়েছে তার চেয়ে, যা পায়নি, শেষ পর্যন্ত তারই ছায়া দীর্ঘ হয়। তোমার চোখের ভেতর আজ সেই দীর্ঘ ছায়া। সেখানে ঘাস নেই, গোলপোস্ট নেই, উল্লাসের ঢেউ নেই। আছে শুধু সময়ের নিঃশব্দ পদচারণা। যেন বহু বছর ধরে একটি বিকাল নিজের ঘরে ফিরতে পারেনি।
আমরা ভুলে যাই, সৌন্দর্যেরও ক্লান্তি আছে। যে মানুষ প্রতিদিন বিস্ময় রচনা করে, তারও একদিন নিজের ভেতরে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু পৃথিবী শিল্পীদের বিশ্রাম দেয় না। তাদের কাছে বারবার অলৌকিকতা চায়। যেন তারা মানুষ নয়, কোনো অন্তহীন জাদুর প্রদীপ।
কত সহজে মানুষ বিজয়ের হিসাব রাখে। অথচ যেসব স্বপ্ন ঠিক ট্রফির কিনারে এসে থেমে যায়, তাদের জন্য কোনো আলোকচিত্র থাকে না। শুধু শরীর মনে রাখে। পায়ের পেশি মনে রাখে। হাঁটুর ভেতর জমে থাকা ক্লেদ মনে রাখে। আর চোখ— সে তো সবচেয়ে বিশ্বস্ত আর্কাইভ।
চোখ কখনো মিথ্যা বলে না। সে জানে, কত রাত ব্যথার সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমিয়েছে। কত সকাল ব্যান্ডেজ খুলে আবার নতুন বিশ্বাস পরেছে। কতবার একটি শরীর নিজের সীমাকে অতিক্রম করতে চেয়েছে, শুধু কয়েক মুহূর্তের সৌন্দর্যের জন্য। মানুষ সেই সৌন্দর্য দেখেছে; তার মূল্য দেখেনি।
তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, পৃথিবী কখনো কখনো সবচেয়ে সুন্দর মানুষগুলোকেও সম্পূর্ণ হতে দেয় না। তাদের হাতে ফুল তুলে দেয়, কিন্তু ঋতু দেয় না। আকাশ দেয়, কিন্তু উড়ানের শেষ নীলটুকু নিজের মুঠোয় গচ্ছিত রাখে। উজাড় করে দেয় না।
হয়তো প্রকৃতি কিছু মানুষকে পূর্ণতার জন্য সৃষ্টি করেন না। তাদের কপালে লিখে দেন অপূর্ণতার দীপ্তি। কারণ সম্পূর্ণ মানুষকে ইতিহাস মনে রাখে; কিন্তু অসমাপ্ত মানুষকে মনে রাখে হৃদয়। তারা চলে যাওয়ার পরও বাতাসে তাদের ভঙ্গি থেকে যায়। কোনো এক শিশুর খেলায় তাদের ছায়া ফিরে আসে। কোনো এক বৃদ্ধ দর্শকের দীর্ঘশ্বাসে তাদের নামহীন প্রতিধ্বনি বাজে। ইতিহাসের কোথাও একটি বিন্দুর মতো আবছা হয়ে রয়ে যায়।
হয়তো এটাই নিয়তি। কিছু মানুষ জয়ের জন্য নয়, মানুষের হৃদয়ে এক ধরনের অসমাপ্ত বিষণ্নতা হয়ে বেঁচে থাকার জন্য জন্মায়। তাদের বিদায় কখনো শেষ বাঁশিতে লেখা থাকে না; লেখা থাকে দর্শকদের নীরব হয়ে যাওয়া চোখে, গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া নির্মল অশ্রুবিন্দুতে।
বিদায়েরও শব্দ থাকে না সবসময়। কখনো তা নেমে আসে সন্ধ্যার মতো, অন্ধকারের বিছিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া জালে। ধীরে ধীরে। কেউ বুঝে ওঠার আগেই আলো বদলে যায়। গ্যালারি খালি হতে থাকে। পতাকাগুলো আর আগের মতো উড়ে না। শুধু কোথাও একটি শিশু, যে একদিন তাকে দেখে বল কিক করতে শিখেছিল, অকারণ বিষণ্ন হয়ে পড়ে। সে জানে না কেন তার মন খারাপ। সৌন্দর্যের বিদায় সবসময় ভাষায় ধরা পড়ে না। এই ভাষার নামই নির্জনতা, যা বুকের ভেতর হেলান দিয়ে বসে।
যে ক্লান্তি আজ তোমার কাঁধে, তার ওজন কোনো পরাজয়ের নয়। বহু বছর ধরে বহন করে আনা প্রত্যাশার। মানুষ তোমার কাছ থেকে অলৌকিকতা চেয়েছিল। তুমি তাদের দিয়েছিলে সৌন্দর্য। অথচ পৃথিবী সৌন্দর্যের চেয়ে পরিসংখ্যানকে বেশি মনে রাখে।
সংখ্যা কখনো ড্রিবলের ভেতর লুকিয়ে থাকা কবিতাকে লিখতে পারে না। ট্রফি কখনো একটি স্পর্শের কোমলতা বহন করে না। ইতিহাসের খাতায় জয়-পরাজয়ের অঙ্ক লেখা থাকে; অথচ মানুষের স্মৃতিতে টিকে থাকে এমন কিছু মুহূর্ত, যাদের কোনো ফলাফল নেই। আছে শুধু বিস্ময়। আর বিস্ময়ের আয়ু সব পরিসংখ্যানের চেয়ে দীর্ঘ।
আমি জানি, একদিন ঘাসেরাও তোমার পায়ের ভাষা ভুলে যাবে। গ্যালারির আলো অন্য মুখে গিয়ে পড়বে। কিন্তু কিছু বিকাল থাকবে, আমাদের কিছু মগ্ন নৈঃশব্দ্যের কাতর রাত— যেখানে হঠাৎ বাতাসের ভেতর একটি অনামা ড্রিবল ভেসে উঠবে। কেউ তার নাম নেবে না। শুধু মনে হবে— অসাধারণ প্রতিভারও একটি নিঃসঙ্গ পরিণতি আছে।
সেসব রাতে আমরা হয়তো টেলিভিশনের পর্দা বন্ধ করে দেব। তবু মনে হবে, কোথাও একজন এখনো সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তার পায়ের নিচে বল নেই, আছে সময়। আর সময় তাকে ক্রমশ দূরে নিয়ে যাচ্ছে। এমন দূরে, যেখান থেকে ফিরে আসে না কোনো দ্বিতীয় যৌবন, কোনো দ্বিতীয় বিস্ময়।
একদিন জার্সির রঙ ফিকে হয়ে যাবে। স্টেডিয়ামের দেয়ালে নতুন মুখের পোস্টার উঠবে। শিশুরা নতুন নায়কের নাম মুখস্থ করবে। কিন্তু পৃথিবীর কিছু মানুষ, যাদের হৃদয়ে সৌন্দর্য এখনো সংখ্যার কাছে পরাজিত হয়নি, তারা জানবে— একটি অসমাপ্ত শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। শেষ আঁচড়টি আর টানা হলো না বলেই তার দিকে এতবার ফিরে তাকাতে হয়।
হয়তো এটাই শিল্পীর নিয়তি। তিনি কখনো শুধু নিজের জীবন বাঁচেন না; অগণিত মানুষের স্বপ্ন, প্রত্যাশা, ব্যর্থতা, আনন্দ আর কান্না নিজের শরীরের ভেতর বহন করেন। একসময় সেই শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। পেশিগুলো আর আগের মতো সাড়া দেয় না। গতি একটু কমে আসে। তবু মানুষের প্রত্যাশা কমে না। তারা এখনো অপেক্ষা করে— আরও একবার, শেষবারের মতো, অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার জন্য। অথচ কেউ দেখে না, অলৌকিকতারও একদিন শ্বাস ফুরিয়ে আসে।
কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসে নক্ষত্র হওয়ার জন্য নয়, ধূমকেতু হওয়ার জন্য। তারা দীর্ঘকাল আকাশে থাকে না; কিন্তু যতদিন থাকে, আকাশের সংজ্ঞাটাই বদলে দেয়। তারপর একদিন নিঃশব্দে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। মানুষ অনেক পরে বুঝতে শেখে— আলো নিভে যাওয়ার শব্দও আছে। শুধু তা কানে শোনা যায় না; শোনা যায় স্মৃতির গভীরে।
আজ তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, সবচেয়ে গভীর বিষণ্নতা পরাজয়ের নয়; সবচেয়ে গভীর বিষণ্ণতা সেই সৌন্দর্যের, যা নিজের পূর্ণ পরিণতি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। কিছু স্বপ্ন সময়ের কাছে হেরে যায় না, হেরে যায় শরীরের কাছে। কিছু প্রতিভা ইতিহাসের কাছে পরাজিত হয় না, পরাজিত হয় নিয়তির কাছে। আর নিয়তি— সে তো পৃথিবীর সবচেয়ে নির্লিপ্ত দর্শক। সে করতালি দেয় না, সমবেদনাও জানায় না। শুধু নীরবে একটি দরজা বন্ধ করে দেয়। তুমি সে-ই নিয়তিপীড়িত শিল্পী।
তবু বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে, কোনো এক গোধূলিতে, মাঠ খালি হয়ে যাওয়ার বহু বছর পরও, বাতাস হঠাৎ ঘাসের ডগায় একটি পুরনো পদচিহ্ন ফিরিয়ে আনবে। কেউ তার উৎস খুঁজে পাবে না। শুধু মনে হবে— সৌন্দর্য কখনো পুরোপুরি বিদায় নেয় না। সে মানুষের স্মৃতিতে নয়, মানুষের অভাববোধে বেঁচে থাকে। সেই অভাবই হয়তো একদিন আরেকটি শিশুকে বল পায়ে তুলে নিতে শেখাবে, আর পৃথিবী আবারও অপেক্ষা করবে— একটি অসমাপ্ত সৌন্দর্যের পুনর্জন্মের জন্য।
কিছু বিদায় শুধু অপূর্ণ সৌন্দর্যের। মাঠের ঘাসের শ্বাসে লেখা থাকবে— তার আরও কিছু পাওয়ার ছিল। আরও কিছু বিকাল। আরও কিছু বৃষ্টিভেজা দৌড়। আরও কিছু অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার মুহূর্ত। কিন্তু জীবন সব শিল্পীকে তাদের প্রাপ্য দেয় না। কেউ কেউ পৃথিবী ছেড়ে যায় হাতে ট্রফি নিয়ে নয়, মানুষের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা রেখে। সেই শূন্যতাই তাদের প্রকৃত উত্তরাধিকার।
লেখক, কবি ও কথাসাহিত্যিক




