ঢাকা-মিয়ানমার-কুনমিং করিডর : স্বপ্ন নাকি অর্থনীতির নতুন দিগন্ত?

ঢাকা–মিয়ানমার–কুনমিং করিডর—ছবি : এআই
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভৌগোলিক সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ দীর্ঘকাল ধরেই আঞ্চলিক যোগাযোগের একটি প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। এই স্বপ্নের একটি বাস্তব ও জোরালো রূপ হলো ঢাকা থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত সড়ক ও রেল করিডর। আপাতদৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী মনে হলেও বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় এর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে একটি সম্ভাবনাময় ধারণাকে বাস্তবে রূপান্তর করতে হলে যে ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অবকাঠামোগত প্রস্তুতি এবং কূটনৈতিক দূরদর্শিতা প্রয়োজন, বাংলাদেশ সেই পথ কতখানি মসৃণ করতে পারবে, তা নিয়েই মূল আলোচনা।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে এই করিডর বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগই সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল, যা সময়সাপেক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল। কুনমিং পর্যন্ত সরাসরি স্থলপথ উন্মুক্ত হলে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর পাশাপাশি মিয়ানমার এবং ক্রমান্বয়ে থাইল্যান্ড, লাওস ও কম্বোডিয়ার মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান বাজারগুলোতে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার সহজ হবে। আমাদের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, কৃষিপণ্য, চামড়াজাতদ্রব্য এবং হালকা প্রকৌশলসামগ্রী নতুন বাজার পাবে। এর ফলে দেশের রপ্তানি ঝুড়িতে বৈচিত্র্য আসবে এবং একটি বা দুটি বাজারের ওপর একক নির্ভরতা কমবে।
বাণিজ্যিক প্রসারের পাশাপাশি ট্রানজিট অর্থনীতি হিসেবেও বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে এই করিডর। ভারত, চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থান করার কারণে বাংলাদেশ যদি নিজেকে একটি কার্যকর সংযোগ সেতু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক নতুন জোয়ার আসবে। ট্রানজিট সুবিধা থেকে শুধু সরাসরি রাজস্বই আসবে না, বরং এর সঙ্গে সম্পর্কিত লজিস্টিকস, গুদামজাতকরণ, পরিবহন, আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং সেবা খাতে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে।
তবে এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে। বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবেই ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতি মেনে চলে। এই করিডর বাস্তবায়নের মাধ্যমে একদিকে যেমন চীনের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হবে, অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সংগঠন আসিয়ানের সঙ্গেও নৈকট্য বাড়বে। চ্যালেঞ্জটি হলো, এই অঞ্চলটি বর্তমানে ভারত ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতার একটি প্রধান ক্ষেত্র।
বাংলাদেশ যাতে কোনোভাবেই এই দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্বে জড়িয়ে না পড়ে এবং নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে উভয়পক্ষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, তার জন্য অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দূরদর্শী কূটনীতির প্রয়োজন হবে।
করিডরটির বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাস্তব বাধা হলো নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা। বিশেষ করে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রাখাইন রাজ্যসহ সীমান্ত এলাকায় চলমান গৃহযুদ্ধ এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয়তা এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলে। একটি অনিরাপদ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনা করা অসম্ভব। তা ছাড়া স্থলপথের এই উন্মুক্ততার সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র যাতে মানবপাচার, অস্ত্র ও মাদকের চোরাচালান বাড়াতে না পারে, সে জন্য কঠোর সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা নজরদারি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। মিয়ানমারে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা না ফিরলে এই করিডরের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন অসম্ভব।
এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে রোহিঙ্গা সংকট। বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু মানবিক সমস্যা নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত এক জটিল সংকট। মিয়ানমারের সঙ্গে যেকোনো ধরনের বৃহৎ অর্থনৈতিক চুক্তি বা করিডর স্থাপনের আলোচনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি সবার আগে গুরুত্ব পাওয়া উচিত। অর্থনৈতিক স্বার্থের লোভে যেন এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান উপেক্ষিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় আলোচনায় বাংলাদেশকে এই অবস্থানটি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে হবে, যাতে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের পাশাপাশি মানবিক ন্যায়বিচারও নিশ্চিত হয়।
পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক এই করিডরের পূর্ণ সুফল পেতে হলে বাংলাদেশের নিজের ঘর গোছানো প্রয়োজন। শুধু একটি আন্তঃদেশীয় সড়ক বা রেললাইন তৈরি করলেই হবে না, দেশের অভ্যন্তরেও ব্যাপক অবকাঠামোগত সংস্কার আনতে হবে। আধুনিক ও দ্রুতগতির অভ্যন্তরীণ রেল নেটওয়ার্ক, কাস্টমস ও বন্দর ব্যবস্থাপনার শতভাগ ডিজিটাল রূপান্তর, সীমান্ত চৌকিগুলোর আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের লজিস্টিক হাব গড়ে তোলা ছাড়া এই করিডর কার্যকর হবে না।
ঢাকা-মিয়ানমার-কুনমিং করিডর বাংলাদেশের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ। আঞ্চলিক রাজনীতির প্রতিযোগিতায় কোনো পক্ষের হাতিয়ার না হয়ে নিজের ভৌগোলিক অবস্থানকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করতে পারলেই বাংলাদেশ এশিয়ার অর্থনীতির এক নতুন দিগন্তে পা রাখবে।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
masarker@bau.edu.bd





