তিন মাসেও কেন হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারল না সরকার?

বাংলাদেশের ঢাকার সংক্রামক রোগ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুকে চিকিৎসা দেওয়ার সময় একজন মা তাকে ধরে আছেন। ছবি : রয়টার্স
বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে মহামারি আকারে হাম ছড়িয়ে পড়ার পর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি সরকার। ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, হাম ও এই রোগের উপসর্গে সংক্রমণের সংখ্যা এরই মধ্যে ৮৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৬৫২টি শিশু।
এত মৃত্যুর জন্য সরকারের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
‘সরকারের মিস ম্যানেজমেন্টের জন্যই এত মৃত্যু হয়েছে। যদি ম্যানেজমেন্টটা ভালো করা যেত, তাহলে এত মৃত্যু হতো না,’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. বে-নজির আহমেদ।
ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পরও হামকে মহামারি ঘোষণা করে সারা দেশে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা জারি না করাটা সরকারের একটা 'বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল' বলেও মনে করেন তিনি।
তবে অব্যবস্থাপনার কারণে হামে মৃত্যু বেড়েছে— এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। সেই সঙ্গে দাবি করেছেন, সরকার যথাসময়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে হামে তুলনামূলক কম শিশু মারা গেছে।
‘আমরা রাষ্ট্র ক্ষমতার দায়িত্ব নেওয়ার ১৫ দিন পরেই হামের এটা শুরু হলো। আমরা যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নিতাম, তাহলে হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু হতো,’ বিবিসি বাংলাকে বলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মুহিত।
হাসপাতালের পরিস্থিতি এখন কেমন?
সন্তানদের প্রাণ বাঁচাতে এক মাস ধরে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছোটাছুটি করছেন সালমা বেগম ও আব্দুল গণি দম্পতি।
তারপরও বাঁচাতে পারেননি প্রথম সন্তান ইব্রাহীমকে। সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে তিন সপ্তাহ আগে মারা গেছে আড়াই বছর বয়সী শিশুটি।
‘শুরুতে ওর জ্বর আর ঠান্ডা ছিল। পরে শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। তখন আমরা প্রথমে একটা ক্লিনিকে নিলাম। শ্বাসকষ্ট না কমায় পরে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গিছিলাম। তারপরও আমার বড় ছেলেটারে বাঁচাতে পারলাম না,’ বলছিলেন শিশুর মা সালমা বেগম।
সেই শোক না কাটতেই আরেক ছেলের শরীরেও দেখা দিয়েছে হামের লক্ষণ।
তীব্র জ্বর, ঠান্ডা এবং শ্বাসকষ্টে ভোগা আট মাসের ওই শিশুর প্রাণ বাঁচাতে রাত-দিন এক করে এখন ঢাকার শেরে বাংলা এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে পড়ে আছেন এই বাবা-মা।
‘বড় বাচ্চাটা কিছুদিন আগে মারা গেছে, আর ঈদের পর এই বাচ্চাটারও গায়ে হাম, ঠান্ডা, জ্বর, শ্বাসকষ্ট— এগুলা শুরু হইছে। এখন এক সপ্তাহের মতো হইলো আমরা এই হাসপাতালে ভর্তি করছি,’ বলছিলেন মিজ বেগম।
শিশুটির বাবা পেশায় একজন দিনমজুর। ধারদেনা করে তিনি ছেলের চিকিৎসার খরচ চালাচ্ছেন বলে জানান তিনি।
‘কাছে টাকাপয়সা যা ছিল, সব শেষ হয়ে গেছে। এখন আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে টাকা ধার করে ছেলের চিকিৎসা করতেছি। কত দিন পারবে, কইতে পারি না। দোয়া কইরেন, আল্লাহ যেন সুস্থ করে দেয় আমার ছেলেটারে,’ বলেন শিশুর বাবা আব্দুল গণি।
হাসপাতালে তাদের বিছানার সামনেই আরেকটি বিছানায় মেয়ের সঙ্গে খেলছিলেন সাইমা খান। ফরিদপুর থেকে আসা এই মা জানাচ্ছিলেন, গত এক সপ্তাহে কী ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।
‘আমার বাচ্চাটা নিশ্বাস নিতে পারতেছিল না, শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল খুব। সে কারণে হাসপাতালে আনার পরেই ওরে আইসিইউতে নেওয়া হয়,’ বলছিলেন মিজ খান।
‘এর মধ্যে আশপাশের বেডে বাচ্চারা মারা যাচ্ছে, লাইফ সাপোর্ট নিচ্ছে। এগুলো দেখে আমার মনে অনেক ভয় কাজ করতেছিল। একপর্যায়ে এটাও মনে হচ্ছিল না যে, ও সুস্থ হবে,’ যোগ করেন তিনি।
কিন্তু তিন দিন নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখার পর মিজ খানের মেয়ের শারীরিক অবস্থার অনেকটাই উন্নতি হয়।
‘আমার বাচ্চাটা এখন আল্লার রহমতে ভালোই খাচ্ছে-দাচ্ছে, হাসতেছে-খেলতেছে। মা হিসেবে এই দৃশ্য দেখাটা যে কত শান্তির, বলে বোঝাতে পারবে না,’ বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মিজ খান।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ ঢাকার আরও বেশকিছু হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, সবখানেই হামের ওয়ার্ডগুলোয় রোগী প্রায় কানায় কানায় পূর্ণ।
‘রোগীর চাপ আরও অনেক বেশি ছিল। গত সপ্তাহ থেকে কিছুটা কমতে শুরু করেছে,’ বলেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু বিশেষজ্ঞ মো. আতিকুল ইসলাম।
সরকারের দায় কতটা?
চলতি বছরের মার্চে প্রাদুর্ভাব ঘটার পর তিন মাসে হামে ও হাম সন্দেহে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা এরই মধ্যে পৌনে এক লাখে পৌঁছেছে।
সেইসঙ্গে, নিহতের সংখ্যা বেড়ে সাড়ে ৬০০ ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে মারা গেছে প্রায় তিন ডজনের মতো, যাদের বড় অংশই ঢাকার বাইরে থেকে এসেছিল বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
যথাসময়ে চিকিৎসা শুরু করতে না পারায় তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা।
‘ঢাকার বাইরে থেকে কিছু কিছু মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে আসতেছে। যারা আগে হামে আক্রান্ত হয়েছে, এখন কমপ্লিকেশন ডেভেলপ (জটিলতা তৈরি) করেছে, বিশেষ করে নিউমোনিয়া,’ বলছিলেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা ডা. ইসলাম।
‘এ জন্য আতঙ্ক ও শঙ্কা থেকে ভালো চিকিৎসার জন্য অনেকেই বাচ্চাকে নিয়ে ঢাকায় আসতেছে। কিছু কিছু রোগী এর মধ্য থেকে খারাপ হয়ে যাচ্ছে এবং পরবর্তীতে তাদের অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় মারা যাচ্ছে,’ যোগ করেন ডা. ইসলাম।
বাংলাদেশ থেকে প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া হাম পুনরায় কীভাবে ফিরে এলো এবং এর জন্য দায়ী কারা, সেটি নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন মহলে নানান আলোচনা ও বিতর্ক হতে দেখা যাচ্ছে।
বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, চলমান হাম পরিস্থিতির জন্য বিগত আওয়ামী লীগ এবং অর্ন্তবর্তী সরকার দায়ী।
‘এই হাম সংক্রমণের পেছনে বিগত দুইটা সরকার দায়ী। প্রতি চার বছর পরপর এমআর টিকার ক্যাম্পেইনিং করার কথা ছিল। কিন্তু ২০২০-এর ডিসেম্বরের পরে তারা সেটি করেনি। এর প্রভাব আমাদের ওপরে এসে পড়েছে,’ সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
হামের প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রে আগের দুই সরকারের মধ্যে কে কতটুকু দায়ী, সেবিষয়ে এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
সেইসঙ্গে, হাম পরিস্থিতি কীভাবে এবং কেন এমন পর্যায়ে এলো, তা জানতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে (ডব্লিউএইচও) একটি 'স্বাধীন তদন্ত' করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে অনানুষ্ঠানিক অনুরোধও জানানো হয়েছে।
কিন্তু প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রে ভূমিকা না থাকলেও হাম ছড়িয়ে পড়ার পর তিন মাসেও সেটি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারা এবং এর ফলে যত প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, সেটার জন্য বর্তমান সরকারের দায় রয়েছে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষ করে, হাম ঘিরে জরুরি অবস্থা জারি না করা এবং জেলা পর্যায়ে হামের ভালো চিকিৎসা নিশ্চিত করতে না পারার কারণে মৃত্যু বেড়েছে বলে মনে করেন তারা।
‘আমরা প্রথম থেকেই বলে আসছিলাম যে এটা মহামারি ঘোষণা করে দেওয়া বা একটা স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা দরকার। সেটা করলে সর্বাত্মক একটা ব্যবস্থা নেওয়া যেত সব ফ্রন্ট থেকে,’ বলছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজির আহমেদ।
আর সব ফ্রন্ট থেকে যদি হামের বিরুদ্ধে একসঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করা যেত, তাহলে হাম এত দীর্ঘায়িত হতো না, যোগ করেন ডা. আহমেদ।
প্রাদুর্ভাবের শুরুতে হামকে মহামারি ঘোষণা করে সরকার সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করলে এত বিপুল শিশু হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হতো না বলেও মনে করেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক এই প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।
‘শুরুতেই গুরুত্ব দিয়ে সরকার যদি হামকে মহামারি ঘোষণা করতে এবং মিস ম্যানেজমেন্টের বদলে আরও বেশি ফোকাসড ম্যানেজমেন্ট করতে পারত, আইসিইউ ফ্যাসিলিটিস বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বাড়ানো যেত এবং ডাক্তার ও নার্সদের এ বিষয়ে ট্রেনিং দিতে পারত, তাহলে হাম এত বেশি ছড়াত না, মৃত্যুও কম হতো,’ বলেন ডা. আহমেদ।
সরকার কী বলছে?
বিশেষজ্ঞরা অব্যবস্থাপনার যে অভিযোগ তুলেছেন, সেটি অস্বীকার করেছে সরকার।
কর্মকর্তারা উল্টো দাবি করেছেন যে হামের প্রাদুর্ভাবের পরপরও তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।
কিন্তু এত শিশু আক্রান্ত ও মারা যাওয়ার পরও সরকার কেন হামকে মহামারি ঘোষণা করল না কিংবা স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা জারি করা কেন হলো না?, প্রশ্ন তোলেন আহমেদ।
বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও দাবি করেছেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে তাদের চেষ্টার কমতি নেই।
তবে বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, হাম ঘিরে জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করার সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনীতি থাকতে পারে।
এটা ইমার্জেন্সি ঘোষণা করলে সরকারের দিক থেকে সত্যিকার অর্থে কোনো ক্ষতি ছিল না। এটা একটা রাজনৈতিক স্ট্যান্ড বা অবস্থান, বলছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বে-নজির আহমেদ।
বিষয়টি আরেকটু ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘সে অবস্থানটা এরকম যে, আমাদের সময় একটা হেলথ ইমার্জেন্সি বা একটা মহামারি ঘোষণা করা হয়েছে, এটা আমাদের ব্যর্থতা, আমাদের দুর্বলতা। কিন্তু আসলে এটা একটা ভুল ধারণা। কেননা এখন পর্যন্ত কেউই বলছে না যে, এই মহামারিটা হওয়ার দায় এই সরকারের। বলতেছে, এটা পূর্বাতন সরকারের।’
কাজেই মহামারি যদি ঘোষণা করা হতো, কিন্তু দায় তাদের হতো না— এটা ধরেই নেওয়া যায়। বরং মহামারি ঘোষণা করার পরে যদি এই অল আউট ইফোর্টসগুলো নিত, ত্বরিত ব্যবস্থা নিত এবং খুব দ্রুত মহামারিটাকে থামিয়ে আনতো, মৃত্যু হতে দিত না এত, তাহলে কিন্তু বরঞ্চ সরকার প্রশংসা পেত এবং তাদের এটা ক্রেডিট হিসেবে গণ্য হতো, যোগ করেন ডা. আহমেদ।
কর্মকর্তারা বলছেন, শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ বলয় বা 'হার্ড ইমিউনিটি' গড়ে তোলার মাধ্যমে হাম পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর পরিকল্পনা করেছে সরকার।
এ লক্ষ্য দুই মাস আগে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও এখনো শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
এর মধ্যে আবার হাসপাতালগুলোয় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। ফলে হাম পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা সরকারের জন্য সামনের দিনগুলোয় কঠিন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।


