সরকারি দলের নেতা হলে পশুর হাটের ইজারা মেলে

ছবি: আগামীর সময়
বাংলাদেশের বাস্তবতায় ‘রাজনৈতিক প্রভাব’ এমন এক শক্তি, যেটির প্রয়োগ হয় প্রায় প্রতি পদে। অন্যান্য ব্যবসা তো বটেই, কোরবানির পশুর হাটের মতো মৌসুমি ব্যবসাও চলে যার বলয়ে। বিষয়টি এমন, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের নেতারাই পান পশুর হাটের ইজারা। এটি শুধু মুখের কথা নয়। এবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ইজারার চিত্র দেখলেই তার প্রমাণ মেলে।
কোরবানির ঈদে এবার ডিএনসিসি ১০টি হাটের ইজারা চূড়ান্ত করেছে। এর মধ্যে প্রায় সবগুলো হাটের ইজারা পেয়েছে সরকারি দলের নেতারা। এই যেমন উত্তরার দিয়াবাড়ি ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টর-সংলগ্ন বউবাজার এলাকার হাটের ইজারা পেয়েছেন এসএফ করপোরেশনের মালিক শেখ ফরিদ হোসেন। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক। আবার ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট-সংলগ্ন হাটের ইজারা পেয়েছেন আমিনুল ইসলাম। যিনি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য।
একইভাবে ইজারা চূড়ান্ত না হওয়া খিলক্ষেত বনরূপা আবাসিক প্রকল্পের হাটের ইজারার সর্বোচ্চ দরদাতা হয়েছেন আরিফিন অ্যান্ড আরাফ এন্টারপ্রাইজের মালিক আবুল কালাম আজাদ। তিনি স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক। আরেকটি হাট বড় বেরাইদ বসুন্ধরা গ্রুপের খালি জায়গায় বসার কথা। ইজারা চূড়ান্ত না হওয়া এই হাটেরও সর্বোচ্চ দরদাতা হয়েছেন এএম এন্টারপ্রাইজের মালিক আতাউর রহমান। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। অবশ্য শেষের হাট দুটি বাতিল হওয়ার কথা রয়েছে। কথা হলো দিয়াবাড়ি অস্থায়ী পশুর হাটের ভেন্ডর পরিচয় দেওয়া এএমএ জামানের সঙ্গে। তিনি রাজনৈতিক পরিচয়ে হাট পাওয়াকে সমর্থন করে বললেন, ‘এবার সব হাটই বিএনপি নেতারা পেয়েছেন। এটাই তো হওয়ার কথা। আর কেউ পেলে লাশ পড়ে যেত না?’
সব সরকারের আমলেই দলীয় লোকদেরই পশুর হাটের ইজারা পেতে দেখা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এই আগ্রহ? হাটের ইজারার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়েই কথা হলো। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বললেন, এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো রাজনৈতিক দলের নেতাদের আয় করা কালো টাকা সাদা করা। মূলত একটি হাট থেকে আয় হওয়া অর্থকে কয়েকশ গুণ বেশি দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকে। এ কারণেই পশুর হাটের ইজারা নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। অনেক সময় ইজারা পাওয়া নেতার সঙ্গে অন্য ইজারাপ্রত্যাশীদের সমন্বয় থাকে। তখন নিজেদের মতো করে কালো টাকা সাদা করে নেন তারা। এক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ— পশুর হাটের ইজারায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আগামীর সময়কে বলেছেন, হাটের হাসিল প্রক্রিয়া এখনো সনাতনী পদ্ধতিতে হয়। এটি খুবই অস্বচ্ছ। হাসিল প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল করতে হবে। তিনি বললেন, ‘ডিজিটাল পদ্ধতিতে হাসিল হলে হাট থেকে কত আয় হলো, সেটি সরকার দেখতে পাবে। এতে কালো টাকা সাদা করার প্রক্রিয়া বন্ধ হবে এবং সরকারের রাজস্ব বাড়বে।’ হাটে নগদ লেনদেন না করে ব্যাংকে লেনদেনে ক্রেতা-বিক্রেতাকে আগ্রহী করতেও পরামর্শ দিলেন এই অর্থনীতিবিদ।
রাজনৈতিক দলগুলোর হাটের ইজারা পাওয়ার বিষয় নিয়ে কথা হলো উত্তর সিটির এক কর্মকর্তার সঙ্গে। শুরুতে তিনি দাবি করলেন, রাজনৈতিক প্রভাবে হাট বসার কোনো সুযোগ নেই। পরক্ষণেই হাসতে হাসতে বললেন, ‘এমন নির্লিপ্ত মিথ্যা বলতে খারাপ লাগে।’
তবে রাজনৈতিক প্রভাবে পশুর হাট ইজারার কথা একবাক্যে নাকচ করে দিলেন ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান।






