যে আঁতুড়ঘরে একটি ভূখণ্ডের জন্ম

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
বাংলাদেশ জন্মের আঁতুড়ঘর মুজিবনগর সরকার। একটি ভূখণ্ডের জন্মের পর তার জাতীয় সংগীতে বেজে ওঠা সুর ‘ও মা ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে…’, এই শক্তি হয়তো মুজিবনগর আম্রকাননেরই। আজ সেই দিন। ইতিহাসবিদদের অনেকেই মনে করেন, মুজিবনগর সরকার গঠিত না হলে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম হয়তো রয়ে যেত অলীক স্বপ্ন। পাকিস্তান সরকার মুক্তিযুদ্ধকে ‘দেশদ্রোহিতা’ বলে যে প্রচার চালিয়েছিল, তা সফল হয়নি মূলত মুজিবনগর সরকারের দূরদর্শী নেতৃত্বের ফলে।
আর এই মুজিবনগর সরকারের অন্যতম কাণ্ডারি ছিলেন তখনকার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় যিনি পালন করেছেন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব। কিন্তু স্বাধীনতার পর তাজউদ্দীন আহমদকে আসলেই কতটুকু মূল্যায়ন করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রায়ই ওঠে প্রশ্ন। রাজনৈতিক মহলসহ এই প্রশ্ন পরিবারেরও।
‘ক্ষমতাসীন রাজনীতিচর্চায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছায়ার আড়ালে তাজউদ্দীনকে কিছুটা ম্লান দেখা গেলেও ইতিহাসে তার স্বীকৃতি অক্ষুণ্ণই’, মনে করছেন গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ। তার পরামর্শ, ইতিহাসপাঠ করার মধ্য দিয়েই বুঝে নিতে হবে ইতিহাসের সত্যকে।
অন্যদিকে গবেষক ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হকের মতে, তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে আরও বড় পরিসরে গবেষণা হওয়া জরুরি। তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণগুলোকে স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য দলিল হিসেবে দেখতে চান লেখক মিনহাজ উদ্দীন। সেগুলো কেন যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা হয়নি, সে প্রশ্নও তুললেন তিনি।
আম্রকানন থেকে মুক্তির ডাক
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলায় গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার। ১৭ এপ্রিল শপথ নেন এই সরকারের মন্ত্রীরা। পরে বঙ্গবন্ধুর নাম অনুসারে স্থানটির নামকরণ করা হয় ‘মুজিবনগর’ আর সেখানে গঠিত সরকারটিও পরিচিতি পায় মুজিবনগর সরকার নামে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে তাজউদ্দীন আহমদের অবস্থান সম্পর্কে মফিদুল হক কথা বলেছিলেন আগামীর সময়ের সঙ্গে। তার ভাষায়, ‘২৫ মার্চের গণহত্যা, ২৬ মার্চ থেকে স্বাধীনতার সংগ্রাম, ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন এবং ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের শপথ। এর ধারাবাহিকতা এবং দ্রুত এটি করতে পারার নেপথ্যে তাজউদ্দীন আহমদের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।’
মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তবে তিনি কারাগারে বন্দি থাকায় উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। আর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।
মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে কলকাতার থিয়েটার রোডের ৮ নম্বর বাড়িটি ব্যবহার করা হতো। প্রবাস থেকে পরিচালিত এই সরকার ‘প্রবাসী সরকার’ নামেও পরিচিত ছিল। এই সরকারই মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য বাংলাদেশকে ভাগ করে ১১টি সেক্টরে, নিয়োগ দেয় কমান্ডার। মুক্তিবাহিনীকেও ভাগ করা হয় তিনটি ব্রিগেড ফোর্সে। পাশাপাশি মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের দেখভালের দায়িত্বও সফলতার সঙ্গে পালন করে মুজিবনগর সরকার। আর এসব কিছুরই নেতৃত্ব দেন তাজউদ্দীন আহমদ।
তাজউদ্দীনের ভাষণগুলো কোথায় আছে?
বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের তিন গুরুত্বপূর্ণ দিন ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল, ১৭ এপ্রিল এবং ১৬ ডিসেম্বর। এই তিন দিনই বেতারে ভাষণ দিয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। এই তিনটি ভাষণের লিখিত রূপ বিভিন্ন বইয়ে সংকলিত থাকলেও অডিও শোনা যায় না খুব বেশি। এ বিষয়টি বিস্ময়কর বলে মনে করেন লেখক মো. মিনহাজ উদ্দীন।
আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘খুব সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধোত্তরকালে বাংলাদেশের মানুষ এই তিনটি ভাষণের কোনোটিও কোনোদিন শোনেনি। আমি নিজেও কোনোদিন যুদ্ধদিনে তাজউদ্দীন আহমদের দেওয়া এই তিনটি ভাষণের কোনো অংশ বাংলাদেশের গণমাধ্যমে শুনতে পাইনি। এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও নয়।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তীব্র ছাত্র গণআন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন করে আলোচনায় আসেন তাজউদ্দীন আহমদ। তাকে নিয়ে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানও।
তবে এসব আয়োজন কতটুকু তাজউদ্দীনকে সম্মান দেখাতে আর কতটুকু শেখ মুজিবুর রহমানকে খাটো করতে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করেন মিনহাজ।
‘শেখ মুজিবুর রহমানকে পাশ কাটিয়ে রাখার কুচিন্তা অথবা আওয়ামী লীগের প্রতি ক্ষোভ বা অবজ্ঞা থেকে হলেও তাজউদ্দীনের প্রতি সম্মান দেখিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু এই ভাষণগুলো উদ্ধার ও সম্প্রচারের ব্যবস্থা কেউ করেনি। এমনকি কোথাও আলাপও হয়নি এগুলো নিয়ে’, যোগ করলেন তিনি।
স্বাধীনতার দলিলপত্রসহ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনেক বই বা সংকলনে তাজউদ্দীনের ভাষণগুলো লিখিতরূপে আছে বলে জানালেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
অডিওগুলো আকাশবাণীতে খুঁজলে পাওয়া যাবে জানিয়ে বললেন, ‘আমাদের তো ইতিহাস নিয়ে অনুসন্ধান কম। এ ধরনের বড় পরিসরের গবেষণার জন্য আর্থিক বিষয়টিরও দরকার হয়। আমাদের বেশিরভাগ গবেষণা ব্যক্তি উদ্যোগে হয়। কিন্তু বড় পরিসরে গবেষণার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ দরকার।’
প্রায় একই রকম কথা বললেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হকও। তিনি বলছিলেন, ‘তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণ এবং তিনি যুদ্ধকালে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা নানাভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। গবেষকদের কেউ তাজউদ্দীনকে নিয়ে কিছু গবেষণা করেছেন। তবে আরও বড় পরিসরে গবেষণা হওয়া উচিত।’
ইতিহাসের অনুসন্ধানে গণমাধ্যমের দায়িত্বও স্মরণ করিয়ে দেন মফিদুল হক। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রতিবেদনসহ নানা আঙ্গিকের লেখা প্রকাশ হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিলেন তিনি।
বঙ্গবন্ধু নাকি তাজউদ্দীন, যে বিতর্ক অর্থহীন
বঙ্গবন্ধুকে ছোট করার জন্য তাজউদ্দীন আহমদকে বড় করে দেখানো বা উল্টোটি করা অর্থহীন বলে মনে করেন মহিউদ্দিন আহমদ ও মফিদুল হক। ‘শেখ মুজিবুর রহমান তো ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা। তাজউদ্দীনও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ছিলেন, তবে তিনি শেখ মুজিবের ছায়ায় কিছুটা আড়ালে রয়ে গেছেন’, বলছিলেন মহিউদ্দিন আহমদ।
ইতিহাসে তাজউদ্দীনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বললেন, ‘তাজউদ্দীন অত্যন্ত ক্রিটিক্যাল সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং মুজিবনগর সরকার গঠনের অন্যতম কাণ্ডারি ছিলেন। এটা যেমন ইতিহাসের সত্য। আবার স্বাধীন দেশে শেখ মুজিব ফিরে আসার পর সরকারপ্রধান হবেন, এটাও নিশ্চিত ছিল অনেকটাই।’
এর কারণও ব্যাখ্যা করলেন তিনি। মহিউদ্দিন আহমদের মতে, কারাগারে থাকলেও আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ তো শেখ মুজিবের কাছেই ছিল। তাই স্বাভাবিকভাবেই তিনি সরকারপ্রধান হয়েছেন। আর তাজউদ্দীন আহমদকে দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব।
‘কিন্তু পরে অর্থমন্ত্রীর পদ থেকেও পদত্যাগ করতে হলো তাজউদ্দীনকে। কারণ সরকার জনগণের অভিপ্রায় পূরণ করতে পারছিল না। অর্থমন্ত্রী হিসেবে ব্যর্থতার দায় তাজউদ্দীনকেও নিতে হয়েছিল। তবে এর জন্য মুক্তিযুদ্ধে তাজউদ্দীনের যে অবদান, তা খাটো হয়ে যায় না।’ স্বাধীনতার পর থেকে ‘ক্ষমতাসীন’ রাজনীতির কারণে তাজউদ্দীনকে নিয়ে আলোচনা কম হয়েছে বলে মনে করেন মহিউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলছিলেন, ‘আওয়ামী লীগের যেটা সমস্যা, সবকিছুতেই শেখ মুজিবের একচ্ছত্র ব্যাপারটা দেখানো। তা ছাড়া শেখ মুজিবের কন্যা দীর্ঘসময় দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকায় শেখ মুজিব নিয়ে কিছু অতিরঞ্জিত ব্যাপারও হয়েছে। তাজউদ্দীন পরিবারের সদস্যরা তো আর রাষ্ট্রক্ষমতায় বা দলের নেতৃত্বে নেই। ফলে তাজউদ্দীন প্রচারের আলোতে একটু কম।’
তবে ইতিহাসে শেখ মুজিব যেমন মূল্যায়িত, তাজউদ্দীন-জিয়াউর রহমান কিংবা অন্যরাও তাদের প্রাপ্য মূল্যায়নই পাচ্ছেন বলেও মনে করেন মহিউদ্দিন আহমদ।
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ভাষায়, ‘রবীন্দ্রনাথকে ছোট করার জন্য যেমন কেউ কেউ নজরুলকে বেশি করে প্রচার করতে চায়, তেমনি শেখ মুজিবকে ছোট করার জন্য তাজউদ্দীনকে সামনে দাঁড় করাতে চায় কেউ কেউ। কিন্তু ইতিহাসে শেখ মুজিব কিংবা তাজউদ্দীন, রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুল- যার যার যোগ্যতায় প্রাপ্য সম্মানের।’

