কমিশন বাণিজ্য-চাঁদাবাজির বিতর্কে ফ্যামিলি কার্ড
- সুবিধা দেওয়ার নামে ১০০ টাকা করে নিচ্ছেন বিএনপি নেত্রী
- ছাত্রদলের হামলার পর চার উপজেলায় নিয়োগের ফল স্থগিত
- নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে বিক্ষোভ বিএনপি কার্যালয়ে তালা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। দুস্থ, অসহায় পরিবারসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প। কিন্তু এই কর্মসূচির সুফল মেলার আগেই বিএনপি নেতাকর্মীর চাঁদাবাজি, কমিশন বাণিজ্য, দলীয় নিয়োগ দাবির নৈরাজ্যে নিমজ্জিত হয়েছে বিতর্কে। কার্ড পাইয়ে দেওয়ার জন্য টাকা তোলা, তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে নিয়োগ না পাওয়ায় সরকারি কর্মকর্তার কার্যালয়ে হামলাসহ নানাভাবে বিতর্ক তৈরি করছেন নেতাকর্মীরা।
প্রতারণার কারবার চলছে রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ ধামরাইয়েও। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন নিয়েও চলছে চাঁদাবাজি। বিনামূল্যে পাওয়ার কথা থাকলেও ধামরাইয়ের গ্রামগুলোতে ফ্যামিলি কার্ড পাইয়ে দেওয়ার নামে তোলা হচ্ছে ১০০ টাকা করে। এ প্রতারণাচক্রের হোতা উপজেলা মহিলা দলের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন।
এমপির দোহাই ও দলীয় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে হতদরিদ্র শতাধিক নারীর কাছ থেকে তিনি হাতিয়েছেন বিপুল অর্থ। তার সহযোগী হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন সিন্ধুলিয়া এলাকার নাছিমা আক্তার নামে আরেক নারী। জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, ছবি ও নগদ ১০০ টাকা করে নিচ্ছেন তিনি। পরে তা জমা দেন বিএনপি নেত্রী ফরিদার কাছে।
বানেশ্বর গ্রামের ভুক্তভোগী শিরিন আক্তার ও রূপবান জানালেন, ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার আশায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ ১০০ করে টাকা দিয়েছেন তারা। শুধু তারাই নন, এলাকার শতাধিক পরিবারের কাছ থেকে এভাবেই অর্থ হাতিয়েছে চক্রটি।
অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করে উপজেলার সোমভাগ ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এইচ এম রুস্তমের ভাষ্য, বিষয়টি জানার পরপরই সাধারণ মানুষকে টাকা দিতে নিষেধ করেছি। এমপির নাম ভাঙিয়ে এবং দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করে এভাবে অসহায় মানুষের পকেট কাটা কোনোভাবেই বরদাশত করা যায় না।
মোবাইল ফোনে কল দিয়ে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার নামে টাকা তোলার কারণ জানতে চাইলে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন ফরিদা ইয়াসমিন; কিন্তু ভুক্তভোগীদের নাম ও টাকার অঙ্কের প্রমাণ দেওয়ার পর কেটে দেন ফোনের সংযোগ।
‘অভিযোগটি তদন্ত করা হচ্ছে। প্রমাণ পেলে নেওয়া হবে ব্যবস্থা’— বলেছেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এস এম হাসান এবং ইউএনও আল মামুন।
দামুড়হুদায় বিএনপি কার্যালয়ে তালা: চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার কুড়োলগাছি ইউনিয়নে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মারাত্মক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অযোগ্য ও ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন একাংশের নেতাকর্মী। এরই একপর্যায়ে গতকাল বৃহস্পতিবার কুড়োলগাছি ইউনিয়ন বিএনপির কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা। ফ্যামিলি কার্ড জরিপের তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে নিয়োগ না পাওয়ায় এ ক্ষোভ বলে জানালেন বিক্ষুব্ধরা। এ কারণে দর্শনা থানা ছাত্রদলের সদস্য আলামিন হোসেনের নেতৃত্বে তালা দেওয়া হয় বিএনপি কার্যালয়ে। আলামিনের অভিযোগ, তথ্য সংগ্রহকারীর তালিকা তৈরিতে চরম জালিয়াতি হয়েছে। দেড় দশক ধরে হামলা, মামলা ও রাজপথে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও মূল্যায়ন করা হয়নি বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীদের। এ নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন কুড়োলগাছি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।
বানিয়াচংয়ে ছাত্রদলের তাণ্ডব: ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার হিসেবে নিয়োগ না পাওয়ায় হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়েও তাণ্ডব চালিয়েছেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। গতকাল দুপুরে উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি মোবাশ্বির আহমেদ মজনু ও যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ রাসেল মিয়ার নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ইউএনও মাহমুদা বেগম সাথীকে লাঞ্ছিত করার পাশাপাশি তার কার্যালয় ভাঙচুর করেছেন সংগঠনটির অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী। তাদের তোপের মুখে মৌখিকভাবে রেজাল্ট স্থগিত করেন ইউএনও।
তবে লাঞ্ছিত করার বিষয়ে জানতে বানিয়াচংয়ের ইউএনও মাহমুদা বেগম সাথীর মোবাইল ফোনে দফায় দফায় কল দিলেও রিসিভ করেননি।
নাটোরে ইউএনওর দরজায় লাথি দিয়ে ফল স্থগিত করল ছাত্রদল: গত বুধবার নাটোরের বাগাতিপাড়া, লালপুরসহ বিভিন্ন উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ডের জন্য তথ্য সংগ্রহকারীর তালিকা প্রকাশ করেছিল স্থানীয় প্রশাসন। ওই তালিকায় নাম না থাকায় ক্ষুব্ধ হয়ে বাগাতিপাড়া ও লালপুরের ইউএনওর কার্যালয়ে তাণ্ডব চালান ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দরজায় লাথি দিয়ে বাতিল করতে বলা হয় ওই তালিকা। এরপর স্থগিত করা হয় ওই দুটিসহ চারটি উপজেলার ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ পরীক্ষার ফল। গতকাল রাজশাহী বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক সৈয়দ মোস্তাক হাসান স্বাক্ষরিত আদেশে জানানো হয়েছে এই তথ্য।
বিষয়টি নিশ্চিত করে নাটোর জেলার সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক নূর মোহাম্মদ জানালেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশে চারটি উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির নিয়োগ স্থগিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা






