অদক্ষতায় ফেরত ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
উন্নয়ন বাজেট কাটছাঁটের পরও হাতে থাকা অর্থ খরচ করতে পারে না মন্ত্রণালয়গুলো। এতে নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন হয় না কাজ। অহেতুক বেড়ে যায় ব্যয়। দায়িত্বপ্রাপ্তদের অদক্ষতা ও জবাবদিহি না থাকার কারণেই মূলত এমন পরিস্থিতি, যা ঘটছে বছরের পর বছর। একরকম নির্বিকার নীতিনির্ধারকরা। গত পাঁচ অর্থবছরের হিসাব বলছে, বরাদ্দ থাকলেও খরচ হয়নি ২ লাখ ৪০ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৩৯ কোটি এবং বিদেশি ঋণ ৭৬ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
আইএমইডির সাবেক সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়জুল্লাহ আগামীর সময়কে বলেছেন, বরাদ্দ খরচ করতে না পারাটা মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর চরম ব্যর্থতা। এ বিষয়ে সংস্থাগুলোকে আগে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কেননা তারা যদি প্রকল্প তৈরি করে, তাহলে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আবার তারাই ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে কেন। প্রথমে মূল প্রকল্পে বড় বরাদ্দ দেওয়া হয়। অর্থবছরের মাঝপথে ছেঁটে ফেলে দিয়ে কমিয়ে বাস্তবতার ভিত্তিতে দেওয়া হয় সংশোধিত বরাদ্দ। সেটিও পুরোপুরি খরচ না হওয়ায় অবশ্যই আর্থিক ও পরিকল্পনা শৃঙ্খলার পরিপন্থী।
তার পরামর্শ— আইএমইডিকে শক্তিশালী করা জরুরি। পাশাপাশি বিভাগটির সক্ষমতা ও ক্ষমতা দুটোই বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে স্থাপন করতে হবে বিভাগীয় কার্যালয়। যাতে মনিটরিং নিবিড়ভাবে করা যায়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, এ পরিস্থিতি কখনোই কাম্য নয়। এত বড় অঙ্কের অর্থ খরচ না করার কারণেই বিগত অর্থবছরগুলোয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য পূরণ হয়নি— মন্তব্য করলেন সাবেক এই আমলা।
আইএমইডির বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ২ লাখ ১৯ হাজার ৬০২ কোটি টাকা। বছর শেষে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো খরচ করতে পেরেছে ২ লাখ ৩ হাজার ৬৪৮ কোটি— অর্থাৎ খরচ হয়নি ১৫ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সংশোধিত বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২ লাখ ১ হাজার ৪৮৭ কোটি এবং থেকে গেছে ৩৫ হাজার ৭৪ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সংশোধিত বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৯২ কোটি, খরচ হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ১১৮ কোটি এবং খরচ হয়নি ৪৯ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ২৬ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজার ১৯০ কোটি, রয়ে গেছে ৭১ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৬ কোটি, এর মধ্যে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭২ কোটি, থেকে গেছে ৬৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা।
বরাদ্দ দেওয়া অর্থ খরচ করতে না পারাটা এক ধরনের অপরাধ— এমন মন্তব্য করেছেন সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ। তিনি বললেন, মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়। তাহলে শেষ পর্যন্ত খরচ কেন হচ্ছে না। এটি নীতিনৈতিকতার বিষয়। ব্যাপারটি খতিয়ে দেখে দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কেননা যে মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের নির্ধারিত বরাদ্দ ব্যয় করতে পারেনি, সেই টাকা অন্য মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পে দিলে নিশ্চয়ই ভালো হতো।
ব্যর্থতার কারণ: আইএমইডির প্রতিবেদন বলছে, অর্থ খরচ না হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে ১৬২ ধরনের প্রতিবন্ধকতা। এর মধ্যে জাতীয়ভাবে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ৩৮টি, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ৭০টি এবং বৈদেশিক ঋণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে রয়েছে ৫৪টি চ্যালেঞ্জ। দায়িত্বপ্রাপ্তদের অদক্ষতা ও জবাবদিহি না থাকা ছাড়াও টাকা খরচ করতে না পারার কারণগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— সম্ভাব্য সমীক্ষা না করে প্রকল্প তৈরি, ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা, প্রকল্পের ঝুঁকি ব্যবস্থায় সঠিক ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকা, নিয়মিত পিএসসি (প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটি) এবং পিআইসি (প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি) সভা না করা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকা। এ ছাড়া ইউটিলিটি স্থানান্তরে দীর্ঘসূত্রতা, দরপত্রে সময়ক্ষেপণ, নকশায় ত্রুটি, বৈদেশিক ঋণের প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে উন্নয়ন সহযোগীদের অনুমতির বিধান, ঠিকাদারের গাফিলতি এবং প্রকল্প পরিচালকদের দক্ষতার অভাব।




