বাবাই আমার অনুপ্রেরণা ও শিক্ষক

সাবরিনা সিনহা
‘যেটাই হোক না কেন, কোনো ভুল বা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগলে ভয় না পেয়ে সোজা আমার কাছে চলে আসবে’— ছোটবেলা থেকেই বাবা এ কথা বলতেন আমাদের। পরিবারে বাবার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা ছিল বন্ধুর মতো। দেখতে দেখতে আটটি বছর পেরিয়ে গেছে বাবা আমাদের মাঝে নেই।
বাবাকে আমি শুধু একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে দেখিনি, দেখেছি একজন মমতাময়ী বাবা ও জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে। ব্যস্ততম কাজের মধ্যেও বাবা পরিবারের জন্য প্রতিদিন সময় রাখতেন। রাত ১১টা বাজলেও অপেক্ষায় থাকতাম। বাবা ফিরলে সবাই মিলে একসঙ্গে রাতের গল্প-স্বল্প সেরে ঘুমাতে যেতাম।
২০০২ সালে বাবা আমাকে ব্যবসার কাজে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন। ধানমন্ডি আবাহনী মাঠের বিপরীতে আমাদের পুরনো অফিসে বাবার ডেস্কের পাশে আমার জন্য একটি ছোট টেবিল বসিয়ে দেন। প্রথমে মনে হয়েছিল, বাবার পাশে বসে কাজ করাটা কেমন যেন! কিন্তু আজ বুঝতে পারি, ওই দিনগুলোই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। স্বচক্ষে দেখেছি কীভাবে মানুষের সঙ্গে শ্রদ্ধাপূর্ণ ব্যবহার করা এবং জটিল পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। কাজের প্রতি তার এই হাতে-কলমে শিক্ষাই আমার ক্যারিয়ারের ভিত্তি।
২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসের একটি স্মৃতি আজও খুব মনে পড়ে। হঠাৎ করেই বাবা বললেন, চলো, আমরা বড় সফরে যাব। আমাদের বাচ্চারা বড় হচ্ছিল, সবার পড়াশোনা ও ব্যস্ততার মধ্যে একসঙ্গে সময় কাটানো কঠিন হয়ে পড়েছিল; কিন্তু বাবা সবাইকে এক সুতোয় বাঁধলেন। পুরো পরিবার— ভাই, ভাবী, নাতি-নাতনিদের নিয়ে ইউরোপ সফরটা ছিল জীবনের অন্যতম সেরা ও স্মরণীয় সময়। তিনি হয়তো অনুধাবন করেছিলেন, সেটিই হবে আমাদের সঙ্গে শেষ দূরযাত্রার স্মৃতি।
বাবা খুব বেশি কথা বলতেন না, নিজেকে জাহিরও করতেন না; কিন্তু যে কাজটিই করতেন, তাতে নিজের ১০০ ভাগ উজাড় করে দিতেন। তার কাছ থেকে শেখা এ নীতি আমি আজও মেনে চলি— যে কাজে শতভাগ আত্মনিয়োগ করা সম্ভব নয়, সে কাজে হাত না দেওয়াই শ্রেয়।
ব্যবসায়িক দূরদর্শিতার পাশাপাশি ক্রীড়াঙ্গন ও সামাজিক উন্নয়নকাজে বাবার অবদান ছিল অপরিসীম। বিশেষ করে, বাংলাদেশ ক্রিকেটের অগ্রগতি ও ঘরোয়া ক্রীড়াকাঠামো জোরদারে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন— একটি সুস্থ, নিয়মানুগ ও সুন্দর সমাজ গঠনে তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলা এবং গঠনমূলক সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। তাই হাজারো ব্যস্ততার মধ্যেও ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে নিজের অর্পিত দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতেন।
ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনে বাবা ছিলেন সময়সচেতন এবং নীতিপরায়ণ একজন মানুষ। পারিবারিক কিংবা ব্যবসায়িক যেকোনো জটিল সংকটে তিনি কখনো খেই হারিয়ে ফেলতেন না; বরং ধীরস্থির ও শান্ত মাথায় বিচক্ষণতার সঙ্গে সঠিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করতেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নিজের নীতি ও আদর্শ থেকে একচুলও সরে আসেননি। তার আপসহীন সততা, মানুষের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা এবং কাজের প্রতি অবিচল নিষ্ঠাই আজ একমি পরিবারকে এক অনন্য ও মর্যাদাপূর্ণ উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আমার দাদা ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের পথিকৃৎ, বাবা ও চাচারা একে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাদের রেখে যাওয়া এই বিশাল নাম ও সুনামের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা আমাদের তৃতীয় প্রজন্মের জন্য দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ। আমরা আজও তাদের আদর্শ, কর্মপদ্ধতি ও মূল্যবোধ অনুসরণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।




