মাঠের ১০ টাকার আলু হাতবদলে ঢাকায় ২৫

ভোরের আলো ফোটার আগেই মুন্সীগঞ্জের হিমাগার গেটে আলুর বস্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন কৃষক সজল ব্যাপারী। হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঘামঝরানো ফসলের দাম যখন পাইকাররা কেজিপ্রতি ১০ টাকা হাঁকেন, তখন সজলের চোখে অন্ধকার নামে। অথচ সেই একই আলু কয়েক হাত বদল হয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকার কারওয়ান বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকায়। কৃষকের গোলায় যখন অভাবের হাহাকার, তখন রাজধানীর মধ্যবিত্তের পাতে পরম স্বস্তির এ সবজিটি হয়ে উঠেছে সিন্ডিকেটের মুনাফা লোটার হাতিয়ার। উৎপাদক নিঃস্ব হলেও ঠকছেন ভোক্তা, যা চোখে যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় দেশের কৃষি অর্থনীতির বৈষম্যের গভীর ক্ষত।
ঢাকার বাজারে প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া হলেও, দুই বছর ধরে আলুর দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল। কিন্তু এ স্থিতিশীলতার আড়ালে লুকিয়ে আছে কৃষকের দীর্ঘশ্বাস। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়- বীজ, সার, সেচ ও শ্রম মিলিয়ে এক কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের খরচ হচ্ছে ১৫-১৬ টাকা। অথচ বাজারে ন্যায্যমূল্য না থাকায় তারা ১০-১২ টাকায় আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
মুন্সীগঞ্জের আলুচাষি দেলোয়ার হোসেন তুলে ধরলেন তার একরাশ দুঃখগাথা। আক্ষেপ করে বললেন, ‘৮০০ বিঘা জমিতে আবাদ করেছি। ফলন ভালো হলেও বাজারে পাইকার নেই। কেজিপ্রতি পাঁচ-ছয় টাকা লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে। লাখ লাখ টাকা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে এখন আমি দিশেহারা।’
এ বছর আলুর রেকর্ড উৎপাদন হলেও সংরক্ষণের অভাবে কৃষকরা আরও বিপাকে পড়েছেন। হিমাগারগুলো পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক মাঠেই আলু স্তূপ করে রাখছেন। হঠাৎ বৃষ্টির কারণে সেই আলুতে পচন ধরায় বাধ্য হয়ে নামমাত্র মূল্যে ফসল ছেড়ে দিচ্ছেন তারা। কৃষক রাসেলের মতে, ‘বেশি দিন আলু রাখা সম্ভব নয়, তাই যে যা দাম বলছে তাতেই বিক্রি করছি। বিদেশে রপ্তানি না বাড়লে ৮০ ভাগ কৃষকই এবার পথে বসবেন।’
মাঠ থেকে ভোক্তার পাত পর্যন্ত আলুর দামের এ বিশাল ব্যবধানের নেপথ্যে রয়েছে হাতবদলের দীর্ঘ চেইন। স্থানীয় ফড়িয়া বা দালালরা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কেজিপ্রতি আলু কেনেন ১০ টাকায়। তারা আবার কেজিতে কয়েক টাকা লাভে তা তুলে দেন পাইকারদের হাতে। এ পাইকাররা আবার আলুর চালান নিয়ে যান ঢাকার আড়তে। সেই আড়ত থেকে ১৮-২০ টাকা কেজিতে কেনেন খুচরা বিক্রেতারা। সবশেষ তারা আবার ভোক্তার কাছে বিক্রি করছেন কেজিপ্রতি ২৫-৩০ টাকায়।
ঢাকার কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তাদের দোকান ভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে এ লাভে বিক্রি করতে হয়; কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে- যিনি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলালেন, সেই কৃষকের ঘরে কেন ন্যায্যমূল্যের একটি টাকাও পৌঁছাচ্ছে না?
সুযোগ লুফে নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু সিন্ডিকেট
দেশের বাজারে আলুর দাম আপাতদৃষ্টিতে স্থির মনে হলেও, এর নেপথ্যে রয়েছে এক গভীর অর্থনৈতিক অমিল। মাঠপর্যায়ে হাড়ভাঙা খাটুনি করে আলু ফলানো কৃষক বঞ্চিত তার পাওনা ন্যায্যমূল্য থেকে, অথচ ঢাকার খুচরা বাজারে সেই আলুর দামই সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, একজন কৃষক সার, বীজ, সেচ এবং শ্রম মিলিয়ে আলু উৎপাদনে যে অর্থ ব্যয় করছেন, অনেক ক্ষেত্রে পাইকারি বাজারে বিক্রয়মূল্য সেই উৎপাদন খরচকেও ছুঁতে পারছে না। অভাবের কারণে প্রান্তিক কৃষকরা হিমাগার গেটে নামমাত্র মূল্যে আলু ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ঠিক এ সুযোগটিই লুফে নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু সিন্ডিকেট। তারা কৃষকের থেকে পানির দরে কেনা আলু কয়েক হাতবদল করে ঢাকার বাজারে কয়েকগুণ বেশি দামে পৌঁছে দিচ্ছে। ফলে মাঠের ১০ টাকার আলু যখন শহরের খুচরা বাজারে ২৫-৩০ টাকায় বিক্রি হয়, তখন সেই বাড়তি মুনাফার একটি টাকাও কৃষকের ঘরে পৌঁছায় না। এই অসম ব্যবস্থার ফলে একদিকে যেমন ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে কৃষক আলু চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন, অন্যদিকে রাজধানীর সাধারণ ভোক্তারা তাদের আয়ের একটি অংশ তুলে দিচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। এ অবস্থা দীর্ঘমেয়াদে দেশের কৃষি অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
ঢাকার বাজারে সবচেয়ে বেশি আলু আসে পাশের জেলা মুন্সীগঞ্জ থেকে। এ ছাড়া জয়পুরহাট, বগুড়া, রংপুরসহ আরও কয়েকটি জেলা থেকে আলু আসে ঢাকার বাজারে। উত্তরাঞ্চল থেকে আসা আলুর পরিবহন খরচ আর ঢাকার পাশের জেলা মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা আলুর পরিবহন খরচ সমান না হলেও, ঢাকায় এসে দাম হয়ে যায় সমান।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে মুন্সীগঞ্জে ৩৪ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে।
জেলাটির আলুচাষি ও ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন (৪৫) দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘গত বছরের চেয়ে এ বছরে সার, বীজের দাম কম পড়েছিল, ফলনও ভালো হয়েছে; কিন্তু কেজিপ্রতি ১৫-১৬ টাকা যেখানে উৎপাদন খরচ হয়েছে, সেখানে এখন কৃষকপর্যায়ে বিক্রি করতে হচ্ছে ১০ টাকায়। কোনো কোনো কৃষক এর চেয়েও কমে করছেন বিক্রি। বড় লোকসানের কবলে পড়তে হলো আমাদের।’
টঙ্গীবাড়ি উপজেলার সজল ব্যাপারীর (৩৫) কণ্ঠেও একই সুর- ‘পাইকারই নেই, দাম বলে না। ১০ টাকা কেজি বলে, খরচ তো পড়েছে অনেক বেশি। ক্ষেত করতে এ বছর আমার ৬ লাখ টাকা খরচ হইছে, এখনকার বাজারে ২ লাখ টাকা লোকসান হবে মনে হচ্ছে।’
ঢাকার কারওয়ান বাজারের পাইকারি বিক্রেতা ফিরোজ আহমেদ জানালেন, তারা আড়তদারদের কাছ থেকে কেজিপ্রতি আলু কিনে আনেন ১৮ টাকায় আর তা খুচরায় বেচেন ২০ টাকা কেজি।
একই আলু কৃষকদের কাছ থেকে অনেক কম দামে কিনে আনার বিষয়ে জানতে চাইলে তার সহজ স্বীকারোক্তি- ‘এই বিষয়ে তো আমরা কিছু কইতে (বলতে) পারুম না। আমরা আড়ত থিকা কিনা আনি, আইনা কেজিতে দু-তিন টাকা লাভ করি।’
কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতা জাহাঙ্গীর আলম আগামীর সময়কে জানালেন, তারা পাইকারদের কাছ থেকে আলু কিনে এনে কেজিতে কয়েক টাকা লাভ রেখে বিক্রি করেন কেজিপ্রতি ৩০ টাকায়- ‘এখন আমগো তো কেজিতে কিছু টেকা লাভ করা লাগবোই, নইলে আমার ঘর ভাড়া, কারেন্ট বিলসহ তিনবেলা খাওয়াও লাগে। সবকিছুই মিলাইয়া কত টেকাই আর থাকে! তিনবেলা খাইতেই অনেক দিন ৫০০-৬০০ টেকা খরচ হয়।’
বাজার করতে আসা কারওয়ান বাজারে নিজাম উদ্দীন (৫০) স্বস্তি প্রকাশ করলেন আলুর দাম নিয়ে- ‘সব সবজির দাম ১০০ টাকার ওপর হলেও, আলুর দামটাই এখনো হাতের নাগালে। ২৫-৩০ টাকা কেজি কিনতে হচ্ছে আলু। সব তরকারির সঙ্গে খাওয়া যায় বলে আলুই বেশি করে নিচ্ছি। অন্যদিকে দাম বাড়ছে সব সবজির। দিন যত যাচ্ছে, সবজির দামও বাড়ছে ধীরে ধীরে।’
রপ্তানির বাজারে নতুন সম্ভাবনা : আশা ও শঙ্কা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও ইপিবির তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আলু রপ্তানি চার গুণ বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ১৩৫ টনে। বিশেষ করে রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের ‘সানশাইন’ ও ‘অ্যাস্টারিক্স’ জাতের আলুর রয়েছে বিস্তর চাহিদা। ২০২৬ সালের মধ্যে রাশিয়ায় দুই লাখ টন আলু রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও, স্থানীয় বাজারে কৃষকের এ মন্দা অবস্থা দীর্ঘমেয়াদে হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ আলু রপ্তানি করে আয় করেছে প্রায় ১৪ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ আলুর প্রধান বাজার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে মালয়েশিয়ায়, যেখানে মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই যায়। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কা, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, সৌদি আরব, বাহরাইন এবং সিঙ্গাপুরেও রয়েছে বাংলাদেশি আলুর চাহিদা।
বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারি হস্তক্ষেপের তাগিদ
বাজার দরের ঊর্ধ্বগতির এ সময়ে মধ্যবিত্তের পাতে প্রধান স্বস্তির খাদ্য হলো আলু। পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং সাশ্রয়ী হওয়ায় মাছ, মাংস কিংবা সাধারণ নিরামিষ- সব ধরনের তরকারিতেই এখন আলুর উপস্থিতি। শুধু স্বাদ বাড়াতেই নয়- বরং তরকারির পরিমাণ বৃদ্ধি ও শক্তির জোগান দিতে আলুর বিকল্প নেই। সস্তা ও দীর্ঘকাল সংরক্ষণযোগ্য এ সবজিটি বর্তমানে প্রধান হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকায়।
কিন্তু কৃষকরা বলছেন, এভাবে লোকসান দিতে থাকলে অচিরেই তারা আলু চাষ ছেড়ে দেবেন। আর যদি তেমনটি ঘটে, তবে আজকের এই সস্তা আলু ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের জন্য হয়ে উঠতে পারে দুষ্পাপ্য। দেশের কৃষিব্যবস্থার মেরুদণ্ড এ কৃষকদের বাঁচাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আসন্ন সংকটের দায় এড়ানো হবে কঠিন।
অর্থনীতিবিদ ও কৃষিবিদরা তাগাদা দিয়েছেন কৃষকের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিশ্চিতে সরকারের হস্তক্ষেপের। কৃষিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খানের মতে, ‘কৃষককে বাঁচাতে হলে সরকারকে সরাসরি বাজার থেকে অন্তত ১০ লাখ টন আলু কেনার উদ্যোগ নিতে হবে। উৎপাদন খরচের চেয়ে ১৫-২০ শতাংশ বেশি দামে যদি সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ফসল সংগ্রহ করে মজুদ করে, তবেই মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং কৃষক তার ন্যায্যমূল্য ফিরে পাবেন।’

