এ বাজি তদবিরবাজি
শিক্ষায় প্রতিদিন বসে তদবিরের হাট

সংগৃহীত ছবি
শিক্ষা খাতে তদবির ‘ওপেন সিক্রেট’। কত ধরনের যে তদবির, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। বদলিতে তদবির। তদবির চলে পদায়নে, এমপিওভুক্তকরণে, বকেয়া বেতন ছাড়সহ কমপক্ষে চার ধরনের কাজে। মাউশিসহ শিক্ষার সবকটি অধিদপ্তরে প্রতিদিন বসে এই তদবিরবাজের হাট। ফ্লোরে ফ্লোরে তাদের পদচারণ। তারা কাজ করেন একশ্রেণির অসৎ কর্মকর্তার ‘ছায়া দালাল’ হিসেবে। টাকা তোলেন আর টাকা দেন।
শিক্ষা ভবনে মাধ্যমিক শাখার এরকম এক কর্মকর্তা ছিলেন নাজিম উদ্দিন। দালালের মাধ্যমে টাকা আদায় করতেন তিনি। তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযোগ এলে গত জুনে তাকে পঞ্চগড়ে বদলি করা হয়। কিন্তু কোনো এক ম্যাজিকে ১৫ দিনের মধ্যে ফের রাজধানীর মোহাম্মদপুরের উদ্যান কলেজে আবার বদলি হয়ে আসেন নাজিম। তার বিরুদ্ধে আবারও উঠেছে সেই একই অভিযোগ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষায় সবচেয়ে বেশি অবৈধ লেনদেন ও তদবির চলে বদলি-বাণিজ্যে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভবন অবকাঠামো অনুমোদন করানোর নামেও চলে তদবির। এই তদবিরে যুক্ত হন রাজনৈতিক দলের নেতারাও। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি করে দেওয়ার নামে ঘুষ-বাণিজ্য একদমই প্রকাশ্য। মাদ্রাসা অধিদপ্তরেও সক্রিয় দালাল চক্র। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি কখনো সাংবাদিক, কখনো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিংবা রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে তদবির চলে।
এমন একজন পরিচিত মুখ মুহিব্বুল্লাহ। প্রশাসনিক পাড়া সচিবালয় কিংবা শিক্ষা প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু মাউশির করিডর— সব জায়গায় তাকে সবাই চেনে বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে। এর বাইরেও তার আরেকটি ‘ভুয়া পরিচয়’ আছে মুখে মুখে। তিনি বিভিন্ন প্রতিমন্ত্রীর এপিএস। কখনো আবার যুগ্ম সচিবও। অর্থাৎ একেক জায়গায় তার একেক রকম রূপ। যখন যেটি ব্যবহার করার প্রয়োজন, সেটিই করতেন। এমন এক প্রতারককে গত সোমবার হাতেনাতে ধরে মাউশি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের একটি ডিও লেটারে বদলির তদবির করতে এলে মুহিবুল্লাহকে হাতেনাতে আটক করে মাউশি প্রশাসন। দপ্তরটির প্রশিক্ষণ পরিচালক ও প্রশাসন শাখার সহকারী পরিচালক তার ব্যাগ তল্লাশি করে ১৩টি ভুয়া ডিও লেটার, বদরুন্নেসা কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপকের ভুয়া আইডি কার্ড, লাখ টাকার চেক, সোনালী ব্যাংকের চেকবই, ফোন নাম্বারের লিস্ট, বিপুলসংখ্যক ভিজিটিং কার্ড, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরসহ অন্যান্য সরকারি দপ্তরের বিভিন্ন পদের বদলিসংক্রান্ত জাল নথিপত্র উদ্ধার করেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করার পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাকে এক বছরের সাজা দিয়ে জেলহাজতে পাঠান।
ভুয়া ডিও লেটারগুলোর একটিতে প্রতিমন্ত্রীর ভুয়া প্যাড। তাতে ফেনী সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোবাশ্বেরা আক্তারকে ঢাকার কবি নজরুল সরকারি কলেজে বদলির সুপারিশ করা হয়। এতে মোবাশ্বেরা আক্তারকে প্রতিমন্ত্রীর ছোট বোন হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। আরেকটি ভুয়া ডিও লেটারে কবি নজরুল সরকারি কলেজের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ইউসুফকে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পরিদর্শক পদে (প্রেষণে) নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। ফকিরহাটের সহকারী শিক্ষক (জীববিজ্ঞান) ইউসুফ হাসানকে স্ত্রীর কর্মস্থল বগুড়ায় বদলির আবেদনেও জাল সই ব্যবহার করে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার অনুশাসন দেওয়া হয়।
শিক্ষা ভবনের অনেকের অভিযোগ, এই মুহিব্বুল্লাহ শুধু মাউশিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি নিয়মিত সচিবালয় ও প্রশাসনিক ভবনগুলোতে আনাগোনা করতেন। একেক স্থানে তিনি একেক রূপ ধারণ করতেন।
মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) প্রফেসর মো. নাজমুল হক আগামীর সময়কে জানালেন, মুহিব্বুল্লাহ নিজেকে কখনো ৩৬তম বিসিএস কর্মকর্তা, কখনো প্রতিমন্ত্রীর এপিএস, কখনো যুগ্ম সচিব পরিচয় দিয়ে তদবির করতেন। তার ব্যাগ তল্লাশি করে প্রচুর বদলির আবেদন ও ভুয়া ডিও লেটার এবং পরিচয়পত্র উদ্ধার করা হয়। জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে এই প্রতারককে শাহবাগ থানা-পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
বদলি-পদায়নে দালালের দৌরাত্ম্য
সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের ১৬-১৮ তলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই দুটি তলার করিডরগুলোতে এখন সক্রিয় শতাধিক প্রতারক ও দালাল চক্র। শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা বদলি থেকে শুরু করে বড় অঙ্কের বকেয়া ছাড়সহ নানান কাজ করিয়ে নেয় তারা। সবখানেই প্রতিদিন শিক্ষক, কর্মচারী ও চাকরিপ্রার্থীর ভিড় জমে। গতকাল বুধবার সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, দুপুর ১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত শিক্ষা সচিবের রুমের সামনে শতাধিক মানুষের ভিড়। যাদের সিংহভাগই সরাসরি সাক্ষাৎ করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত দালালের শরণাপন্ন হন। ইদানীং শিক্ষা সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ‘মৃধা’ ও ‘সিদ্দিক’ নামে দুই ব্যক্তি শিক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি, পদায়ন ও বিভিন্ন কাজ করিয়ে দেওয়ার নামে প্রকাশ্য তদবির-বাণিজ্যে নেমেছেন। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) এক কর্মকর্তাকে মাদ্রাসা অধিদপ্তরে উপপরিচালক বানাতে গিয়ে ২০ লাখ টাকা লেনদেন করেন এই মৃধা। কাজ করতে না পারার অভিযোগ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত পৌঁছালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশিতে তাদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একইভাবে শিক্ষার সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে শিক্ষা ভবনে দাপটে তদবির করেন একটি নিউজ পোর্টালের পরিচয় দেওয়া একজন। তিনিও শিক্ষামন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে তদবির করেন— এমন কয়েকটি অভিযোগ দুদকে জমা হয়েছে। সম্প্রতি দুই নারীকে দিয়ে বিভিন্ন কর্মকর্তাকে ব্ল্যাকমেল করার একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ওই দুই নারীকে শিক্ষা ভবন ও মন্ত্রণালয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক আগামীর সময়কে বললেন, ‘সচিবালয়ে দালালদের দৌরাত্ম্যে কাজ করতে পারি না। সেবাপ্রার্থীদের যেন এদের কাছে যেতে না হয়, সেজন্য আমি সরাসরি সাক্ষাৎ দিচ্ছি।’
মন্ত্রণালয়ে বদলি সিন্ডিকেটের হোতা রবিউল
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দালাল চক্রের রাজা বলা হয় রবিউল ইসলাম নামে একজনকে। কখনো বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ, কখনো সাংবাদিক পরিচয়ে বড় বড় তদবিরে জড়ান তিনি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এমন কাজ নেই, যা তিনি করেন না। সর্বশেষ ১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার নামে সবচেয়ে অভিনব প্রতারণার ঘটনা ঘটে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর সচিবালয়ে আগুন লাগলে অঘোষিত ছুটি ঘোষণা করা হয়। সেই সুযোগটি কাজে লাগায় চক্রটি। ওইদিন মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নতুন করে এমপিওভুক্তির একটি ভুয়া চিঠি আপলোড করে। চিঠিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষর এবং তার কার্যালয়ের স্মারক ব্যবহার করা হয়। ঘটনাটি জানাজানি হলে দুই দফায় তদন্ত করে মন্ত্রণালয়। প্রথম তদন্তে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে ৫০ লাখ টাকায় এমপিওভুক্তির চুক্তি করার প্রমাণ পায় কমিটি। এ চক্রের সঙ্গে কারা যুক্ত, তা জানতে আরও অধিকতর তদন্ত করা হয়। সেই তদন্ত প্রতিবেদন সম্প্রতি কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিবের কাছে জমা পড়ে।
কমিটির আহ্বায়ক যুগ্ম সচিব আনিসুর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, ‘রবিউল একজন চতুর ব্যক্তি। তদন্তে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে রবিউলের সখ্য থাকার প্রমাণ পেয়েছি।’
অভিযোগের বিষয়ে রবিউল ইসলামের ভাষ্য, ‘আমি ব্যক্তিগত কাজে সচিবালয়ে যাই। ওই ভুয়া চিঠির সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’




