বাতিল হচ্ছে ২০৯ উন্নয়ন প্রকল্প

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতাভুক্ত ২০৯টি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার এসব প্রকল্পের মধ্যে চলমান ২৭টি এবং নতুন ১৮২টি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগই রাজনৈতিক বিবেচনা হওয়ায় এবং ‘যৌক্তিক প্রয়োজনীয়তা’ না থাকায় নেওয়া হয়েছে এমন সিদ্ধান্ত। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে তথ্য নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সেক্টরভিত্তিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলছে, এডিপির আওতাভুক্ত প্রকল্পগুলো যাচাই-বাছাইয়ে কাজ করছে একটি কমিটি। এটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য ড. নেয়ামত উল্ল্যা ভূঁইয়া। এ কমিটির কাছেই উপস্থাপন করা হয়েছে প্রতিবেদনটি।
কমিশন সূত্র বলছে, সরকারের যাচাই-বাছাইয়ে (রিপারপাসিং ও রি-স্কোপিং) বাতিলের তালিকায় থাকা চলমান ২৭টি প্রকল্পে এরই মধ্যে প্রায় সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। তবে বাকিগুলোয় এখনো দেওয়া হয়নি কোনো বরাদ্দ। সেগুলো শুধু সবুজসংকেত পেয়েছিল। এদিকে বাতিল না হলেও রিপারপাসিং ও রি-স্কোপিং করা হবে আরও ৪৩৭টি প্রকল্প; যার মধ্যে চলমান ১৫৯টি এবং নতুন ২৭৮টি।
প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তের বিষয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘ঢালাওভাবে যেকোনো প্রকল্প অনুমোদন করতে চায় না সরকার। যেসব প্রকল্প জনকল্যাণে সত্যিকার অর্থেই কাজ করবে এবং দেশের উন্নয়নে প্রয়োজন হবে, সেসব প্রকল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
তবে এই রিপারপাসিং ও রি-স্কোপিংয়ের কাজটি যত দ্রুত করা যায়, সেই প্রচেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানালেন প্রতিমন্ত্রী। তার ভাষ্য, এতে সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রমে কিছুটা বাধার সৃষ্টি হলেও সেটির সুদুরপ্রসারী ফল পাওয়া যাবে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের আওতায় চলতি অর্থবছরে চলমান প্রকল্প রয়েছে ৩৪৮টি। এ ছাড়া অনুমোদনহীন নতুন ২৮৫টিসহ ৬৩৩টি প্রকল্প। রি-স্কোপিং ও রিপারপাসিং হবে— এমন প্রকল্প রয়েছে ১২০টি। বাদ যাবে চলমান দুটি ও সবুজ অনুমোদনহীন ৫৩টিসহ ৫৫টি উন্নয়ন প্রকল্প।
ভৌত অবকাঠামো বিভাগের আওতায় চলমান ৩৭৯ এবং অনুমোদনহীন নতুন ৫৫২টি মিলে প্রকল্প আছে ৯৩১টি। এর মধ্যে রিপারপাসিং ও রি-স্কোপিং হবে ১১০টি। এ ছাড়া বাদ যাবে চলমান ১৯টি, অনুমোদনহীন নতুন ৪২টিসহ ৬১টি উন্নয়ন প্রকল্প।
শিল্প ও শক্তি বিভাগের আওতায় চলমান ১১৮ ও নতুন ১১৫টিসহ প্রকল্প আছে ২৩৩টি। এর মধ্যে রিপারপাসিং ও রি-স্কোপিং হবে ২৭টি। বাদ যাবে চলমান ৩টি ও অনুমোদনহীন নতুন ২৪টিসহ ২৭টি উন্নয়ন প্রকল্প। আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের আওতায় চলমান ২৯৫টি এবং অনুমোদনহীন নতুন ৩২২টিসহ মোট প্রকল্প আছে ৬১৭টি। এর মধ্যে রিপারপাসিং ও রি-স্কোপিং হবে ১৮০টি এবং বাদ যাবে চলমান ৩টি ও অনুমোদনহীন নতুন ৬৩টিসহ মোট ৬৬টি উন্নয়ন প্রকল্প।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘ঢালাওভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় অপ্রয়োজনীয় নেওয়া হয়েছে বলে চলমান প্রকল্প বাতিল করা ঠিক নয়। কেননা, যে এলাকার প্রকল্প সেখানে গিয়ে দেখতে হবে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া প্রকল্পগুলো নেওয়ার আগে অবশ্যই সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হওয়ার কথা। যদি প্রয়োজন না থাকত, তাহলে নেওয়ার কথা নয়। সেই সঙ্গে প্রকল্পগুলোর আওতায় যদি কোনো অর্থ খরচ হয়ে থাকে, অবশ্যই সেটি অপচয় হবে। তাই বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে।’ সাবেক এই কর্মকর্তার ভাষ্য, যাচাই-বাছাইয়ের পর যদি দেখা যায় সত্যিকার অর্থেই এসব প্রকল্পের প্রয়োজন নেই, তাহলে শুধু বাতিলই যথেষ্ট নয়। ওই সময় যারা এসব প্রকল্প তৈরি ও প্রস্তাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
খতিয়ে দেখা হচ্ছে বৈদেশিক ঋণের প্রকল্পও: পরিকল্পনা কমিশনের চারটি সেক্টরের অধীনে বৈদেশিক ঋণের প্রকল্প রয়েছে ৩৩২টি। এসব প্রকল্পও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এজন্য সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বৈদেশিক অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এবং অননুমোদিত নতুন প্রকল্পগুলো বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য কি না, সেটি যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। বিবেচনায় রাখা হচ্ছে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির শর্তও। আর বিষয়গুলো পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে অবহিত করার কাজও চলছে। এজন্য গত ১৩ আগস্ট একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি)। সে অনুযায়ী অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ কর্তৃক মন্ত্রণালয়/বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে যাচাই-বাছাইয়ের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
আছে চ্যালেঞ্জ: প্রতিবেদনে উল্লেখ করা চ্যালেঞ্জগুলোর অন্যতম হলো— প্রযোজ্য ক্ষেত্রে এক বা একাধিক প্রকল্প সমাপ্ত করে একটি সমন্বিত প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করতে হবে। এতে প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অতিরিক্ত সময় ও অর্থের প্রয়োজন হতে পারে, তাই এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। এ ছাড়া চলমান বা অননুমোদিত নতুন একাধিক প্রকল্পকে সমন্বিত করে একটি প্রকল্পে রূপান্তর করা হলে যেসব ক্ষেত্রে জনবল কাঠামো পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে, তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে সম্পন্ন করতে হবে। বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রকল্প সমাপ্ত ও সমন্বিত প্রকল্প সংশোধন করার জন্য বেশ কিছু সময়ের প্রয়োজন হবে, তাই সেক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রারম্ভিক পর্যায়ে ধীরগতিসম্পন্ন হলে সে সমস্যা নিরসনের উদ্যোগ নিতে হবে। একাধিক প্রকল্প একীভূত করার ক্ষেত্রে সমাপ্ত করা প্রকল্পের অডিট আপত্তিসহ অন্যান্য দায়ভার অন্য প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালককে নিতে হতে পারে। এরূপ অনভিপ্রেত পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। প্রকল্পের কলেবর বৃদ্ধি পাওয়ায় একটি অর্থবছরে আগের চেয়ে বেশি বরাদ্দের প্রয়োজন হবে এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থারও সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগী ভূমিকা থাকতে হবে। ভূমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন হলে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।







