৩৩ বছর পর কমল জন্ম তারিখ, বাড়ল চাকরির মেয়াদ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
তেত্রিশ বছর পর বদলে গেল জন্ম সাল। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক কর্মকর্তার নথিতে এতদিন জন্ম তারিখ ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮। চাকরিজীবনের শেষপ্রান্তে এসে সেটিই হয়ে যায় ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯।
এক বছরের এই হেরফেরেই বেড়ে যায় চাকরির মেয়াদ। অবসরের বয়সসীমা পেছাতে জন্ম তারিখ পরিবর্তনের অভিযোগ সরকারি চাকরিতে নতুন নয়। নানা কৌশলে বয়স কমিয়ে চাকরিতে আরও কিছুদিন থাকার চেষ্টা করেন অনেকে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এই কর্মকর্তার নথির অসঙ্গতিও তেমন প্রশ্নই উসকে দিচ্ছে।
বিমানের এই কর্মকর্তার নাম শাহনাজ বেগম। শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকার পরও পদোন্নতি পাওয়ার অভিযোগ ওঠায় তা বাতিল হয়। এয়ারলাইনসের নথি বলছে, গত মঙ্গলবার সকালে জারি করা এক অফিস আদেশে ফ্লাইট সার্ভিস ম্যানেজার শাহনাজ বেগমকে ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ফ্লাইট সার্ভিস) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
তবে পরদিন, গতকাল বুধবার বিকালে, আরেকটি অফিস আদেশে সেই পদোন্নতি বাতিল করা হয়। এই ঘটনার মধ্যেই আবার সামনে এসেছে তার জন্ম তারিখ পরিবর্তনের বিষয়টি। শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেই নয়, তার দায়িত্বকালীন ফ্লাইট পরিচালনাতেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একাধিক নথিতে ফ্লাইট বিলম্বে ছাড়ার মতো ঘটনাও তার কর্মপরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, যা নিয়ে অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
শাহনাজ বেগম সর্বশেষ ফ্লাইট সার্ভিস বিভাগের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর আগে তিনি পরিকল্পনা ও সময়সূচি (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিউলিং) বিভাগের ম্যানেজার ছিলেন। ওই দায়িত্বে থাকাকালে কেবিন ক্রুদের ডিউটি নির্ধারণে নিজের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সহকর্মীদের অভিযোগ, তার রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে একমত নন—এমন কর্মীদের অস্বাভাবিক সময়ে ফ্লাইট ডিউটি দেওয়া, ক্লেইম-অফ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ না দেওয়ার মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতো। অন্যদিকে, তার পছন্দের কর্মীরা পেতেন সুবিধাজনক রুট, আকর্ষণীয় গন্তব্য এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা।
নথিপত্র অনুযায়ী, শাহনাজ বেগম ১৯৮৯ সালে ফ্লাইট স্টুয়ার্ডেস হিসেবে বিমানে যোগ দেন। তার যোগদানের সময়কার নথিতে জন্ম তারিখ ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮। পরবর্তী ৩৩ বছর এ তথ্য অপরিবর্তিত থাকলেও ২০২১ সালে জারি করা একটি নথিতে তার জন্ম তারিখ ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ উল্লেখ করা হয়। এর ফলে তিনি অতিরিক্ত এক বছর চাকরিতে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন। চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই তিনি উচ্চপদে পদোন্নতির চেষ্টা করেন।
গত ৩০ মার্চ শাহনাজ বেগমকে ম্যানেজার (ফ্লাইট সার্ভিস) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে ওই পদে যাওয়ার পরও তিনি পরিকল্পনা ও সময়সূচি বিভাগে প্রভাব বিস্তার অব্যাহত রাখেন। এতে নবনিযুক্ত ম্যানেজার (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিউলিং) পারভীন সুলতানা শ্রাবণীর সঙ্গে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। গত ৪ জুন শ্রাবণীকে তার বিদ্যমান দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত শিডিউলিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ম্যানেজার (ফ্লাইট সার্ভিস) পদে শাহনাজ বেগমের বদলিও অনেকের কাছে বিস্ময়কর ছিল। কারণ ওই পদে দায়িত্ব পালনকারী ফেরদৌসী মাসুদ রিফাত ১৫ মার্চ আগাম অবসরের আবেদন করেন এবং ২১ মে তা অনুমোদিত হয়।
২০২৫ সালের শেষ দিকে রাজনৈতিক আনুগত্যের অভিযোগে দুই কেবিন ক্রুকে ভিভিআইপি ফ্লাইট থেকে বাদ দেওয়ার একটি বিতর্কেও শাহনাজ বেগমের নাম জড়ায়। ওই ঘটনার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাকে আবার লাইন ক্রু হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু তার পরিবর্তে দ্রুত তাকে ম্যানেজার (ফ্লাইট সার্ভিস) পদে বসানো হয়।
এসব বিষয়ে জানতে একাধিকবার শাহনাজ বেগমের মন্তব্য চেয়ে কল করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বক্তব্য জানতে জনসংযোগ বিভাগে কর্মরত বোসরা ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।






