জাপানে ৭৩৭৯ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে বাংলাদেশ
- ‘সংস্কার সংস্কার’ বলে সরকারের বিরুদ্ধে পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী
- জাপানের সঙ্গে ৬ চুক্তি মিলবে ২ ঋণ প্রকল্প

সংগৃহীত ছবি
অর্থনৈতিক সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পাবে জাপানে। অন্যদিকে ইস্পাত, মোটরযানের যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক উপাদানসহ জাপানের বিভিন্ন পণ্য বাংলাদেশে পাবে অগ্রাধিকারমূলক বাজার-সুবিধা। জাপান সফরের তৃতীয় দিনে এসব তথ্য জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও প্রযুক্তি সহযোগিতার নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
একই সঙ্গে ‘সংস্কার সংস্কার’ বলে সরকারের বিরুদ্ধে পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, প্রান্তিক মানুষের উপকার হয় এমন সংস্কার বিএনপি যাতে করতে না পারে— সে চেষ্টা চলছে। তবে তার সরকারের অগ্রাধিকার সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের উন্নয়নের পাশাপাশি ঢাকাকে টোকিওর মতো পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে চান তিনি। গতকাল বুধবার জাপানের রাজধানী টোকিওতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে এবং হোটেল নিউ ওতানিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলছিলেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত করতে জ্বালানি, প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস উৎপাদন ও আধুনিক যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন তারেক রহমান।
‘প্রান্তিক মানুষের উপকার হয়, এমন সংস্কার চাই’
প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেছেন, ‘যে সংস্কার করলে একদম প্রান্তিক মানুষটা উপকার পাবে, সে সংস্কারগুলো যাতে বিএনপি করতে না পারে, সে পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে।’
তিনি বললেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের উন্নয়নের মতো উদ্যোগের সুফল সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন। একজন রিকশাচালক থেকে শুরু করে চিকিৎসক, আইনজীবী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও শিক্ষক— সবার জীবনমান উন্নত হয়, এমন সংস্কারই তার কাছে অগ্রাধিকার।
প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘সংস্কার বলতে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে আমি সেই সংস্কারকেই বুঝি, যে সংস্কারের সুবিধা আমার প্রান্তিক মানুষটা পায়।’
সরকারের কাজ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা চান।
অনুষ্ঠানে সফরসঙ্গী হিসেবে আসা আমজনতার দলের সদস্য সচিব মো. তারেক রহমান সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘এই যে এখানে আম তারেক আছে। তাকে নিয়ে নানা সমালোচনা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তাকে নিয়ে আসায় নাকি সরকারের টাকার অপচয় হয়েছে। অথচ দেশের নানা সমস্যা, তা নিয়ে তাদের কোনো কথা নেই।’
ঢাকাকে টোকিওর মতো পরিচ্ছন্ন করার পরিকল্পনা
ঢাকাসহ সারা দেশকে পরিচ্ছন্ন করে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, টোকিওর রাস্তায় কোনো ময়লা দেখতে পাননি বলে তার সফরসঙ্গীদের একজন জানিয়েছেন। অথচ ঢাকার বিভিন্ন সড়কে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকে। তিনি বললেন, রাজধানীর বায়ুদূষণ কমাতে হবে, বিভিন্ন স্থানে গাছ লাগাতে হবে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে।
প্রবাসীদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ সফরসঙ্গীরা উপস্থিত ছিলেন। জাপান বিএনপি নেতাদের মধ্যে মীর রেজাউল করিম, ইমদাদুল ইসলাম মনি, আলমগীর হোসেন মিঠু, এস ইসলাম নান্নু, সাইফুল্লাহ জাহেদ আসিক, মীর কাজু, মোল্লা দেলোয়ার, টিটু ব্যাপারী, ব্যবসায়ী সেলিম পাঠান, আসমা পাঠান প্রমুখ ছিলেন।
জাপানি বিনিয়োগে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র গড়ার লক্ষ্য
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ১৮ কোটির বেশি মানুষের বাজার, তরুণ কর্মশক্তি, ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্তশ্রেণি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বাংলাদেশকে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করেছে। জ্বালানি খাতে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে জাপানের সহযোগিতা চান তিনি।
প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও জানালেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেঘভিত্তিক কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনে জাপানি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করেছেন। মহাকাশবিজ্ঞান, উপগ্রহ ও মহাকাশ প্রকৌশলেও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
আড়াইহাজারে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের সুযোগ
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরে তারেক রহমান বললেন, আড়াইহাজারে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলে গাড়ি নির্মাতা, বড় খুচরা বিক্রেতা, কৃষিযন্ত্র প্রস্তুতকারকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করলে জাপানি কোম্পানিগুলো একদিকে দেশের বড় বাজারে প্রবেশ করতে পারবে, অন্যদিকে বাংলাদেশকে উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানির সুযোগ পাবে।
জাপানি ভাষা শিখবেন লাখো তরুণ
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জাপানি ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের লাখো তরুণ জাপানি ভাষা শিখবেন— এমন ভবিষ্যৎ দেখতে চায় সরকার। এর মাধ্যমে জাপানে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। বক্তব্যের শেষে জাপানি ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়নে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
জেবিআইসির কার্যালয় খোলার আলোচনা
গতকাল সকালে জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর আমাকাওয়া কাজুহিকোর সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এতে জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশে জেবিআইসির একটি কার্যালয় খোলার অনুরোধ জানানো হলে প্রস্তাবটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন গভর্নর।
ইউনিক্লোকে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান
জাপানের পোশাক প্রস্তুতকারক ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ইউনিক্লোর মূল প্রতিষ্ঠান ফাস্ট রিটেইলিংয়ের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাদাশি ইয়ানাইয়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে, বিশেষ করে কৃত্রিম তন্তু, কারিগরি বস্ত্র ও টেকসই পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারেক রহমান।
জেটরোর সঙ্গে বাণিজ্য ও দক্ষতা উন্নয়নে আলোচনা
জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেটরো) প্রেসিডেন্ট কাতাওকা সুসুমুর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ ও দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে উন্নত উৎপাদনশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, গাড়ি নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ প্রত্যাশা করেছেন তিনি। জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতারও আহ্বান জানিয়েছেন। বৈঠক শেষে জেটরো প্রেসিডেন্টের আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।
জাপানের সঙ্গে ৬ চুক্তি, মিলবে ২ ঋণ প্রকল্প
জাপানের সঙ্গে ছয়টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই করেছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি বাংলাদেশের উন্নয়নে দুটি ঋণ প্রকল্পে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। এ ছাড়া দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের সরকারি সফরের তৃতীয় দিনের কর্মসূচি নিয়ে টোকিওর বাংলাদেশ দূতাবাসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া ছয়টি দলিলের মধ্যে রয়েছে চারটি সহযোগিতা স্মারক, একটি অনুদান চুক্তি এবং জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক একটি আগ্রহপত্র।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে একটি টহলজাহাজ সরবরাহের জন্য সর্বোচ্চ ২১২ কোটি ইয়েন অনুদান দেবে জাপান। এ ছাড়া বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে ১ হাজার ৫৮৮ কোটি ইয়েন এবং উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩ হাজার ৬৮ কোটি ইয়েন ঋণ দেওয়া হবে।
যেসব বিষয়ে চুক্তি
জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে সহযোগিতা স্মারক সই হয়েছে। কৃষি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আরেকটি স্মারক সই হয়। দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে কর্মসংস্থানের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়েও দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছেছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সহযোগিতা বাড়াতে জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে পৃথক সহযোগিতা স্মারক সই হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়াতে জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি আগ্রহপত্রও সই হয়েছে।
সরকারি পর্যায়ের এসব চুক্তির পাশাপাশি জাপান বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থার (জেট্রো) উদ্যোগে দুই দেশের বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।



