গ্রেপ্তার নজরুলের সংসদ সদস্যপদ : কী হলে কী হবে?

সংসদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলাম
দ্বিতীয় স্ত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর সংসদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ থাকা নিয়ে আবার উঠেছে প্রশ্ন।
কয়েক মাস আগে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর তার সংসদ সদস্যপদ খারিজের দাবি উঠলেও তিনি এখনো টিকে আছেন। তবে এখন তার সঙ্গে আইনি জটিলতা যুক্ত হলো।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) দাবি করছে, নৈতিকতার প্রশ্নে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্যপদ থাকার কোনো সুযোগ নেই।
জামায়াত আগে থেকেই নজরুলের সদস্যপদ খারিজের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে এক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান হলো, বিষয়টি মীমাংসার সময় এখনো আসেনি। আর সংসদের স্পিকার এক্ষেত্রে আদালত কিংবা পুলিশের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন।
জি এম নজরুল ইসলাম (গাজী নজরুল) সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসন থেকে একাধিকবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য। গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে বিজয়ী হয়ে আইনসভায় আসন নেন।
কিন্তু দ্বিতীয় বিয়ে প্রবীণ এই রাজনীতিকের রাজনৈতিক জীবনকে জটিল করে তুলেছে, যার জেরে এখন তিনি গ্রেপ্তার হয়ে পুলিশ রিমান্ডে রয়েছেন।
নজরুলকে নিয়ে বিতর্ক শুরু কীভাবে?
গত জুলাই মাসে হঠাৎ একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে নজরুলকে এক তরুণীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখা যায়।
এনিয়ে আলোচনা উঠলে নজরুল জানান, মরিয়ম খাতুন নামে ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। তিনি সম্প্রতি তাকে বিয়ে করেন। এতে তার প্রথম স্ত্রীর সায় থাকার কথাও জানান তিনি।
তারপরও এনিয়ে আলোচনা ছড়াতে থাকলে জামায়াত নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করে। তাতে কারণ দেখানো হয় নৈতিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ।
তখন সংসদ সদস্যপদ যায়নি কেন?
নজরুলকে বহিষ্কারের পর তার সংসদ সদস্যপদ বাতিলের দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশন ইসিতে চিঠি দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। ইসি তখন বিষয়টি সংসদের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
তখন যুক্তি দেখানো হয়েছিল, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেউ সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংসদ সদস্যপদ শূন্য হতে পারে। নজরুলের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি।
এরপর নজরুলকে সংসদীয় কমিটিতে না রাখতে সরকারি দলের প্রতি অনুরোধ জানায় জামায়াত। ফলে তাকে দুটি সংসদীয় কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
এরপর গত ৭ সেপ্টেম্বর সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটিতে নজরুলের নাম রাখার প্রস্তাব করেছিলেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। কিন্তু জামায়াতের আপত্তির কারণে তা-ও আটকে যায়।
সেদিন নজরুলের সদস্যপদ নিয়ে সংসদে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মধ্যে একটি বিতর্ক হয়েছিল।
বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ সেদিন বলেছিলেন, সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নজরুল ভোটদানে বিরত ছিলেন। ফলে এটাকে দলের বিরুদ্ধে ভোট উল্লেখ করে সংসদে মনোযোগ আকর্ষণী নোটিস আনতে পারে জামায়াত।
তবে সেই আহ্বান নাকচ করে জামায়াত আমির বলেন, নজরুল ভোটদানে বিরত ছিলেন। দলের বিপক্ষে ভোট দেননি। তাই সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ এখানে খাটে না।
ফলে সংসদে নজরুলের সদস্যপদ টিকেই ছিল।
এখন কেন গ্রেপ্তার?
নিজের দূরসম্পর্কের নাতনি মরিয়মকে বিয়ে করার পর তাকে নিয়ে ঢাকায় সংসদ ভবনের পাশে সংসদ সদস্যদের আবাসিক এলাকার (ন্যাম ফ্ল্যাট) ভবনের একটি ফ্ল্যাটে থাকা শুরু করেন নজরুল।
গত রবিবার বিকালে ওই ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে তার বাবা মাসুম বিল্লাহ একটি মামলা করেন।
মামলার আগেই নজরুল এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। পরদিন তাদের এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এরপর আদালতের মাধ্যমে নজরুলকে চার দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল মাকসুদাকেও। রিমান্ড শেষে আজ তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মরিয়মের বাবার অভিযোগ, নির্যাতন চালিয়ে তার মেয়েকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।
কী বলছে টিআইবি
নজরুলের সদস্যপদ নিয়ে প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্রে নৈতিক স্খলনকে সামনে আনছে টিআইবি।
সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এক বিবৃতিতে বলেছেন, সংসদ ও অন্যান্য সংসদ সদস্যের জন্য মর্যাদাহানিকর অবস্থার জন্য দায়ী ব্যক্তির সংসদ সদস্য পদ অব্যাহত থাকবে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
‘একজন জনপ্রতিনিধিকে ঘিরে এমন ধারাবাহিক গুরুতর অভিযোগ ও নৈতিক প্রশ্ন জাতীয় সংসদের মর্যাদার জন্য অবমাননাকর এবং সংসদ সদস্যদের জন্য চরম লজ্জাজনক,’ বলেছেন তিনি।
কী আছে বিধানে?
নৈতিক স্খলনজনিত কারণে সংসদ সদস্যপদ যাওয়ার সুযোগ আছে। তবে সেখানে আদালতে দণ্ডের শর্তও রয়েছে।
সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে আদালত কাউকে অপ্রকৃতিস্থ কিংবা দেউলিয়া ঘোষণা করলে তিনি সংসদ সদস্য হতে কিংবা থাকতে পারেন না।
এই অনুচ্ছেদে বলা আছে, নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে কারও অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ড হলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন।
এই বিধান অনুসারে নজরুলের সংসদ সদস্যপদ যাওয়ার সুযোগ এখন নেই। তবে যে মামলায় তিনি আসামি, তাতে দণ্ড হলে সেই সুযোগ রয়েছে।
আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার মামলায় দোষি সাব্যস্ত হলে অন্যূন পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে।
এই আইনে নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় দোষ প্রমাণিত হলে তার সংসদ সদস্যপদ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।
কর্তৃপক্ষের কী ভাষ্য?
নজরুলের সংসদ সদস্যপদ নিয়ে আজ এক সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে।
তিনি বলেন, যেহেতু নজরুল পদত্যাগ করেননি এবং সংসদে দলের বিরুদ্ধেও ভোট দেননি, তাই তার সদস্যপদ যায়নি। আর মামলা সরকারের কোনো বিষয় নয়। এটা আইনি প্রক্রিয়ায় চলবে।
এই প্রসঙ্গে জাহেদ বলেন, যদি ফৌজদারি এই মামলায় নজরুলের দুই বছরের বেশি সাজা হয়, তাহলে তার সংসদ সদস্যপদ খারিজ হতে পারে।
যার অর্থ দাঁড়ায়, বিচারিক আদালতে এই মামলার রায় না আসা পর্যন্ত নজরুলের সংসদ সদস্যপদ হারানোর সুযোগ কম।
সংসদে নজরুলের সদস্যপদ নিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে জানতে চেয়েছিল প্রথম আলো। তারও একই রকম বক্তব্য আসে।
স্পিকার বলছিলেন, এখন পুলিশ কী ব্যবস্থা নেয়, সেটা দেখে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেওয়া হবে। তখন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। অথবা আদালতের সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
তবে গাজী নজরুলকে নিয়ে জামায়াতের চিঠি আমলে নেওয়ার সুযোগ নেই জানিয়ে তিনিও বলেন, দল বহিষ্কার করলে কারও সংসদ সদস্য পদ যায় না।
ফলে নজরুল নিজে পদত্যাগ না করলে তার সংসদ সদস্যপদ খারিজ দুরূহ, যেমনটি আওয়ামী লীগ আমলে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর বেলায় হয়েছিল।




