এবার কয়লাসংকট, ছুটির দিনেও লোডশেডিং

প্রতীকী ছবি
কয়েক দিন আগেই গ্যাসসংকটে ভয়াবহ রকমের বেড়েছিল লোডশেডিং। সেই ধকল না কাটতেই এবার কয়লাসংকটে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুতের উৎপাদন। এতে গতকাল শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও লোডশেডিং হয়েছে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট।
ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে লোডশেডিং কিছুটা কম থাকলেও গ্রামাঞ্চলে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে কোথাও বিদ্যুৎ থাকছে না টানা দুই-তিন ঘণ্টা। বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবনে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা পড়েছেন বিপাকে। পড়ালেখায় ব্যাঘাত ঘটছে শিক্ষার্থীদের। কমেছে অটোরিকশাচালক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয়।
শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। লোকসান গুনছেন ব্যবসায়ীরা। পর্যটনকেন্দ্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম গতকাল সন্ধ্যায় আগামীর সময়কে জানালেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে বেশ কয়েকটা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা পরিবহন ও আনলোডিংয়ে সমস্যা হচ্ছে বলে তাদের জানানো হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় লোডশেডিং বেড়েছে।
শুক্র, শনি কিংবা অন্যান্য ছুটির দিনগুলোতে সরকারি অফিস-আদালত বন্ধের পাশাপাশি বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ চাহিদা কিছুটা কমে যায়। এতে লোডশেডিংও কম হয়। কিন্তু গতকাল সাপ্তাহিক ছুটির দিন বিকাল ৩টায় লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৯৫৮ মেগাওয়াট। তখন ১৫ হাজার ৩৭৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১২ হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট সরবরাহ করা হয়। এরপর চাহিদা কমতে থাকলে লোডশেডিংও কমতে থাকে। এই প্রতিবেদন লেখার সময় বিকাল ৫টার দিকে চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৮৯৬ মেগাওয়াট। ওইসময় ২ হাজার ৫৩৪ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়া হয়।
পিডিবির তথ্যমতে, গতকাল বিকাল ৫টায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আদানি পাওয়ার ৭৭৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। অথচ গত বৃহস্পতিবারও কেন্দ্রটি থেকে সরবরাহ করা হয় ১ হাজার ৪৫৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। অন্যদিকে কয়লাসংকটের কারণে পটুয়াখালী ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন কমেছে ৪৫০ মেগাওয়াট। একই কারণে পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে অন্তত ৭৬৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে।
বর্তমানে দেশে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের সক্ষমতা ৭ হাজার ৯৪৫ মেগাওয়াট। উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার ১০০ মেগাওয়াটের মতো। বড়পুকুরিয়ায় দেশীয় কয়লা থেকেও উৎপাদন হচ্ছে কম, তিনটির মধ্যে দুটি ইউনিট বন্ধ আছে কারিগরি কারণে।
এদিকে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও উৎপাদন কমেছে। বর্তমানে সাশ্রয়ী গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট। এজন্য দৈনিক অন্তত ২৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। কিন্তু গ্যাসসংকটের কারণে কখনোই চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়নি এসব কেন্দ্র থেকে।
কিছুদিন আগেও গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলেও এখন তা ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ মেগাওয়াটে নেমেছে। ঘাটতি সামাল দিতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহার বেড়েছে। এ ধরনের কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ৬ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। সেখান থেকে কয়েকদিন আগে উৎপাদন হচ্ছিল ৩ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত। ব্যয় সামাল দিতে এখন তা কমে এসেছে ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াটে। তেলচালিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় ব্যয় ২০ টাকার কাছাকাছি। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের গড় ব্যয় সাড়ে ৩ টাকার মতো।
পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুতের ঘাটতি কমাতে ব্যয়বহুল তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এতে ভর্তুকি অস্বাভাবিক হারে বাড়বে। ফলে আপাতত পিডিবির হাতে বিকল্প উপায় নেই।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, গ্যাস-কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হলে লোডশেডিং কিছুটা কমবে। কিন্তু পুরোপুরি মুক্ত হওয়া আপাতত সম্ভব নয়। কারণ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি এবং অর্থের সংকট রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ বকেয়া ও ঋণের দায় চেপেছে বর্তমান সরকারের ওপর। ফলে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সরকারি-বেসরকারি কোম্পানিগুলোর বিল পাওনা প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পাবে ১৫ হাজার কোটি টাকার মতো।
বকেয়া আদায়ে বেসরকারি কেন্দ্রের মালিকরা চাপ দিচ্ছেন। জ্বালানি কেনার অর্থ নেই— এমন দাবি করে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করছেন না তারা। আবার এত বিশাল বকেয়া পরিশোধেরও সামর্থ্য এ মুহূর্তে সরকারের নেই। অন্যদিকে, লোডশেডিং দিতে না পারলে জনরোষ বাড়বে। বিদ্যুতের এই সংকট চিন্তায় ফেলেছে সংশ্লিষ্টদের।
গত ২১ এপ্রিল কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান একটি এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমে ৬৮ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। বৃহস্পতিবার টার্মিনালটি আংশিক মেরামত শেষে সরবরাহ বেড়েছে প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ বাড়েনি।




