চীন
এটি যেন শুধু সফরে শেষ হয়ে না যায়

সংগৃহীত ছবি
প্রধানমন্ত্রী তার প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া গেলেন। সেখান থেকে তিনি চীনে গেলেন। দুটি সফরই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং সবাই আগ্রহসহকারে এই সফরের প্রতি নজর রাখছে। বিশেষ করে চীন সফর নিয়ে সবার আগ্রহ বেশি।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেসব দেশ গুরুত্বপূর্ণ, চীন তার ওপরের দিকেই রয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়া ও জাপান বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গুরুত্ববহ দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার চীন। বাংলাদেশে চীনের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। দেশটির সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বৃদ্ধি করার অনেক সুযোগ রয়েছে। দুপক্ষেরই আমদানি-রপ্তানি বাড়ানোর অনেক সুযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর সেই সম্পর্ক বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় বড় প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ রয়েছে। এ ছাড়া চীন বাংলাদেশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে থাকে। যদিও এসব সহযোগিতা ঋণ আকারে দেওয়া হয়, কিন্তু বাংলাদেশ ধীরে ধীরে তা শোধ করে দেয়।
বাংলাদেশে চীনা সহায়তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে প্রযুক্তিগত সহায়তা। চীনা প্রযুক্তিগত সহায়তার সৌন্দর্য হচ্ছে, সহজে তারা টেকনোলজি ট্রান্সফারে রাজি হয়ে যায়। তারা অন্য অনেক দেশের মতো নয়। সাধারণত অন্যান্য দেশ সহজে তাদের প্রযুক্তি হস্তান্তর করতে চায় না, এক্ষেত্রে চীন ব্যতিক্রম। চীন তাদের কোনো প্রকল্পে বাংলাদেশি প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ানদের নিয়োগ দেয় এবং তাদের চীনা প্রযুক্তি শিখতে সহায়তা করে, যাতে পরে বাংলাদেশিরা তা চালিয়ে নিতে পারে।
চীনের বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের দেশের প্রচুর ছাত্রছাত্রী চীন সরকারের স্কলারশিপে পড়তে যায়। অনেকেই নিজ খরচেই চীনে ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও আইটি পড়তে যায়। এমনকি আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটস বিষয়ে পড়তে অনেকে চীনে যাচ্ছে। বাংলাদেশে এখন অনেক বড় বড় জায়গায় চীন থেকে প্রশিক্ষিত লোকজন কাজ করছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে চীনের সঙ্গে ১৫-১৭টি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। চীন সবসময় বাংলাদেশকে বিশেষ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে থাকে। যতবারই কোনো বাংলাদেশি সরকারপ্রধান চীন সফর করেছেন, প্রতিটি সফরকে তারা বিশেষ শিরোনাম করেছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ‘স্ট্র্যাটেজিক ক্লোজার কম্প্রিহেনসিভ পার্টনারশিপ’ নামে মূল্যায়িত করছে।
সুতরাং নিশ্চিতভাবেই এই সফরকে সবাই বিশেষ নজরে দেখছে। সাধারণত এরকম উচ্চপর্যায়ের যখন কোনো সফর হয়, তখন দুপক্ষ থেকে অনেক কিছু বলা হয়, অঙ্গীকার করা হয়। কিন্তু পরে দেখা যায়, হয়তো সেগুলো সবকিছু বাস্তবায়ন ঠিকমতো হচ্ছে না। এখানে দুটি জিনিস হয়, যেহেতু চীন থেকে আমাদের এখানে বিভিন্ন রকমের সাহায্য-সহযোগিতা আসার সুযোগ ও সম্ভাবনা বেশি— সেখানে আমাদের সেটি গ্রহণ করার ক্ষমতাটা থাকা দরকার। আমাদের সেটি গ্রহণ করে সেই জিনিসগুলোকে আত্মস্থ করে নিয়ে ব্যবহার করার ক্ষমতাটা থাকা দরকার। সে জায়গায় আমাদের একটা বড় ঘাটতি আছে। সেজন্য আমরা যখন কিছু নেব, সেখানে কীভাবে সে জিনিসগুলো আত্মস্থ করতে পারি, সে ব্যবস্থাও যেন ওটার মধ্যে থাকে, সেটি আমাদের খেয়াল করতে হবে। আমি নিশ্চিত, প্রধানমন্ত্রী সে ব্যাপারে খেয়াল রাখবেন। এ ব্যাপারে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ২০১৬ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ সফরের কথা বলা যায়। ওই সফরে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে অনেক বিনিয়োগ ও আর্থিক সহযোগিতা চুক্তি হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি পর্যায়ে ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং বেসরকারি পর্যায়ে ১৩টি চুক্তি হয়েছে। চীন বাংলাদেশকে বিভিন্ন খাতে ২৪ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার অঙ্গীকার করে। কিন্তু বাংলাদেশ এই ঋণের মাত্র ৭-৮ বিলিয়ন ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে।
চীনের সঙ্গে আমাদের যে বাণিজ্যে ঘাটতি রয়েছে, তাকে বড় করে না দেখে কীভাবে সুযোগ তৈরি করা যায়, সে হিসেবে দেখা উচিত। কারণ চীন থেকে আমরা যেসব জিনিস আমদানি করি, সেগুলো আবার প্রক্রিয়াজাত করে যে প্রোডাক্ট হয় সেগুলো আমরা অন্য দেশে বিক্রি করি। সুতরাং সেটি ভেবে চিন্তা করতে হবে আমরা কী করছি আর আমাদের সুযোগ মতো কী কী জিনিস চীনে রপ্তানি করতে পারি, সে জিনিসের ব্যাপারে আমাদের আরেকটু নজর দিতে হবে। সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনা ব্যবসায়ীদের আলাদা কর্মসূচি রয়েছে। তাদের উদ্বুদ্ধ করবেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে এবং এখানে বিনিয়োগ করে যে উৎপাদন, সেটির একটি বড় অংশ যাতে তারা ওখানে নিয়ে যায়।
সুতরাং, এই সফরে যা কিছুই অর্জিত হোক না কেন, তা যেন বাস্তবায়নে আমরা দক্ষতার পরিচয় দিতে পারি। এটি যেন শুধু প্রধানমন্ত্রীর সফরে শেষ হয়ে না যায়, পরে আমরা কী করি, সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত




