৪ হাজার কোটি টাকার লাইনে চলে এক ট্রেন
- মোংলা-বেনাপোল রেলপথে চালুই হয়নি পণ্যবাহী ট্রেন অথচ এটিই ছিল মূল লক্ষ্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দিনে এক ট্রেন। নিয়মিত কোনো মালবাহী ট্রেন নেই। ৯টি স্টেশনের তিনটির কার্যক্রমই শুরু হয়নি। অথচ এ রেলপথ বানাতে খরচ হয়েছে ৪ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। মোংলা-বেনাপোল রেলপথ উদ্বোধনের দুই বছর পরের চিত্র এমনই।
অথচ মোংলা বন্দরকে জাতীয় রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করে পণ্য পরিবহন সহজ, সাশ্রয়ী ও দ্রুত করতে এ পথ তৈরি করা হয়। যাত্রী পরিবহনে একমাত্র ট্রেনটিও চলছে সীমিত সময়ে। ফলে বিপুল অর্থে গড়ে তোলা অবকাঠামোর বড় অংশই থাকছে অব্যবহৃত।
পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগে প্রকল্পটির উদ্বোধন হয় ২০২৩ সালের ১ নভেম্বর। বাণিজ্যিকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু হয় ২০২৪ সালের ১ জুন। মোংলা কমিউটার নামে একটি ট্রেন দিয়ে যাত্রী পরিবহন শুরু হলেও এরপর আর ট্রেনের সংখ্যা বাড়েনি। নিয়মিত মালবাহী ট্রেনও চালু হয়নি। ভারতীয় ঋণের অর্থে রেললাইন নির্মিত হওয়ায় কিস্তিতে তা পরিশোধ করতে হবে। দ্রুত মালবাহী ট্রেন চালু না হলে ভবিষ্যতে এটি লোকসানের বোঝা হতে পারে।
প্রতি মঙ্গলবার বাদে সপ্তাহে ছয় দিন চলা ট্রেনটির সংখ্যা এরপর আর বাড়েনি। খুলনা-বেনাপোল রুটের বেতনা ট্রেনটিই মোংলা কমিউটার হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে খুলনা ছেড়ে বেনাপোল যাওয়ার পর ৯টা ১৫ মিনিটে মোংলা কমিউটার নামে আবার বেনাপোল ছাড়ে। দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে মোংলা পৌঁছে দুপুর ১টায় আবার ছাড়ে। বিকাল সাড়ে ৪টায় বেনাপোল পৌঁছে ৫টায় বেতনা নামে খুলনার উদ্দেশে যাত্রা করে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় খুলনায় ফেরে।
রেলওয়ের বাণিজ্যিক বিভাগ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মোংলা কমিউটারে ৭ লাখ ৩০ হাজার ৫৭০ জন যাত্রী চলাচল করেছেন। এতে রাজস্ব আয় হয়েছে ২ কোটি ৬৮ লাখ ৮২ হাজার ৩৪৮ টাকা।
রেলপথের সঙ্গে ফুলতলা, আড়ংঘাটা, মোহাম্মদনগর, কাটাখালি, চুলকাটি বাজার, ভাগা, দিগরাজ ও মোংলা স্টেশন নির্মিত হয়। তবে আড়ংঘাটা, ভাগা ও দিগরাজের কার্যক্রম এখনো চালু হয়নি। ফুলতলা, মোহাম্মদনগর, কাটাখালি, চুলকাটি বাজার ও মোংলায় ট্রেনের স্টপেজ রয়েছে।
এ পথের নিয়মিত যাত্রী মো. মোখলেসুর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, বাসে খুলনা থেকে মোংলা যেতে ভাড়া বেশি, সময় লাগে আড়াই ঘণ্টা। ট্রেনে ভাড়া কম, সময়ও লাগে এক ঘণ্টা। বাগেরহাট, মোংলা ও খুলনা থেকে যশোর ও বেনাপোলে নিত্যকাজে যাতায়াত করতে অনেকে ট্রেন ব্যবহার করতে চান। কিন্তু প্রয়োজনের সময় ট্রেন পাওয়া যায় না। সারা দিনে একটি ট্রেন চলায় চাপও বেশি। মোংলা থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনটি বেনাপোলে পৌঁছায় বিকাল সাড়ে ৪টায়। ফলে ভারতের উদ্দেশে যাওয়া যাত্রীদের নির্ধারিত সময়ে ইমিগ্রেশন পার হওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়। কারণ সন্ধ্যা ৬টার পর ইমিগ্রেশন বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া ঢাকা-মোংলা রুটেও ট্রেন নেই।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনার সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বললেন, মোংলায় সরকারি-বেসরকারি অফিস, ইপিজেড ও ব্যাংক রয়েছে। প্রতিদিন সকালে খুলনা থেকে ১০-১২টি বাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সেখানে যান। অফিস সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ট্রেন চালানো হলে কম খরচে ও সময়ে কর্মস্থলে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু ট্রেনের সংখ্যা না বাড়ায় সেটি হচ্ছে না।
তিনি বললেন, উত্তরবঙ্গের বগুড়া ও দিনাজপুরের কৃষিসহ বিভিন্ন পণ্য বেশি খরচে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রপ্তানি করা হয়। নিয়মিত মালবাহী ট্রেন চালু হলে এসব পণ্য মোংলা বন্দর দিয়ে রপ্তানি করা সম্ভব। এতে সময় ও খরচ কমবে।
খুলনা রেলস্টেশনের টিআই অংশুমান রায় চৌধুরী বলেছেন, একটি স্টেশন সচল রাখতে সাধারণত তিনজন স্টেশন মাস্টার, ছয়জন পয়েন্টসম্যান, তিনজন বুকিং সহকারী, একজন পোর্টার ও একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু পুরো রুটে ডেপুটেশনে আসা মাত্র ১১ জন জনবল দিয়ে পরিবহন কার্যক্রম চলছে। ট্রেনের সংখ্যা বাড়াতে জনবল প্রয়োজন।
খুলনা রেলওয়ের পাকশী বিভাগের বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা হাসিনা খাতুন বললেন, যাত্রীদের চাহিদা বিবেচনায় এ রুটে ট্রেন বাড়ানো প্রয়োজন। আরও একটি ট্রেন চালুর প্রস্তাব রেল মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে নতুন ট্রেন ও বন্ধ স্টেশন চালাতে জনবল প্রয়োজন। জনবল মঞ্জুর হলে ট্রেন বাড়ানো সম্ভব।
মালবাহী ট্রেনের বিষয়ে তিনি বললেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩০ ট্রিপ মোলাসেস, চিটা ও গুড় মোংলা বন্দর থেকে জয়পুরহাটে গেছে। অন্য পণ্য পরিবহনের বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কয়েকবার বৈঠক হলেও ফলপ্রসূ হয়নি। বন্দর কনটেইনার বা কার্গো ট্রেন চায়, কিন্তু রেলওয়ের এমন ট্রেন নেই। ব্যবসায়ীদেরও আগ্রহ কম।
রেলপথ নির্মাণের সময় প্রকল্পটির পরিচালক (পিডি) ছিলেন আহমেদ হোসেন মাসুম। এক প্রশ্নে তিনি বলেছেন, ‘রেলপথ নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল মোংলা বন্দরের পণ্য সহজ, সাশ্রয়ী ও দ্রুত পরিবহন করা এবং বন্দর ব্যবহার করে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানো। এজন্য শুধু রেলপথ নির্মাণ যথেষ্ট নয়, বন্দর ও রেলওয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।’
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেছেন, রেলে পণ্য পরিবহনের জন্য বন্দর প্রস্তুত। তবে আমদানিকারকসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমে কনটেইনার ও মালবাহী ট্রেন চালু করতে হবে। পাশাপাশি ঈশ্বরদী ও উত্তরা ইপিজেডের ভেতরে রেললাইন সংযোগ দিতে হবে। এসব হলে ফল, গার্মেন্টসসহ অন্যান্য পণ্য রেলে পরিবহন বাড়বে।
প্রকল্পের সাবেক পিডি আহমেদ হোসেন মাসুম বলেছেন, ভারতীয় অর্থায়নে রেলপথটি নির্মিত হয়েছে। ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হবে। তবে কোনো টাকা পরিশোধ হয়েছে কি না, তা জানা নেই। পাকশীর বিভাগীয় ব্যবস্থাপক লিয়াকত শরীফ খানও এ বিষয়ে কিছু জানাতে পারেননি। রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালকসহ (অর্থ) বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেও ঋণ পরিশোধের তথ্য পাওয়া যায়নি।



