১৩ ক্লিকে হয় না নামজারি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কথা ছিল ১৩ ক্লিকে হবে নামজারি। ২৮ দিনে নিষ্পত্তি। বছর সাতেক আগে ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন চালুর সময় দেখানো হয় এ স্বপ্ন, যা সুদূরপরাহত। ১৩ কেন? ১০০ ক্লিকেও হয় না নামজারি। সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা অ্যাসিল্যান্ড নিষ্পত্তিতে ব্যর্থ হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়ছেন কর্মকর্তা ও সেবাপ্রার্থীরা।
আগামীর সময়-এর অনুসন্ধানে জানা গেছে, একটি নামজারি আবেদন নিষ্পত্তি করতে একজন অ্যাসিল্যান্ডকে ১৩টি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। প্রথম ক্লিকে আবেদন ওপেন করা, দ্বিতীয় ক্লিকে দলিল যাচাই, তৃতীয় ক্লিকে খতিয়ান ও ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) যাচাই, চতুর্থ ক্লিকে নোটিস/শুনানি গ্রহণ, পঞ্চম ক্লিকে বাদী উপস্থিতি নিশ্চত করা হয়, ষষ্ঠ ক্লিকে শুনানির তারিখ পরিবর্তন হয়েছে কি না তা উল্লেখ থাকে, সপ্তম ক্লিকে কোনো আপত্তি থাকলে তা আমলে নেওয়া হয়, অষ্টম ক্লিকে বিবাদী বা তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত আছেন কি না তার উল্লেখ, নবম ক্লিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রস্তাবনা একই নাকি ভিন্ন তা নির্বাচন, ১০ম ক্লিকে মন্তব্য বা ব্যাখ্যা, ১১তম ক্লিকে আবেদন মঞ্জুর, নামঞ্জুর অথবা পুনরায় শুনানির জন্য নির্ধারণ। এসব ধাপ ঠিক হলে ১২তম ক্লিকে হস্তান্তর বৃত্তান্ত, হোল্ডিং সমন্বয়, কানুনগো প্রতিবেদন, শেষ ক্লিক বা ১৩তম ক্লিকে প্রস্তাবিত খতিয়ান অনুমোদন এবং চূড়ান্ত আদেশ।
অ্যাসিল্যান্ডের এই ১৩ ক্লিকের আগে নাগরিক অনলাইনে আবেদন করার পর সেটি প্রথমে অ্যাসিল্যান্ডের আইডিতে আসে। প্রাথমিক যাচাই শেষে আবেদনটি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিসে পাঠানো হয়। সেখান থেকে তদন্ত ও যাচাই-বাছাই শেষে প্রস্তাবসহ আবেদনটি আবার অ্যাসিল্যান্ডের কাছে ফেরত আসে। এরপর আবেদনটি কানুনগোর কাছে পাঠানো হয়। কানুনগোর প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা পুনরায় অ্যাসিল্যান্ডের কাছে আসে। এরপর শুনানির নোটিস, শুনানি এবং চূড়ান্ত আদেশের মাধ্যমে আবেদন নিষ্পত্তি হয়।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাস্তবে শেষ ধাপেই সবচেয়ে বেশি সমস্যা দেখা দিচ্ছে। দেখা যায়, দাগের জমির ব্যালেন্স নেই বা খতিয়ানের দাগের জমির কলামে এন্ট্রিজনিত ভুল আছে। অথচ এটি ইউনিয়ন ভূমি সহকারীর কাছে প্রদর্শিত হলে শুরুতেই নামঞ্জুরের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সব ধাপ শেষ করার পরও চূড়ান্ত অনুমোদনের সময় সার্ভার ত্রুটির কারণে আবেদনটি রিলোড দিতে হয়, ফলে আবার শুরুতে ফিরে যায়। অনেক সময় কোনো অপশনই প্রদর্শিত হয় না। ক্লিক করলেও কাজ করে না কমান্ড। ফলে একই আবেদন বারবার নতুন করে করতে হচ্ছে। কখনোবা ওয়াইফাই কানেকশন কাজ না করায় মোবাইল ডেটা দিয়ে কাজ করতে হয়। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সেবা প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া, সামগ্রিকভাবে সার্ভারের গতি ধীর। ফলে এক মিনিটের কাজ হতে কয়েক মিনিট সাধারণ অবস্থাতেই লেগে যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সহকারী কমিশনার (ভূমি) বললেন, সার্ভার জটিলতা এখন দৈনন্দিন ঘটনা। প্রথম ধাপ শেষ করে দ্বিতীয় ধাপে গেলেই আবেদন আবার প্রথম ধাপে ফিরে যায়। একই কাজ বারবার করতে হচ্ছে। এতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আরেকজন অ্যাসিল্যান্ড বলেছেন, চূড়ান্ত আদেশের আগের ধাপেই সিস্টেম আটকে যায়। অনেক সময় কোনো অপশন আসে না। আবার শুরু থেকে করতে হয়। একটি আবেদন শেষ করতে স্বাভাবিক সময়ের কয়েকগুণ বেশি সময় লাগছে। লোডিং হতেই থাকে। কতবার ক্লিক করতে হচ্ছে, সেটার হিসাবও রাখা সম্ভব হয় না।
নড়াইল সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে এইচ তাসফিকুর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, আবেদন সার্চ করলেও অনেক সময় তথ্য পাওয়া যায় না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে রিভিউ সম্পন্ন হওয়ার পরও আবেদন খুঁজে পাওয়া যায় না। এমন সমস্যার কারণে নামজারির কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তিনি বললেন, এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি আমরা প্রায়ই হচ্ছি। বিষয়টি নিয়ে সহায়তা গ্রুপে জানালে কিছু সময়ের জন্য সমস্যা সমাধান হলেও পরে আবার একই জটিলতা দেখা দেয়।
গত বৃহস্পতিবার দিনের অধিকাংশ সময়ই ছিল সার্ভার সমস্যা। অনেকেই ধারাবাহিকভাবে ১২টি ধাপ সম্পন্ন করেন। কিন্তু ১৩তম ধাপে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপশনে ক্লিক করতেই আবেদনসংক্রান্ত সব তথ্য ফাঁকা (Blank) হয়ে যায়, ফলে অনুমোদন দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে পুনরায় চেষ্টা করলে সপ্তম ধাপে প্যারাশুট আকৃতির অ্যানিমেশনের সঙ্গে ‘দুঃখিত’ শিরোনামে অভ্যন্তরীণ ত্রুটির বার্তা প্রদর্শিত হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একাধিকবার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত আবেদনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া সম্ভব হয়নি। এ ধরনের ঘটনাই বেশিরভাগ ভূমি অফিসে ঘটেছে।
সারা দেশে ৪ লাখ ২৮ হাজার ৯৮০টি নামজারি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সার্বিক গড় মঞ্জুরির হার প্রায় ৬৬ শতাংশ। সারা দেশে প্রায় ৮৫ হাজার আবেদন ২৮ দিনের ঊর্ধ্বে ঝুলে আছে। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় ১ হাজার ৬১১টি আবেদন প্রক্রিয়াধীন। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ ২৮ দিনের বেশি ঝুলে আছে।




