ইরানের যুদ্ধবিরতির ১০ দফা কি মেনে নেবে যুক্তরাষ্ট্র?

যুদ্ধমন্ত্রীকে পাশে রেখে হোয়াইট হাউসে বক্তব্য রাখছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত
পাকিস্তানের শীর্ষ নেতাদের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এতে চীনও তেহরানের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে।
মঙ্গলবার ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ইরানকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার’ ঘোষণা দেন। হুমকির সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র এক ঘণ্টা আগে ওয়াশিংটন ও তেহরান আপাত যুদ্ধ বন্ধে সম্মত হয়। ইরানও সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে রাজি হয়েছে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।
ইরানজুড়ে হামলা বাড়ানোর পরিকল্পনা স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিশ্চিত করেছেন, তিনি ইরানের কাছ থেকে একটি ১০ দফা প্রস্তাব পেয়েছেন, যা স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আলোচনার একটি কার্যকর ভিত্তি।
এখন প্রশ্ন, ইরানের এই পরিকল্পনায় কী আছে এবং ট্রাম্প কি তা গ্রহণ করবেন?
ইরানের ১০ দফা পরিকল্পনায় কী কী দাবি রয়েছে?
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মতে, পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে হোয়াইট হাউসে জমা দেওয়া ১০ দফা শান্তি পরিকল্পনার বিস্তারিত চূড়ান্ত হওয়ার পরেই তেহরান যুদ্ধের পুরোপুরি সমাপ্তি মেনে নেবে।
দফাগুলো :
১. কোনো সময়সীমা ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সম্পূর্ণ ও স্থায়ী অবসান।
২. ইরাক, লেবানন এবং ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান।
৩. হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
৪. হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি প্রোটোকল ও শর্তাবলি প্রতিষ্ঠা করা।
৫. এই অঞ্চলের সমস্ত সংঘাতের সম্পূর্ণ অবসান।
৬. ইরানকে পুনর্গঠন ব্যয়ের জন্য সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ প্রদান।
৭. ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পূর্ণ প্রতিশ্রুতি।
৮. যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা ইরানের তহবিল এবং জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা।
৯. পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি মেনে নেওয়া।
১০. উপরোক্ত শর্তাবলি অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গেই সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া।
যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনাটি হরমুজ প্রণালীর জন্য কী অর্থ বহন করে?
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, দেশটির সামরিক ব্যবস্থাপনার অধীনে প্রণালীটি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হবে। তেহরান জলপথটির ওপর থেকে তার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি শিথিল করে দেবে কিনা, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট জানা যায়নি।
প্রতিবেদন অনুসারে, এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ইরান ও ওমান প্রণালীটি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ওপর প্রতি জাহাজে ২ ডলার পর্যন্ত মাশুল ধার্য করতে পারবে। এরপর ইরান এই সংগৃহীত অর্থ দেশ পুনর্গঠনের কাজে ব্যবহার করবে।
শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হলে তেহরান আবারও প্রণালীটি বন্ধ করার চেষ্টা করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র কি এই ১০ দফা পরিকল্পনা এবং ইরানের প্রস্তাবগুলোতে সম্মত হবে?
প্রায় এক বছর আগে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ও ইরানের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। তাদের ভিন্ন ভিন্ন দাবি এবং উভয়পক্ষের ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা স্থায়ী চুক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার ইরানের দাবিটি বিশেষ চিন্তার কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কারণ সংঘাত শুরু হওয়ার আগেও এই প্রণালীর ওপর তেহরানের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ক্রিস মারফি এ দাবি নিয়ে সিএনএনকে বলেছেন, এই চুক্তি যদি ইরানকে প্রণালীটি নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার দেয়, তবে তা বিশ্বের জন্য ভয়াবহ হবে।
ট্রাম্প নিজে ইরানের দাবিগুলোর বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীতে তৈরি যানজট নিরসনে সহায়তা করবে।
বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের কট্টর দাবিগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হওয়ার সম্ভাবনা কম, বরং তা আলোচনা ভেস্তে দিতে পারে।
ইসরায়েল কি এই চুক্তির অংশ?
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, দুই সপ্তাহের জন্য ইরানের ওপর হামলা স্থগিত করার মার্কিন সিদ্ধান্তকে ইসরায়েল সমর্থন করে। কিন্তু এই যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়।
যদিও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, সম্মত যুদ্ধবিরতিটি লেবাননসহ সংশ্লিষ্ট সবখানে প্রযোজ্য।
নেতানিয়াহুর কার্যালয় দাবি করেছে, তেহরানকে অবশ্যই অবিলম্বে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও এই অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে।
ইসরায়েলের চাওয়া, ইরান যাতে আর কোনো পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি না করে বা ‘সন্ত্রাসী’ হুমকি না দেয় তা নিশ্চিত করা।
লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১,৫০০ জন নিহত এবং আরও ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তেহরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করলে লেবানন এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
এরপর কী হবে?
যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতায় করা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এক এক্স পোস্টে বলেছেন, তিনি শুক্রবার ইসলামাবাদে বৈঠকের জন্য ইরান ও মার্কিন প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
তেহরান বলেছে, তারা আলোচনায় অংশ নেবে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, তারা ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার বিষয়টি বিবেচনা করছে, তবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
শেষ কয়েক ঘণ্টায় কী ঘটেছিল?
মঙ্গলবার গভীর রাতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধ বন্ধের কূটনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে ট্রাম্পকে হামলার সময়সীমা দুই সপ্তাহ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি ইরানকেও দুই সপ্তাহের জন্য হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার অনুরোধ করেন।
সরাসরি মন্তব্য করার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে বার্তা সংস্থা এপিকে দেওয়া দুই কর্মকর্তার মতে, তেহরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীন আলোচনার সময় ইরানকে যুদ্ধবিরতির একটি উপায় খুঁজে বের করতে প্রভাবিত করে।
ট্রাম্প এএফপিকে বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে চীন সাহায্য করেছে।
এ যুদ্ধ মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাকে সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। যার ফলে তার রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে।
জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, বিপুলসংখ্যক আমেরিকান এই যুদ্ধের বিরোধী এবং পেট্রোলের ক্রমবর্ধমান দাম বাড়ায় হতাশ।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়গুলো যুদ্ধ বন্ধে প্রভাবক হতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত

