পেতে রাখা বোমায় রহস্য, শঙ্কা!
- টার্গেট লোকসমাগম বাজার ও দোকান
- প্রতিটি বোমায় সালফার বিয়ারিং বল ও স্প্লিন্টার
- এক সপ্তাহেও শনাক্ত হয়নি মতিঝিলের ছাতা বোমার রহস্য
- বিস্ফোরণ হলে অর্ধশতাধিক মানুষের হতাহতের শঙ্কা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীতে একের পর এক বোমা উদ্ধারে জনমনে বাড়ছে আতঙ্ক, রয়েছে শঙ্কাও। লোকসমাগমকে টার্গেট করে বিভিন্ন জায়গায় বিস্ফোরক ফেলে রাখছে দুর্বৃত্তরা। এগুলোয় ব্যবহার করা হচ্ছে উদ্বেগজনক মাত্রার সালফার, বিয়ারিং বল ও লোহার স্প্লিন্টার এবং নানা ধরনের দাহ্য পদার্থ। এগুলোর একেকটি বিস্ফোরণে অর্ধশতাধিক মানুষ হতাহত হতে পারত বলেও আশঙ্কা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।
গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার আশুলিয়ায় মুদিদোকানের সামনে থেকে প্রেশার কুকারের মধ্যে পাওয়া যায় একটি শক্তিশালী বোমা। সেটি নিষ্ক্রিয় শেষে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের (সিটিটিসি) এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানিয়েছে, ৩ থেকে ৫ লিটার সাইজের একটি প্রেশার কুকারের ভেতরে বিয়ারিং বল ও স্প্লিন্টার দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল বিস্ফোরকটি।
সপ্তাহ খানেক আগে গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রো স্টেশনের নিচে ছাতার মধ্যে রাখা হয়েছিল শক্তিশালী ‘পাইপ বোমা’। তখন সিটিটিসি বলেছিল, সেটি ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি)।
ছাতাটি খুললেই বিস্ফোরণ এবং হতাহত হওয়ার শঙ্কা ছিল। আইইডিতে ব্যাটারি, স্প্রিন্টার, ইলেকট্রনিক সার্কিট ও ১ থেকে ১ দশমিক ৫ কেজি সালফার ও অসংখ্য লোহার বল ব্যবহার করা হয়েছিল।
এক সপ্তাহের মধ্যে দুটি শক্তিশালী বোমা উদ্ধার হলেও দেশে উগ্রবাদ মাথাচাড়া দেওয়ার মতো কোনো লক্ষণ নেই বলে দাবি ডিএমপির সিটিটিসি প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হকের। তিনি বলেছেন, ‘অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গোয়েন্দা তথ্য এবং আমাদের নিজস্ব ডেটাবেজের মাধ্যমে উগ্রবাদী তৎপরতা নিয়মিত নজরদারি করছি।’
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উগ্রবাদ নেই বা লক্ষণ নেই এসব বলে জঙ্গিবাদের আশঙ্কাকে উড়িয়ে না দিয়ে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে সত্যতা বের করা উচিত।
মুদিদোকানের সামনে প্রেশার কুকারের মধ্যে শক্তিশালী বোমা উদ্ধারের বিষয়ে জানতে চাইলে আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেছেন, একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় দোকানে এক ব্যক্তি বাজার করার নাম করে একটি ব্যাগ রাখেন। পরে তিনি টাকা ভাঙতি করার নাম করে সটকে পড়েন। দীর্ঘ সময় ধরে ফিরে না আসায় দোকানের লোকজন পুলিশকে কল দেন। পুলিশ ব্যাগটি লক করা দেখলে সন্দেহ হয়। সেটি খোলার পর মেলে বিস্ফোরক। খবর পেয়ে সেটি নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করে সিটিটিসির বোম ডিসপোজাল ইউনিট।
ব্যাগটি রেখে যাওয়া ব্যক্তিকে শনাক্তের বিষয় জানতে চাইলে ওসির ভাষ্য, ‘বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। আমাদের টিম কাজ করছে। বিশ্লেষণ করা হচ্ছে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে মামলাও হয়েছে।’
বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার কাজে নিয়োজিত সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানালেন, বোমার সঙ্গে একটি রিমোট কন্ট্রোলের এন্টিনা ছিল। যেটি দিয়ে দূর থেকে ঘটানো যেত বিস্ফোরণ। তবে স্থানীয়দের সচেতনতায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছেন বাজারে আসা ক্রেতারা। বোমাটি বিস্ফোরণ হলে অনেক মানুষ হতাহত হওয়ার শঙ্কা ছিল। গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রো স্টেশনের নিচ থেকে উদ্ধার হওয়া ছাতার মধ্যেও রাখা হয়েছিল শক্তিশালী একটি আইইডি নামে একটি পাইপ বোমা। হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব উল্টো রথযাত্রাকে টার্গেট করে সেখানে বোমাটি রাখা হয়েছিল বলে ধারণা পুলিশের। তবে এ ঘটনার এক সপ্তাহ পার হলেও এখনো কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
এ বিষয়ে ডিএমপির মতিঝিল থানার ওসি কামারুজ্জামান তালুকদার আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, বোমাটি কে বা কারা রেখে গেছে, তা এখনো শনাক্ত করা যায়নি। ওই সময় রথযাত্রা থাকায় অনেক মানুষের আনাগোনা ছিল। আবার যে স্থানে ছাতাটি রাখা হয়েছিল, তার আশপাশে ছিল না সিসি ক্যামেরা। তাই আসামি শনাক্তে বেগ পেতে হচ্ছে। পেতে রাখা বা ফেলে রাখা বোমার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে উল্লেখ করে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গণির আশ্বাস, ‘আতঙ্ক হওয়ার কোনো কারণ নেই। অচিরেই সমাধান হয়ে যাবে। বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে আমাদের একাধিক টিম।’
তবে দেশে উগ্রবাদী সংগঠনগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা হওয়ার শঙ্কা সরকারের জন্য ভয়ের এবং চ্যালেঞ্জের বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, উগ্রবাদী সংগঠনগুলো আবার মাথাচাড়া দিচ্ছে, বিষয়টি উড়িয়ে না দিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন। লোকসমাগম কেন টার্গেট করছে, রথযাত্রাকে কেন টার্গেট করছে, মেট্রোরেলের নিচেইবা কেন বোমা রাখা হলো ইত্যাদি বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।




