বেশিরভাগ মৃত্যুদণ্ড আটকে যায় তদন্তের ত্রুটিতে
- ২০২৪ সালে বাতিল ৬৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ
- ২০২৫ সালে বাতিল ৮৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ
- বিচারিক অদক্ষতার কারণে ঢালাওভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে: চিফ প্রসিকিউটর
- বিচারে ভুল হতে পারে, তাই কার্যকর করা থেকে বিরত থাকা যেতে পারে: আইনজীবী শিশির মনির

মুফতি হান্নানের কাছ থেকে আদায় করা দ্বিতীয় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছিল একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার চূড়ান্ত চার্জশিট। কিন্তু সেই জবানবন্দি জোর করে আদায় করা হয়েছিল— এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে হাইকোর্ট ওই মামলায় সব আসামিকে খালাস দেন। হাইকোর্টের এ রায় বহাল রাখেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
এ ঘটনায় করা মামলায় (হত্যা ও বিস্ফোরক মামলা) ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর রায় দেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১। রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এ ছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হয় ১১ জনের।
একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলাই শুধু নয়, বাংলাদেশে এমন বহু মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় জোর করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায়সহ বিভিন্ন ত্রুটি ধরা পড়ে। ফলে উচ্চ আদালতে এসব মামলার রায় অনেক ক্ষেত্রেই বাতিল হয়ে যায়।
আইন কমিশনের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ৫৭টি। এর মধ্যে ৩৮টি ডেথ রেফারেন্স নামঞ্জুর হয়েছে। অর্থাৎ ৬৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল হয়েছে। বহাল রয়েছে ১৯টি। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত ২২টি ডেথ রেফারেন্স মামলার মধ্যে ১৯টি নামঞ্জুর করেছেন হাইকোর্ট। অর্থাৎ ৮৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ মৃত্যুদণ্ডাদেশই বাতিল হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিচারব্যবস্থায় তদন্ত থেকে বিচার কার্যক্রম— সব জায়গায় রয়েছে পদ্ধতিগত দুর্বলতা। তদন্তের সময় পুলিশ নানাভাবে প্রভাবিত হয়ে থাকে। ফলে নানা ফাঁকফোকর থেকে যায়। নিরাপত্তাজনিত কারণে সঠিক ব্যক্তি সাক্ষ্য দিচ্ছেন না, কিংবা দুর্বল সাক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে বিচারিক দক্ষতার ঘাটতি, বিচার-বিশ্লেষণের অভাবসহ নানা সীমাবদ্ধতায় অধস্তন আদালত থেকে অনেক সময়ই ত্রুটিপূর্ণ রায় হচ্ছে। আবার অনেক সময় মিডিয়া হাইপের কারণে ব্যাপকভাবে আলোচিত ঘটনায় পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়েও বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। ফলে মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ এসব রায় শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতের চুলচেরা বিশ্লেষণে আর টিকছে না।
উদাহরণ টানতে গেলে দেখা যায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় রিভিউ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সর্বোচ্চ আদালত থেকে খালাস পান মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম। রায়ে আপিল বিভাগ বলেছেন, ‘যেসব তথ্যপ্রমাণ এ মামলায় ছিল, তা অতীতের আপিল বিভাগ সঠিকভাবে বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।’
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরশেদের বক্তব্য হলো— ‘হত্যা মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে তদন্ত। কিন্তু আমাদের দেশে তদন্ত অনেক ক্ষেত্রেই সঠিকভাবে করা হয় না। প্রয়োজনীয় কোর্টরুম না থাকায় নিম্ন আদালতে অনেক সময় তাড়াহুড়ায় বিচার করা হয়। ফলে অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে যায়। সাক্ষীদের সঠিক সময়ে না ডাকার ফলে তারা অনেক কিছু ভুলে যান। ফলে জেরায় সঠিক তথ্য দিতে পারেন না।’
সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুনের মতে, ‘আমাদের বিচার ব্যবস্থায় পদ্ধতিগত দুর্বলতা আছে। বিচারিক আদালতে অনেক চাপ থাকে। বিচারকদের শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতাও থাকে কম। তাদের অনেক সময় দ্রুত বিচারকাজ শেষ করতে হয়। ফলে ত্রুটিগুলো থেকে যায়। উচ্চ আদালতে এসব ত্রুটি ধরা পড়ায় আসামিরা খালাস পান।’
চূড়ান্ত বিচারে অনেক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পেলেও তার আগের সময়গুলোয় তাদের দুঃসহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। নিম্ন আদালতে রায়ের সঙ্গে সঙ্গে আসামিকে কারাবিধি অনুযায়ী, কনডেমড সেলে বা মৃত্যু সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। আইন অনুযায়ী, নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সাজা নিশ্চিত হতে হবে হাইকোর্টের মাধ্যমে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া শেষ হতে গড়ে সময় লাগে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বছর। আবার এর বিরুদ্ধে আপিল হলে লেগে যায় ৮ থেকে ১০ বছর। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ১৫ থেকে ১৬ বছর কেটে যায় মৃত্যুর সেলে। দেখা যায়, এভাবে ১৫ থেকে ১৬ বছর বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারও বেশি সময় কনডেমড সেলে থাকার পর অনেকে খালাস পেয়ে যান।
এদিকে বিচারিক প্রক্রিয়ার ভুলে নির্দোষ ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতো গুরুতর বিচ্যুতি এড়াতে আন্তর্জাতিক অনেক মানবাধিকার সংগঠন এ ধরনের শাস্তির বিধান তুলে দেওয়ার দাবিতে সোচ্চার রয়েছে। কিন্তু ফৌজদারি আইনবিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের মতে, বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে মৃত্যুদণ্ডের বিধান তুলে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘মৃত্যুদণ্ড তুলে দেওয়ার পক্ষে আমি নই। আমাদের দেশে অপরাধপ্রবণতা যেটি আছে, সেটি অন্য দেশের প্রেক্ষাপট দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করলে অবিচার হবে। কারণ, আমাদের এখানে মানুষের অপরাধ করার প্রবণতাটা একটু ভিন্ন নেচারের।’
তবে তিনি এটিও মনে করেন, বাংলাদেশে ঢালাওভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এটি বিচারিক অদক্ষতা। চিফ প্রসিকিউটরের ভাষ্য— ‘আইন আপনাকে বলেনি যে সব মামলাতেই মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। সেটি যখন একজন বিচারকের ডিসক্রিশন (সুবিবেচনাপ্রসূত), তখন একজন বিচারক ডিসক্রিশনটা কীভাবে প্রয়োগ করবেন, সেটি তার দক্ষতার ওপর নির্ভর করবে। কিন্তু এখানে কিছু কিছু বিচারকের অদক্ষতা দায়ী।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের ভাষ্য— ‘বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় এভিডেন্স কালেকশন কঠিন। অথবা এভিডেন্স কালেকশন করার যে সায়েন্টিফিক মেথড রয়েছে, এটি এখানে যথেষ্টভাবে প্রযোজ্য নয়। এখানে ইনফ্লুয়েন্স করা হয়। জোর করে কনফেশন (স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি) করানো হয়। মৃত্যুদণ্ড হচ্ছে এক্সস্ট্রিম পানিশমেন্ট। এটা একবার কাউকে দিলে শোধরানোর কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু মানুষের বিচারের ভেতরে ভুল হওয়ার একটা সম্ভাবনা থেকে যায়। এসব বিবেচনায় আমাদের দেশে মৃত্যুদণ্ডটা কার্যকর থেকে বিরত থাকা যেতে পারে।’
সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, দেশের জেলগুলোয় নারী-পুরুষ মিলিয়ে বর্তমানে অন্তত ২ হাজার ৭০০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রয়েছেন।




