শহীদুল জহিরকে যেমন দেখেছি

শহীদুল জহির
গত কয়েকদিন যাবৎ প্রয়াত কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহিরকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তার লেখার সমালোচনা হচ্ছে। পরলোকগত মানুষের জীবন ও কর্ম নিয়ে কারও কটুক্তি বা সমালোচনা শোভনীয় নয়। তিনি থাকেন বিতর্কের ঊর্ধ্বে। ২০০৮ সালের মার্চ মাসে আকস্মিক ভাবে তার জীবনাবসান হয়। একে অকাল প্রয়াণ বলা যায়। তিনি একজন সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। মাত্র ৫৪ বছর বয়সের দায়িত্বশীল এক সিভিল সার্ভেন্ট, যিনি কর্মরত অবস্থায় চলে যান। জীবদ্দশায় লেখালেখির মাধ্যমে তার খুব বেশি নাম-যশ হয়নি। মুখ্যত সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ আমলা হিসেবে সচিবালয়ে তার পরিচিতি ছিল। মোহাম্মদ শহীদুল হক নামে তিনি সরকারি চাকরির সর্বোচ্চ শিখরে আসীন ছিলেন। প্রয়াণের আগে তিনি বাংলাদেশ সরকারের ভারপ্রাপ্ত সচিব ছিলেন।
২.
২০০৭ সালের শেষ দিকে এক অপরাহ্নের ঝলমলে স্মৃতির কথা আজো মনে পড়ে। দেশে তখন ১/১১ নামে পরিচিত ড. ফখরুদ্দীন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায়। আমি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের (সংযুক্ত) উপসচিব। পরিকল্পনা কমিশনের এক সভায় অংশ নেওয়ার জন্যে আগারগাঁও কমপ্লেক্সে যাই। সভা শেষে বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম। একজন সিনিয়র সহকর্মীর সঙ্গে সচিবালয়ে ফিরতে হবে। হঠাৎ করে কালো জীপগাড়ির গ্লাস নামিয়ে তিনি জানতে চাইলেন, ‘আমি সচিবালয়ে যাব কিনা’?
মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ যাব।
তিনি বললেন, ‘উঠুন’।
আমি তার গাড়িতে ডান পাশে বসলাম। প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ মিনিট সময় তার সঙ্গে ছিলাম। অল্প দু’চারটা কথা হলো। আমার মনে হয়েছিল, তিনি মিতভাষী এবং কিছুটা অন্যমনস্ক। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোন জেলা, কোন মন্ত্রণালয়, পদবী কী’, এইটুকু।
জানলাম, তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব। তখন সচিবদের ছয়মাস ভারপ্রাপ্ত থাকার বিধান ছিল। তিনি ছিলেন ভূতপূর্ব সচিবালয় সার্ভিসের কর্মকর্তা। মাঠ প্রশাসনে চাকরি করেছেন বলে মনে হয় না। তবে বাবার চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন জেলায় পড়াশোনার অভিজ্ঞতা আছে। যদিও পুরান ঢাকার নারিন্দার ভূতের গলিতে বেড়ে ওঠেছেন। সেদিন তার পাশে বসে মনে মনে ভাবছিলাম; একেবারে অপরিচিত, অজ্ঞাত একজন অনুজ সহকর্মীকে স্বেচ্ছায় নিজের গাড়িতে তুলে নিয়ে এসে তিনি মহানুভবতা এবং একই সঙ্গে সহকর্মীসুলভ মানসিকতা প্রদর্শন করেছেন। এটা তিনি না করলেও কিছু যায় আসে না।
৩.
তার মৃত্যুর অনেকদিন পরে জানতে পারি তিনিই লেখক শহীদুল জহির। বিশেষ করে প্রয়াণের পর পরই তার সহকর্মী বন্ধু ও কবি মোহাম্মদ সাদিকের একটা হৃদয়স্পর্শী লেখা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। যা পাঠ করে মোহাম্মদ সাদিকের সঙ্গে ফোনালাপও করেছিলাম। তখনও আমি নিজে লেখাজোখা নিয়ে জড়িত হইনি। তবে বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত পড়াশোনার মধ্যে ছিলাম। তবে কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহিরের কোনো লেখা পড়িনি, এটা শতভাগ নিশ্চিত। মৃত্যুর পরেই ধীরে ধীরে লেখক ও সাহিত্যিক শহীদুল জহির পাদপ্রদীপের আলোয় উদ্ভাসিত হতে শুরু করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ, দখলদার পাকবাহিনীর হত্যা ধর্ষণ ও পরবর্তী সমাজচিত্র নিয়ে রচিত তার উপন্যাস ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ সবচেয়ে বেশি আলোচিত হতে থাকে। গল্প নিয়েও লেখকদের আড্ডায় তর্ক-বির্তক চলতে থাকে। সাহিত্যাঙ্গনে তার নাম কানে বাজতে থাকে। বলাবাহুল্য, ২০১৯ সালে ঢাকার বিখ্যাত পুস্তক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পাঠক সমাবেশ থেকে তার উপন্যাস সমগ্র প্রকাশ করলে এগুলো সাধারণ পাঠক পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তারা শহীদুল জহিরের গল্প সমগ্রও প্রকাশ করে। উপন্যাস সমগ্রে ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’ ‘আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু’ ‘মুখের দিকে দেখি’ ‘মেহেরনি’ মোট পাঁচটি উপন্যাসসহ পরবর্তীতে সংযুক্ত হয় ‘চন্দনবনে’ ও ‘উড়াল’। বলা যায়, ছোট বড় মিলিয়ে মোট ৭টি উপন্যাস আর গোটা ২০টি গল্প নিয়ে তার সাহিত্য কর্ম। গল্পের মধ্যে ‘ডলু নদীর হাওয়া’ ‘ইদুর-বিলাই খেলা’ ‘ডুমুরখেকো মানুষ’ ইত্যাদি বেশি আলোচিত হয়েছে।
৪.
শহীদুল জহিরকে আজকাল নানাবিধ অভিধায় অভিষিক্ত করা হচ্ছে। লেখক হিসেবে তাকে বহুমাত্রিক ভাবে মূল্যায়ন করার একটা স্বতঃস্ফূর্ত প্রবণতা লক্ষণীয়। কেউ কেউ তাকে সরাসরি অবমূল্যায়ন করতেও কুণ্ঠিত হচ্ছে না। সবচেয়ে বেশি বলা হচ্ছে তার বর্ণনাশৈলী বা লেখালেখিতে তিনি জাদুবাস্তবতাবাদের এক অদ্ভুত ঘোরের ভেতরে ছিলেন। যদিও ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ বলে কোনো কিছুতে তার প্রভাব ছিল কি-না তা এখনো সুস্পষ্ট নয়। আবার কেউ বলেছেন, তিনি ১৯৮২ সালে সাহিত্যে নোবেল জয়ী লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসকে অনুসরণ করতেন। বড় বড় বাক্য রচনা করে লিখেছেন গল্প ও উপন্যাস। তার স্বকীয় ও স্বতন্ত্র ধারার লেখায় প্রচ্ছন্ন তথা ক্ষুরধার মন্তব্য পাঠককে চমকে দিতে পেরেছে। তার ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র যুবক আবদুল মজিদের মুখ দিয়ে ‘৭১ ও মুক্তিযুদ্ধের বিচিত্র ঘটনার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বধু মওলানার নৃশংসতা, পাকিস্তানী নরঘাতক সেনাদের দ্বারা হত্যাযজ্ঞ ও ধর্ষণের লোমহর্ষক কাহিনিকে মনে হবে সদ্য ঘটে যাওয়া তরতাজা দগদগে বর্ণনা। এখানেই লেখকের কৃতিত্ব এবং কাহিনি বিন্যাসের সার্থকতা।
এক রক্তস্নাত যুদ্ধ আর লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ নামক জাতিরাষ্ট্রের জন্ম হওয়ার পরও এখানে অসংখ্য বধু মওলানা বহাল তবিয়তে ছিল এবং বছর তিনেকের মধ্যে স্বরূপে পুনর্বাসিত হয়ে সমাজের নেতৃত্বে চলে আসে। যা শহীদুল জহির তার এই বাস্তবভিত্তিক উপন্যাসের পৃষ্ঠাজুড়ে চিত্রায়ন করে গেছেন।
৫.
প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যাবিচারে কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির খুব বেশি লেখেননি। এ কথা সত্যি যে, খ্যাতিমানরা বেশি লিখে যাননি। অমরত্বের জন্যে শত শত লেখা আবশ্যক নয়। বিখ্যাত বাঙালি কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দোপাধ্যায় বা যাযাবর (বিনয় মুখোপাধ্যায়) এরাও কিন্তু বেশি লেখেননি। মানিকের উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ এবং ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ আর যাযাবরের ‘দৃষ্টিপাত’ লেখার পরে আর কিছু সৃষ্টি করার প্রয়োজন পড়েনি বা আর কিছু না লিখলেও চলত। তাছাড়া লেখকের সকল সৃষ্টির মূল্য পাঠকের কাছে সমানভাবে ধরা দেয় না। সেদিক থেকে শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ এবং ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’ উপন্যাস দু’টি নানা কারণে অনন্য এবং ব্যতিক্রমধর্মী বয়ানে লিপিবদ্ধ। এর বর্ণনাশৈলী, চরিত্র নির্মাণ এবং বিষয়বস্তুর গুরুত্ব খুব অসাধারণ ও তাৎপর্যপূর্ণ।
অনেকে বলেছেন, শহীদুল জহির জীবনকালে উপেক্ষিত ছিলেন। তার প্রচার প্রসার ছিল না। এটা একেবারেই সঠিক নয়। তাছাড়া পৃথিবীর অসংখ্য লেখক, কবি তার খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা স্বচক্ষে দেখে যেতে পারেননি। বলা যায়, একই বয়সে মৃত্যু কবি জীবনানন্দ দাশও তার কবিত্বশক্তির অন্তর্নিহিত প্রভাব সম্পর্কে তার সমকাল অবচেতন ছিল। শহীদুল জহিরের ক্ষেত্রে বাস্তবতা ছিল ভিন্ন, সরকারি চাকরি এবং জনগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তার ব্যক্তিক স্বাধীনতা আর দশজন সার্বক্ষণিক লেখকের মতন নয়। লেখকের একধরনের আটপৌরে বোহেমিয়ান জীবন থাকে, যা তাকে সর্বত্রগামী করে দেয়। অন্যান্য লেখকের সঙ্গে, প্রকাশকের সঙ্গে নিরন্তর সম্পৃক্ততা করে তোলে। শহীদুল জহিরের স্বভাব ছিল চাপা, অন্তর্মুখী এবং খানিকটা বিচ্ছিন্ন। তার সংসার জীবনও ছিল না। তিনি ছিলেন অকৃতদার। নিজের লেখা প্রকাশের জন্যে পত্রিকার সঙ্গে যোগাযোগ করা, বই করে এনে বাজারজাত করা, পাবলিশার্সদের অফিসে যাতায়াত করা; এসব থেকে তিনি কিছুটা দূরে ছিলেন বলেই মনে হয়। আর এর পেছনের প্রধান কারণ ছিল চাকরি। এমনকি তার অফিসের একজন সহকর্মীও জানতেন না তিনি সাহিত্য চর্চা করেন, লেখালেখির মানুষ, বাজারে এতগুলো বইয়ের লেখক ইত্যাদি। সময়ের বিবর্তনে বরং এখন মনে হয়, এই নিভৃতচারী, অনাড়ম্বর জীবনবাদী, নিরহংকার ও নিবেদিতপ্রাণ কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহিরের রচনাসমগ্র নিয়ে আগামীতে আরও অনেক বেশি গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলবে। তিনি এবং তার বিস্ময়কর জীবন সৃষ্টির যথাযথ মূল্যায়ন হবে।






