জীবাণুমুক্ত হাত, সুরক্ষিত জীবন সংকট যখন সাবান-পানির

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগী যেন নতুন সংক্রমণের ঝুঁকিতে না পড়েন, তা নিশ্চিত করার অন্যতম শর্ত হাতের পরিচ্ছন্নতা। অথচ দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোয় পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মাত্র ৩২ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি সেবা রয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) অনুযায়ী, দেশের ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষের বাড়িতে সাবান, পানিসহ হাত ধোয়ার ব্যবস্থা নেই। ফলে হাসপাতাল থেকে বাড়ি— দুই জায়গাতেই হাতের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
আজ ১৫ অক্টোবর বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস। এবারের প্রতিপাদ্যও ‘হাত ধোয়ার নায়ক হোন’। হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, সংক্রামক রোগপ্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতি বছর দিবসটি পালিত হয়। এবারের দিবসে হাত ধোয়ার উপকারিতা প্রচারের পাশাপাশি সবার জন্য সাবান ও পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, হাত ধোয়ার গুরুত্ব জানা আর নিয়মিত হাত ধোয়ার সুযোগ থাকা এক বিষয় নয়। অনেক ক্ষেত্রে পানির ব্যবস্থা থাকলেও সাবান থাকে না, আবার কোথাও হাত ধোয়ার নির্দিষ্ট স্থানটি ব্যবহারযোগ্য থাকে না।
ডব্লিউএইচওর ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত ‘ওয়াশ ইন বাংলাদেশ: ক্লোজিং গ্যাপস, প্রটেক্টিং হেলথ’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৭১ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে মৌলিক পানির সুবিধা রয়েছে। তবে মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধা রয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মৌলিক সুবিধা রয়েছে ১৬ শতাংশে এবং পরিবেশ পরিষ্কারের মৌলিক ব্যবস্থা রয়েছে ২০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে। এসব ঘাটতি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও রোগীর নিরাপত্তাকে দুর্বল করতে পারে। হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সের হাত, চিকিৎসার সরঞ্জাম কিংবা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের মাধ্যমে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শুধু পানির উৎস থাকাই যথেষ্ট নয়; হাত ধোয়ার কার্যকর স্থান, সাবান, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
হাত ধোয়ার সুযোগের সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, এটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সমস্যাও। ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ১৭০ কোটি মানুষের বাড়িতে সাবান, পানিসহ হাত ধোয়ার মৌলিক সুবিধা ছিল না। এর মধ্যে প্রায় ৬১ কোটি ১০ লাখ মানুষের হাত ধোয়ার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। সংস্থা দুটির তথ্য বলছে, সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস ডায়রিয়ার ঘটনা প্রায় ৩০ শতাংশ এবং তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ প্রায় ১৭ শতাংশ কমাতে পারে। সহজ এই অভ্যাস রোগের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যয় ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ কমাতেও সহায়তা করতে পারে।
অপরিচ্ছন্ন হাতের মাধ্যমে জীবাণু খাবার, পানি ও বিভিন্ন ব্যবহৃত বস্তুর সংস্পর্শ থেকে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি বেশি। খাবার তৈরির আগে, খাওয়ার আগে, শিশুকে খাওয়ানোর আগে এবং শৌচাগার ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত না ধুলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, ডায়রিয়াজনিত রোগ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের অসুস্থতা ও মৃত্যুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন এবং সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাসের মাধ্যমে ডায়রিয়ার উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পানি দিয়ে হাত ভেজানো যথেষ্ট নয়। হাতের তালু, পিঠ, আঙুলের ফাঁক, নখের চারপাশ ও বৃদ্ধাঙ্গুলি সাবান দিয়ে ভালোভাবে ঘষে পরিষ্কার করতে হবে। এরপর পরিষ্কার পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় অন্তত ২০ সেকেন্ড সময় নেওয়া ভালো। খাবার তৈরির আগে ও খাওয়ার আগে, শৌচাগার ব্যবহারের পর, কাশি-হাঁচির পর এবং হাত দৃশ্যত ময়লা হলে হাত ধোয়া জরুরি। হাসপাতালে রোগীকে স্পর্শ করার আগে ও পরে, পরিষ্কার বা জীবাণুমুক্ত কাজের আগে এবং শরীরের তরলের সংস্পর্শের ঝুঁকির পর স্বাস্থ্যকর্মীদের হাতের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেনের মতে, সাবান দিয়ে সঠিক নিয়মে হাত ধোয়া ডায়রিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের অন্যতম সহজ এবং কার্যকর উপায়। অপরিচ্ছন্ন হাতের মাধ্যমে জীবাণু খাবার, পানি ও বিভিন্ন ব্যবহৃত বস্তুর সংস্পর্শ থেকে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই খাবার তৈরির আগে ও খাওয়ার আগে, শৌচাগার ব্যবহারের পর এবং শিশুকে খাওয়ানোর আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। বিশেষ করে হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর হাতের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে শুধু সচেতনতা বাড়ালেই হবে না, সংক্রমণ প্রতিরোধে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমস্থলে পর্যাপ্ত পানি, সাবান এবং হাত ধোয়ার উপযুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।



