রাবিতে সাংবাদিকের ওপর হামলা
রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ন্যায়বিচার দাবি টিআইবির

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলা ও হত্যার হুমকির ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। হামলায় জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছে সংস্থাটি।
একই সঙ্গে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা বন্ধে নিজ নিজ দল ও অঙ্গসংগঠনকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বের প্রতি আমূল সংস্কার ও আত্মশুদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
সোমবার এক বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি জানায়, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রবিবার (৪ অক্টোবর) রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। প্রক্টর কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার সময় পুলিশও ভয়ে সরে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সোমবারের মধ্যে মামলা করার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে ছাত্রদলও এ ঘটনায় দলীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। হামলায় আহত সাংবাদিকেরা অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, হামলার শিকার গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হামলাকারী, তাদের সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
‘আহতদের যথাযথ চিকিৎসা, গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি পুলিশের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা জনগণের তথ্য জানার অধিকারকে খর্ব করে এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির সুযোগ সংকুচিত করে। এর প্রতিকার রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে’—উল্লেখ করেন টিআইবি নির্বাহী পরিচালক।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অসহায়ত্ব এবং পুলিশের ব্যর্থতা প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ ধরনের ক্ষমতার লড়াইকেন্দ্রিক সমস্যার সমাধান শুধু প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ক্ষমতাবান দলগুলোর আমূল সংস্কার ও আত্মশুদ্ধি প্রয়োজন।
তার ভাষ্য, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ ধরনের পরিবর্তন না এলে মুক্ত গণমাধ্যম, বাক ও ভিন্নমতের স্বাধীনতা, জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা এবং সব নাগরিকের সমঅধিকারের মতো মৌলিক অধিকার ক্রমেই হুমকির মুখে পড়বে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সহিংস লড়াই বন্ধ এবং নিজ নিজ দল ও অঙ্গসংগঠনকে নিয়ন্ত্রণের মূল রাজনৈতিক দায় ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এড়িয়ে যেতে পারে না।
তিনি বলেন, তদন্ত কমিটি গঠন বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়ে লোকদেখানো দায়িত্ব শেষ না করে সহিংসতায় প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে হবে। অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দলীয় সিদ্ধান্ত ও আচরণে গণতান্ত্রিক চর্চা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, নিজেদের সংগঠনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন নিশ্চিত না করলে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে জনগণের আস্থা অর্জন করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে উপলব্ধি করতে হবে, নিজেদের দলের নেতাকর্মীদের আচরণের কারণে তারা ক্রমেই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন।
রাবিতে হামলা প্রতিরোধে প্রশাসনের ব্যর্থতাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব ক্ষয়ের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের অংশ হিসেবে দেখছে টিআইবি। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তিনি উল্লেখ করেন, উপাচার্য ও শিক্ষকদের পদত্যাগের দাবি, ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, দখলবাজি ও পেশিশক্তির প্রদর্শনসহ বিভিন্ন সময়ে সৃষ্ট অস্থিরতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরেছে।
শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার চাওয়া এবং শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানানোর অধিকার সুরক্ষিত রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, উপাচার্য বা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও নিয়মতান্ত্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তবে পদত্যাগের দাবি আদায়ে দলীয় প্রভাব, ভয়ভীতি বা বলপ্রয়োগ গ্রহণযোগ্য নয়।
তার ভাষ্য, রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এমনভাবে ক্ষমতাবান হয়ে উঠবে যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দায়িত্ব পালনে এবং পুলিশ আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হবে, এমন পরিস্থিতি চলতে দেওয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হতে হবে আইন ও বিধি অনুযায়ী, কোনো দলীয় শক্তির দাপটে নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের ব্যর্থতার কারণ উদঘাটন এবং দায় নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটি বলেছে, রাজনৈতিক চাপ বা অসহায়ত্বের কথা বলে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
টিআইবি আরও বলেছে, রাজনৈতিক পরিচয় যেন অপরাধের সুরক্ষাকবচ না হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্ব পালন করতে পারে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।




