চাইলেই কি ইচ্ছামতো নাম রাখা যায় ইউনিয়নের!

ছবি: আগামীর সময়
বগুড়ার শিবগঞ্জ এবং নতুন উপজেলা মোকামতলায় নবগঠিত তিন ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে চলছে জোর সমালোচনা। বিষয়টি জন্ম দিয়েছে হাস্যরসের। কথা উঠেছে জাতীয় সংসদেও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের মানুষের চর্চিত বিষয়গুলোর মধ্যেও এটি রয়েছে শীর্ষে। বলা হচ্ছে, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দুই ছেলে এবং পৈতৃক নিবাসের নামে নামকরণ করা হয়েছে এই তিন ইউনিয়নের।
প্রশ্ন উঠেছে, চাইলেই কি ইচ্ছামতো ইউনিয়ন পরিষদের নাম রাখা যায়? নাকি ক্ষমতা থাকলে সবই সম্ভব! তবে স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই নিয়ম মেনে সব ইউনিয়নের নাম রাখা হয়েছে। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন-২০০৯-এর ১১(২) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির নামে নামকরণ করা যাবে না ইউনিয়নের। বিষয়টি স্মরণ করে দিয়ে প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নামকরণের বিতর্ক এড়াতে স্থানীয় প্রশাসনের উচিত ছিল আরও সতর্ক হওয়া। এটি অতীতের পুনরাবৃত্তি বলে মনে হচ্ছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার আগামীর সময়কে বললেন, ‘তিন ইউনিয়নের নামকরণ যে মিরাকল, তা বিশ্বাস করা খুবই দুরূহ। এটি নিঃসন্দেহে আইনের লঙ্ঘন ও অতীতের পুনরাবৃত্তি। আগে যেমন একজন ব্যক্তির নামে ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে নামকরণ করা হতো বর্তমান সরকারও কি সেদিকেই ঝুঁকছে! এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
গত ১১ জুন বগুড়া জেলা প্রশাসক স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি এবং মোকামতলা উপজেলার আটটি ইউনিয়নের প্রশাসনিক কাঠামো করা হয় পুনর্গঠন। এই গেজেট রবিবার প্রকাশিত হলে নতুন তিনটি ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে শুরু হয় সমালোচনা। শিবগঞ্জ উপজেলায় গঠিত নতুন ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে ‘মীরবাড়ী ইউনিয়ন’। অন্যদিকে নবঘোষিত মোকামতলা উপজেলায় গঠিত নতুন তিন ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে ‘সীমান্ত ইউনিয়ন’, ‘দিগন্ত ইউনিয়ন’ এবং ‘স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন’। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী এবং বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলম তার পৈতৃক বাসভবন ‘মীরবাড়ী’র নামে শিবগঞ্জ উপজেলার নতুন ইউনিয়নের নামকরণ করেছেন।
অন্যদিকে তার দুই ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত এবং মীর সাকলাইন আলম দিগন্তের নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছে মোকামতলা উপজেলার দুটি ইউনিয়নের। জোর সমালোচনার মুখে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জাতীয় সংসদে এই নামকরণ প্রসঙ্গে নিজের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তবে স্থানীয়রা এমন ব্যাখ্যা মানতে নারাজ।
ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণ নিয়ে সোমবার সংসদে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলছিলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকা মোকামতলার দূরবর্তী দুটি ইউনিয়ন সৈয়দপুর ও দেউলী ইউনিয়ন। এই দুটি ইউনিয়ন অনেক বড় ছিল। স্থানীয় প্রশাসন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং জেলা প্রশাসক যাচাই-বাছাইয়ের পর গণশুনানি করে সৈয়দপুর ইউনিয়নটি যেহেতু গাবতলী ও সোনাতলার সীমান্তে, সে কারণে সৈয়দপুরের সঙ্গে নাম মিল করে সীমান্তবর্তী হওয়ায় নতুন ইউনিয়নের নাম করেছে সীমান্ত ইউনিয়ন। আরেকটি ইউনিয়নের নাম ছিল দেউলী ইউনিয়ন। যেটি গাইবান্ধার একদম কাছে, অনেক দূরে হওয়ায় যে কারণে স্থানীয় প্রশাসন এবং জনগণের শুনানিতে সেই ইউনিয়নের নাম রাখা হয়েছে ‘দিগন্ত ইউনিয়ন’।
এমন ব্যাখ্যা দিয়ে প্রতিমন্ত্রী আরও বললেন, ‘মিরাকলি আমার সন্তানদের নামের সঙ্গে মিলে গেছে ঠিকই। আমার সন্তানের নাম হচ্ছে মীর সীমান্ত ও মীর দিগন্ত। আমার যদি ইনটেনশন থাকত সন্তানের নামে ইউনিয়নের নামকরণ করার, তাহলে তো আমি প্রশাসনকে বলতাম মীর সীমান্ত ও মীর দিগন্ত রাখার। কিন্তু ইউনিয়নের নামের আগে তো মীর নাই মাননীয় স্পিকার।’
প্রতিমন্ত্রীর এমন ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারছেন না প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের অনেকে। প্রশাসনবিষয়ক বহু গ্রন্থপ্রণেতা মো. ফিরোজ মিয়া বললেন, ‘নাম নিয়ে বিতর্ক এড়াতে স্থানীয় প্রশাসনের আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। নামকরণে ওইসব নাম কেন হবে, এর যৌক্তিকতা পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার ছিল। নাকি তারা সরকারকে বিব্রত করতেই অতি উৎসাহী হয়ে করেছেন! সাধারণত সংশ্লিষ্ট এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ বিষয় বিবেচনায় নামকরণ করা হয়। এই তিন ইউনিয়নের ক্ষেত্রে নামগুলো কী পরিচয় বহন করে? সবই স্থানীয় প্রশাসনের অদক্ষতা ও অনভিজ্ঞতার ফসল।’
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় বগুড়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. তৌফিকুর রহমানের সঙ্গে। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘নিয়ম মেনেই ইউনিয়নগুলোর নামকরণ করা হয়েছে। এখানে কোনো ব্যক্তির নামে করা হয়নি। স্থানীয় জনগণের সুপারিশ অনুযায়ী প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। সে অনুযায়ী নামকরণ করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বললেন, ‘স্থানীয়দের মতামতের ভিত্তিতে ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে। সীমান্ত ও দিগন্ত নামের কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। স্থানীয়দের মতামতের ভিত্তিতে নামগুলো এসেছে। প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের পদবি এবং ছেলের নামের সঙ্গে কীভাবে মিলে গেল, সে বিষয়ে কোনো ধারণা নেই।’
নামকরণের এমন ঘটনায় ক্ষুব্ধ শিবগঞ্জ ও মোকামতলার মানুষ। গতকাল মঙ্গলবার কিচক ইউনিয়নের বাসিন্দারা জমায়েত হয়েছিলেন মানববন্ধনের জন্য। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপে তা আর শেষমেশ হতে পারেনি। এলাকার মানুষের ভাষ্য, প্রতিমন্ত্রীর ছেলেদের নামে যে ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণ করা হয়েছে, তা জলের মতো পরিষ্কার। তাদের অভিযোগ, যে চারটি ইউনিয়নের নতুন নামকরণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো কিছু অবগত করা হয়নি এলাকার মানুষকে। বরং হঠাৎ করে নাম পরিবর্তন করায় নানা কাজে জটিলতার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সোমবার সন্ধ্যায় নবঘোষিত সীমান্ত ইউনিয়নের শতাধিক মানুষ নামকরণের প্রতিবাদে মানববন্ধন করেন। তাদের দাবি, এলাকার পুরনো নাম দিয়েই যেন ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়। কোনো ব্যক্তির নাম দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণ তারা চান না।
প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন বগুড়া প্রতিনিধি




