প্রধান বিচারপতির এজলাস ত্যাগের ঘটনা নিয়ে সংসদে আলোচনা

সংগৃহীত ছবি
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের সঙ্গে কথা কাটাকাটির পর প্রধান বিচারপতির এজলাস থেকে উঠে যাওয়ার বিরল ঘটনাটি সংসদে তুললেন প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান।
বুধবার সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় দাঁড়িয়ে তিনি যখন এই প্রসঙ্গ তোলেন, তখন বিএনপির সংসদ সদস্য হিসেবে মাহবুব উদ্দিন খোকনও ছিলেন অধিবেশন কক্ষে।
এই ঘটনা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করার মতো বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন নাজিবুর রহমান। তিনি আইনমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাশা করেন। এরপর এক বক্তব্যে, এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আর ঘটবে না বলে আশা প্রকাশ করেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান ।
সরকারি দলের সংসদ সদস্য মাহবুব উদ্দিন, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান এবং বিরোধী দলের সদস্য নাজিবুর রহমান তিনজনই সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্বকারী ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।
গতকাল মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এক আইনজীবীকে জরিমানা করেন। এরপর বার সভাপতি মাহবুব উদ্দিন আরেকটি মামলার শুনানির সময় সেই জরিমানা মওকুফের আরজি জানান।
তখন কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছিলেন, বিচারপতি জুবায়ের রহমান প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনজীবীদের আয় কমে গেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বেঞ্চের অন্য বিচারকরা এজলাস ছেড়ে উঠে যান।
বুধবার সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় দাঁড়িয়ে জামায়াত সংসদ সদস্য নাজিবুর বলেন, তিনি আশা করেছিলেন, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি নিয়ে আইনমন্ত্রী একটি বিবৃতি দেবেন। কিন্তু না দেওয়ায় সংসদের দৃষ্টিগোচর করছেন ঘটনাটি।
এই ঘটনার সূত্রপাতের সময় নিজে আদালতে ছিলেন জানিয়ে নাজিবুর বলেন, ‘যখন মূল ঘটনাটি ঘটে, তখন আমি কোর্টে ছিলাম। একজন আইনজীবী বারবার সত্যকে গোপন করে রিট করার কারণে তাকে জরিমানা করা হয়।’
সেই ঘটনা ধরে পরে বার সভাপতি মাহবুব উদ্দিনের সঙ্গে প্রধান বিচারপতির বাদানুবাদের পরিপ্রেক্ষিতেই প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিরা এজলাস ত্যাগ করেন বলে জানান তিনি।
নাজিবুর বলেন, ‘এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, সেটা জনগণকে কী মেসেজ দিচ্ছে, তা আমাদের চিন্তা করতে হবে। ফ্যাসিবাদী আমলে একজন প্রধান বিচারপতিতে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল, সেরকম সিঁদুরে মেঘ দেখা দিচ্ছে কি না, তা আমাদের চিন্তা করতে হবে।’
রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ আরেক অঙ্গের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে কি না কিংবা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে কি না, তা নিয়ে আইনমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাশা করেন তিনি।
এরপর আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, প্রধান বিচারপতি যেভাবে আদালত থেকে উঠে গেলেন, তাতে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর আচরণ যথাযথ ছিল না।
তবে বিষয়টি রাষ্ট্রের এক অঙ্গের সঙ্গে অন্য অঙ্গের মধ্যে সংঘটিত ঘটনা বলে মনে করছেন না আইনমন্ত্রী। তার দৃষ্টিতে, এটা একজন আইনজীবীর আচরণগত বিষয়।
আর বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি আদালত অবমাননার রুল দিতে পারেন বলে তার ধারণা হলেও তেমন কিছু হয়নি।
‘সকাল ৯টায় উঠেই উনি আবার কিন্তু যথারীতি কাজ শুরু করেছেন এবং ওই লইয়ারও সেই মাননীয় প্রধান বিচারপতির কোর্টে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে মামলা করেছেন বলে খবর পেয়েছি।’
এই ঘটনাটি সংসদে তুলে ধরার জন্য বিরোধী সংসদ সদস্যকে ধন্যবাদ জানান আইনমন্ত্রী। সেই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে কেউ ঘটাবেন না বলে আমরা প্রত্যাশা রাখি।’
এরপর মাহবুব উদ্দিন খোকন বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে ডেপুটি স্পিকার তাকে সে সুযোগ দেননি। তিনি বলেন, আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের পর আলোচনার আর অবকাশ নেই।
সেই ঘটনার পর মাহবুব উদ্দিন দাবি করেছিলেন, আইনজীবীদের স্বার্থেই কথা বলেছিলেন তিনি, যার ফলে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বাদানুবাদ হয়েছিল।
তবে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল তাতে ভিন্নমত জানিয়ে বলেছিলেন, আদালতের ঘটনাপ্রবাহে মাহবুব উদ্দিনের বক্তব্যে আইনজীবীদের স্বার্থ রক্ষার বিষয় ছিল না।






