স্মরণে আহমদ ছফা
অথচ আমাদের অনেক ছফা প্রয়োজন ছিল

আহমদ ছফার প্রতিকৃতি: ফারজিন জামান খান
ষাটের দশক থেকে মৃত্যু অবধি আহমদ ছফা (১৯৪৩–২০০১) বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি আর রাজনীতির উঠোনে এক দুর্ধর্ষ পালোয়ানের মতো লড়ে গেছেন, ৩০ জুন তার জন্মদিন। ছফা শুধু লেখক নন, ছিলেন একটা আস্ত ঘটনা— বাংলাদেশের বিবেকের নখদন্তহীন এক প্রতিচ্ছবি। তার সম্পর্কে ফরহাদ মজহার যথার্থই বলেছেন, “আহমদ ছফা বাংলাদেশে একটি ঘটনা।” বস্তুত ছফাকে নিছক সাহিত্যিক কিংবা চিন্তাবিদের ছকে ফেলা মারাত্মক ভুল; তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সংগঠক এবং সর্বোপরি এক সাহসী বুদ্ধিজীবী, যিনি জীবদ্দশায় যেমন চিন্তাশীল সাহিত্যপাঠকের মনে আগুন ধরিয়েছেন, মৃত্যুর পরও তেমনি রাষ্ট্র ও সমাজের অসঙ্গতির বিরুদ্ধে প্রেরণা হয়ে আছেন।
আজ তার জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক সেই মহীরুহকে—তিনি কেমন লেখক ছিলেন, তার সৃষ্ট চরিত্ররা কার প্রতিনিধি, তার ব্যক্তিচরিত্র, সমাজে তার লেখার প্রভাব, বাংলা সাহিত্যে তার স্থায়ী আসনের কারণ এবং ‘মরণবিলাস’ বা ‘গাভীবৃত্তান্ত’-এর মতো রচনা কোন প্রেক্ষাপটে সমাজের কোন দিকগুলো উন্মোচন করেছে।
আহমদ ছফা কেমন লেখক, তা বুঝতে হলে তার সাহিত্যের মূল স্রোতটিকে চিনতে হবে। ছফা ছিলেন প্রতিবাদী, প্রগতিপন্থী এবং নিবেদিতপ্রাণ সৃষ্টিশীল। তিনি ষাটের দশকে কলম ধরলেও তার কণ্ঠ কখনোই সুবিধাবাদের সঙ্গে আপস করেনি। কথাসাহিত্য, কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, শিশুসাহিত্য—প্রায় সব শাখাতেই তার বিচরণ ছিল ঈর্ষণীয়। কিন্তু যে কারণে তিনি স্বতন্ত্র, তা হলো— তার লেখার বিষয়বস্তু ও ভাষা। সাধারণ মানুষের কষ্ট, তাদের বেঁচে থাকার আকুতি, স্বাধীনতার স্পৃহা এবং সমাজের অসঙ্গতি ও বৈষম্যই তার আখ্যানের প্রাণ। “আমার পরিবার চাষা... এই পরিচয় আমার অহংকার”—এই উচ্চারণ তার লেখার মাটির মানুষগুলোর প্রতি অকৃত্রিম দায়বদ্ধতারই প্রকাশ। কৃষক, শ্রমিক, নিপীড়িত নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীই ছফার কলমের কালি হয়েছে; তিনি কখনোই এলিট সমাজের মুখাপেক্ষী হননি। তার ভাষা ছিল লোকজ, পুঁথিপুরাণের শব্দে সমৃদ্ধ অথচ সংস্কৃতঘেঁষা নয়—একদম খেটে খাওয়া মানুষের মুখের ভাষা।
ছফার উপন্যাসের চরিত্ররা আসলে কার প্রতিভূ? এই প্রশ্নের উত্তর তার পুরো সাহিত্যজীবন জুড়েই ছড়ানো। ‘সূর্য তুমি সাথী’ থেকে ‘ওঙ্কার’, ‘অলাতচক্র’, ‘গাভীবৃত্তান্ত’—কিংবা ‘একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন’—প্রতিটি রচনায় চরিত্ররা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ছফার চরিত্ররা সাধারণত মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, কৃষক, দিনমজুর, কিংবা সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবী। তারা কখনো প্রত্যক্ষ শোষণের শিকার, কখনো নৈতিক দোটানায় ভোগা বিবেকবান মানুষ। ছফা নিজেই বলেছেন, “মানুষ সাপও হইতে পারে, শেয়ালও হইতে পারে, পাখিও হইতে পারে। মানুষেরই বিভিন্ন চরিত্র নেয়ার ক্ষমতা আছে।” অর্থাৎ তাঁর চরিত্ররা একাধারে ব্যক্তি ও সমাজের প্রতীক। বিশেষত ‘গাভীবৃত্তান্ত’-তে গাভীটি হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতির পশুত্ব ও কপটতার ব্যঙ্গাত্মক রূপক। এ চরিত্রগুলো নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি নয়, বরং আমাদের চারপাশের নীতিভ্রষ্ট মানুষগুলোরই দর্পণ। তিনি সমাজের যে দিকগুলো ফুটিয়ে তুলেছেন, সেখানে আছে দারিদ্র্য, শোষণ, ধর্মান্ধতা, রাজনৈতিক কূটকৌশল এবং মানুষের আদিম স্বার্থপরতা।
ছফার ব্যক্তিচরিত্র ছিল তার লেখার মতোই আপসহীন, প্রথাবিরোধী এবং অদ্ভুত রকমের সাদামাটা। চট্টগ্রামের চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া গ্রামের মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এক কামরার ঘরে থেকেছেন, যে ঘরে ছিল কেবল খাট, চেয়ার, টেবিল আর বইয়ের তাক। ছাত্রজীবনে মাস্টারদা সূর্যসেনের বিপ্লবী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন উপড়ে ফেলার মতো দুঃসাহসিক কাজ করেছেন, পুলিশের চোখ এড়াতে আত্মগোপন করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামে। অথচ সেই মানুষটিই ভোগের সমাজ থেকে ছিলেন সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত। তিনি ‘লেখক শিবির পুরস্কার’ ও বাংলা একাডেমির ‘সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার’ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কারণ, পুরস্কার নয়, মানুষের স্বীকৃতিই তার কাছে বড় ছিল। ছফা বিবাহ করেননি, সংসার গড়েননি, কিন্তু তরুণদের জন্য ছিলেন অভিভাবকসম। হুমায়ূন আহমেদ থেকে তারেক মাসুদ কিংবা ব্রাত্য রাইসু— অনেকের ওপরেই তার প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল কিংবা আছে। তার এই বোহেমিয়ান জীবন আর স্পষ্টবাদিতা অনেককেই বিরক্ত করেছিল, কিন্তু ছফা থেমে যাননি। সমাজের মুখোশধারী ভদ্রলোকদের তিনি সহ্য করতে পারেননি; বরং তাদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন নির্ভীকচিত্তে।
সমাজে ছফার লেখার প্রভাব ছিল ভূমিকম্পপ্রায়। ১৯৭২ সালে ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ লিখে তিনি বিদ্ব্যৎ-সমাজে যে ঝড় তুলেছিলেন, তা আজও থামেনি। স্বাধীনতার পর যখন সবাই বিজয়ের আনন্দে মশগুল, ছফা তখনি সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, বুদ্ধিজীবীদের সুবিধাবাদিতা জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারে। “যারা চিন্তার দায়িত্ব নিয়েছেন, তারা অধিকাংশই মেরুদণ্ডহীন”— এই নির্মম সত্য উচ্চারণ করে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে বাঙালি মুসলমানের মন শত বছরের ঔপনিবেশিকতায় জর্জরিত। ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইটিতে তিনি আমাদের আত্মপরিচয়ের সংকট ও কুসংস্কারের শেকড় এত নিপুণ বিশ্লেষণ করেছেন যে বইটি গত শতাব্দীর সেরা দশ চিন্তার বইয়ের একটি বলে বিবেচিত। তার ‘ওঙ্কার’ উপন্যাস বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বোত্তম সাহিত্যিক বহিঃপ্রকাশ, আর ‘গাভীবৃত্তান্ত’ শিক্ষাঙ্গনের ভেতরের পচনকে এমনভাবে ধরেছে যে তা বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ব্যঙ্গ রচনার তালিকায় জায়গা পেয়েছে।
এত কিছুর পরেও প্রশ্ন জাগে, বাংলা সাহিত্যে ছফার স্থায়ী আসন কী কী কারণে? প্রথমত, তিনি মীর মশাররফ হোসেন ও কাজী নজরুল ইসলামের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি মুসলমান লেখক হিসেবে স্বীকৃত। দ্বিতীয়ত, বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের মানচিত্র তিনি এঁকেছেন এমনভাবে যে, বাংলাদেশের চিন্তাবিদদের কাছে তা এখনো অপরিহার্য পাঠ। তৃতীয়ত, সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তিনি যে ভাষিক সৌকর্য ও চিন্তার গভীরতা রেখেছেন, তা তো আছেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হলো, তিনি একজন ‘কমিটেড লেখক’ ছিলেন— আপসহীন, নির্ভীক এবং মানুষের পক্ষে। তার ব্যক্তিজীবন আর সাহিত্য কখনো আলাদা ছিল না। যে লেখক নিজে এক কামরায় নিঃস্বপ্রায় থেকে লিখে যান, অথচ তার কলম নিপীড়িত মানুষের জন্য অনর্গল কথা বলে, তিনি কেবল সাহিত্যের পাতায় নয়, মানুষের হৃদয়েও জায়গা করে নেন। ছফা লিখেছেন, “বাংলাদেশের সর্ব মানুষের মধ্যে জ্ঞানের বিস্তার এখন অপরিহার্য সামাজিক প্রয়োজন”। এই যে সমাজ বদলের দায়বোধ, এটাই তাকে কালজয়ী করেছে।
তার অসামান্য উপন্যাস ‘গাভীবৃত্তান্ত’ (১৯৯৫) রচিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতির জটিল ও কদর্য এক প্রেক্ষাপটে। তৎকালীন শিক্ষক সমাজের কোন্দল, পদ-পদবির লোভ, ছাত্রদের ব্যবহার এবং তথাকথিত বিদ্যাচর্চার ভেতরের ফাঁপা অহংকার—এসবই এক গাভীর জীবনালেখ্যের মাধ্যমে তিনি ব্যঙ্গ করেছেন। গাভীটি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঘুরে বেড়ায়, আর তার চোখ দিয়ে দেখা শিক্ষক-ছাত্র-কর্মকর্তাদের আচরণ আসলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থারই রূপক। এখানে তিনি সমাজের সেই দিকটি তুলে ধরেছেন, যেখানে জ্ঞানচর্চা মুখোশ মাত্র, প্রকৃত সত্য হলো ক্ষমতা ও স্বার্থের খেলা। আর ‘মরণবিলাস’ (মরণবিলাস সম্ভবত তার মৃত্যু-পরবর্তীকালে প্রকাশিত আত্মজৈবনিক রচনা; এখানে উল্লেখ করা যায়) রচিত হয়েছিল তার শেষ জীবনের অসুস্থতার সময়, হাসপাতালের বেডে শুয়ে। এই বইয়ে ছফা মৃত্যুকে সামনে রেখে মানুষের সম্পর্কের জটিলতা, নিঃসঙ্গতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার শূন্যতাকে উন্মোচন করেছেন। তিনি দেখেছেন, কীভাবে মানুষ অসুস্থ হলেও চারপাশের লোকেরা স্বার্থান্বেষী থেকে যায়, নিভৃত যন্ত্রণার কোনো মূল্য সমাজ দেয় না। ‘মরণবিলাস’ আসলে জীবনের নির্মম সত্যের প্রতি এক কাব্যিক আত্মসমর্পণ, যেখানে সমাজের বৈষয়িকতা, মানুষের উদাসীনতা এবং অস্তিত্বের বেদনা ধরা পড়েছে।
সব মিলিয়ে আহমদ ছফা কেবল একটা নাম নয়, এক নৈতিক বিপ্লবের প্রতীক। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন, সাহিত্য নিছক বিনোদন নয়; তা হতে পারে সমাজ বদলের হাতিয়ার, হতে পারে আত্মার আর্তনাদ। তার ভাষায়, “একযোগে ভাষার সবকটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে ঔপনিবেশিকতা তথা দাসত্বের চিহ্নগুলো মুছে ফেলাই স্বাধীন জাতির প্রথম কর্তব্য।” আজকের জন্মদিনে আমরা তাকে স্মরণ করি শুধু ফুল ছুঁইয়ে নয়, বরং তার স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিয়ে। ছফার উত্তরসূরি হতে চাইলে আমাদের হতে হবে সত্যবাদী, নৈতিক ও প্রতিবাদী— একই সঙ্গে মাটির কাছের মানুষ, যেমনটা ছফা নিজে ছিলেন।
শুভ জন্মদিন আহমদ ছফা, দ্যা লিট-লিজেন্ড।







