কুশল-সুষমার সংসার ভেঙেছে, নাকি আমাদের কল্পনা?

ডা. সায়েদুল আশরাফ কুশল ও ডা. সুষমা রেজা
ডা. সুষমা রেজা ও ডা. সায়েদুল আশরাফ কুশলের বিবাহবিচ্ছেদের খবরটি প্রকাশ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেল, সেটি হয়তো কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অন্য কোনো আলোচনায় চাপা পড়ে যাবে। কিন্তু ঘটনাটি আমাদের সমাজ সম্পর্কে যে প্রশ্নগুলো সামনে এনে দিয়েছে, সেগুলো এত সহজে হারিয়ে যাবে না।
আমরা কেন এত অবাক হলাম?
কারণ আমরা আসলে তাঁদের বিচ্ছেদ দেখিনি; আমরা দেখেছি আমাদের তৈরি করা একটি ‘আদর্শ দম্পতির’ ছবির ভেঙে পড়া।
আমরা মানুষকে খুব সহজে মানুষ হিসেবে দেখতে ভুলে যাই। আমরা ভুলে যাই রক্ত মাংসের সাধারণ মানুষ—যে ভুল করবে, শিখবে, নতুন ভুল করবে, আবার শিখবে। কিন্তু আমরা মানুষকে খুব দ্রুত প্রতীকে পরিণত করি। কেউ ‘আদর্শ দম্পতি’, কেউ ‘আদর্শ বাবা-মা’, কেউ ‘আদর্শ পরিবার’, কেউ ‘আদর্শ চিকিৎসক’, কেউ 'আদর্শ বস। আমরা তাঁদের জীবনের কিছু নির্বাচিত মুহূর্ত দেখে একটি পূর্ণাঙ্গ গল্প বানিয়ে ফেলি। তারপর সেই গল্পকেই সত্যি বলে বিশ্বাস করতে শুরু করি।
বাস্তবে তা কী এতটা সরল?
একজন মানুষের পরিচয় কখনোই একটি মাত্র শব্দে আটকে থাকে না। তিনি একই সঙ্গে সফলও হতে পারেন, ক্লান্তও হতে পারেন; অন্যকে পরামর্শ দিতে পারেন, আবার নিজের জীবন নিয়েও সংগ্রাম করতে পারেন।
কিন্তু আমরা এই জটিলতাকে মেনে নিতে চাই না। আমরা নিখুঁত মানুষ চাই।
সমস্যা হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই প্রত্যাশাকে আরও শক্তিশালী করে। সেখানে মানুষ জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত দেখায় না; দেখায় বেছে নেওয়া মুহূর্ত। হাসিমুখের ছবি, ভ্রমণ, পরিবারের সময়, অর্জন, ভালোবাসার ছোট ছোট প্রকাশ—এসবই বেশি জায়গা পায়। কারণ এটাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্বাভাবিক ভাষা। দর্শকরাও এমন গল্পই দেখতে পছন্দ করেন।
এখানে আরেকটি বাস্তবতাও আছে। আজকের ডিজিটাল পৃথিবীতে ব্যক্তিগত পরিচয়ও অনেক সময় একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর কিংবা মোটিভেশনাল স্পিকার—অনেকেই মানুষের আগ্রহ, বিশ্বাস এবং প্রত্যাশা বুঝে নিজের পরিচয় তৈরি করেন। এটি সবসময় নেতিবাচক নয়; বরং পেশাগত যোগাযোগের একটি স্বীকৃত উপায়।
কিন্তু একটি ব্র্যান্ড কখনোই একজন মানুষের সম্পূর্ণ জীবন নয়। আমরা ইন্টারনেটে বা ইন্টারনেটের বাইরে, সামাজিক মাধ্যমে অথবা পারিবারিক কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় সম্পর্কের যে "ব্র্যান্ড" দেখি, তা বাস্তব জীবনের পুরোটা নয়।
ক্যামেরার সামনে বা জনমানুষের ভিড়ে যে হাসি দেখা যায়, সেটি বাস্তব হতে পারে। আবার সেই হাসির আড়ালেও ব্যক্তিগত সংকট থাকতে পারে। একটি সুন্দর পারিবারিক ছবি সত্য হতে পারে, কিন্তু সেই ছবির বাইরে সম্পর্কের টানাপোড়েনও একই সঙ্গে সত্য হতে পারে। এই দুই বাস্তবতা একে অপরকে বাতিল করে না।
সম্ভবত কুশল ও সুষমার বিচ্ছেদের ঘটনাটি আমাদের সেটাই মনে করিয়ে দিল—জনসমক্ষে দৃশ্যমান জীবন আর ব্যক্তিগত জীবন কখনো এক জিনিস নয়।
আর এখানেই আমরা সবচেয়ে বড় ভুলটি করি। আবার কুশল ও সুষমার ২০ বছরের সংসারজীবনের পুরোটাই ভুল বা অপচয়—এ কথাও ঠিক নয়।
আমরা ধরে নিই, একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের নিজের মানসিক সমস্যা থাকতে পারে না। একজন কাপল কাউন্সিলরের নিজের সম্পর্ক ভাঙতে পারে না। একজন চিকিৎসক অসুস্থ হবেন না। একজন পুষ্টিবিদ কখনও অস্বাস্থ্যকর খাবার খাবেন না। একজন মোটিভেশনার স্পিকার কখনও বিষণ্নতায় ভুগবেন না।
কিন্তু কেন?
বিশ্বজুড়ে চিকিৎসকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা ভিন্ন কথাই বলে। চিকিৎসকদের মধ্যে বার্নআউট, বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং মানসিক ক্লান্তি উল্লেখযোগ্য হারে দেখা যায়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই। প্রতিদিন মানুষের ট্রমা, আত্মহত্যার ঝুঁকি, সম্পর্কের ভাঙন, মানসিক অসুস্থতা ও গভীর যন্ত্রণা শুনতে শুনতে তাঁর নিজের মনও ক্লান্ত হতে পারে। গবেষণা বলছে, চিকিৎসকেরাও মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের ঝুঁকিতে থাকেন এবং বার্নআউট তাঁদের পেশার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে কোনো নির্দিষ্ট সম্পর্ক ভাঙার কারণ আমরা জানি। জানার কথাও নয়। কিন্তু অন্তত এটুকু বোঝা দরকার—যিনি অন্যের মানসিক সুস্থতার জন্য কাজ করেন, তিনি নিজেও একজন মানুষ। তাঁরও সীমাবদ্ধতা আছে, ক্লান্তি আছে, ব্যক্তিগত জীবন আছে।
আমরা প্রায়ই পেশাগত জ্ঞানকে ব্যক্তিগত পরিপূর্ণতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি।
একজন চিকিৎসক রোগীকে বলতে পারেন, ‘লাল মাংস কম খান।’ কিন্তু তিনি নিজেও হয়তো লাল মাংস সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন। একজন কার্ডিওলজিস্ট হয়তো নিয়মিত ব্যায়াম করতে পারেন না। একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হয়তো জীবনের কোনো পর্যায়ে নিজেও কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজন অনুভব করেন। বিশ্বের অনেক খ্যাতনামা মনোচিকিৎসক ও কাউন্সেলরও নিজের মানসিক সুস্থতার জন্য কাউন্সেলিং বা সুপারভিশনের সহায়তা নেন।
এতে তাঁদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান মিথ্যা হয়ে যায় না।
কারণ চিকিৎসা, মনোবিজ্ঞান কিংবা জনস্বাস্থ্য—এসব বিজ্ঞানের ভিত্তি ব্যক্তিগত পরিপূর্ণতা নয়; গবেষণা, প্রমাণ এবং পেশাগত দক্ষতা।
সমস্যা হলো, আমরা একজন মানুষের কাছ থেকে এমন এক ধরনের নৈতিক পরিপূর্ণতা প্রত্যাশা করি, যা বাস্তবে কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।
আর যখন সেই কল্পিত পরিপূর্ণতার সঙ্গে বাস্তবতার সংঘর্ষ হয়, তখন আমরা হতাশ হই। তারপর শুরু হয় ব্যাখ্যা খোঁজা, গুজব তৈরি করা, একজনকে নায়ক আর আরেকজনকে খলনায়ক বানানোর চেষ্টা।
সব সম্পর্কের ভাঙনের পেছনে প্রতারণা থাকে না। সব বিচ্ছেদের পেছনে নাটকীয় কোনো ঘটনা থাকে না। কখনও কখনও দুটি মানুষ শুধু এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, একসঙ্গে থাকার চেয়ে আলাদা থাকাই তাঁদের জন্য ভালো।
এটিও একটি বাস্তবতা।
সমান্তরাল আরেকটি বাস্তবতা হলো—প্রচার, ভাইরাল কনটেন্ট, জনপ্রিয়তা কিংবা অর্থ—কোনোটিই একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের অপূর্ণতা বা অপ্রাপ্তিকে ঢেকে রাখতে পারে না।
ডা. সায়েদুল আশরাফ কুশল ও ডা. সুষমা রেজার বিচ্ছেদের ঘটনার মতো অনেক ঘটনা রয়েছে। ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতা নুসেইর ইয়াসিন (Nas Daily) ও অ্যালাইন তামিরের বিচ্ছেদেও লাখো অনুসারী একইভাবে বিস্মিত হয়েছিল। কারণ অনলাইনে তাঁদের সম্পর্ক ছিল যেন ‘স্বপ্নের সম্পর্ক’। কিন্তু বিচ্ছেদের সময় তাঁরা নিজেরাই বলেছিলেন, ক্যারিয়ার, সময় দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে মৌলিক অমিল তাঁদের আলাদা করে দিয়েছে। অর্থাৎ, পর্দায় দেখা সুখের গল্প আর ব্যক্তিগত বাস্তবতা এক নয়। হয়তো এই পার্থক্যটি আমরা বারবার ভুলে যাই।
আবারও বলছি, কুশল-সুষমা কয়েক সপ্তাহ পর মানুষের আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে যাবে। কিন্তু এই ঘটনাকে ঘিরে আমাদের প্রতিক্রিয়া থেকে যাবে। আমরা কি অন্যের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে সম্মান করতে শিখছি, নাকি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে জনসমক্ষে আলোচনা ও বিনোদনের উপাদান বানিয়ে ফেলছি? যা আমাদের সামাজিক মানসিকতারও প্রতিফলন। হয়তো এই প্রশ্নটির উত্তরই আজ সবচেয়ে বেশি জরুরি।
লেখক: গণমাধ্যম ও উন্নয়নকর্মী




