মাউশিতে ধরা পড়ল বহুরূপী ভুয়া বিসিএস কর্মকর্তা
- ব্যাগে মিলল ১৩ জাল ডিও লেটার ও চেকবই
- প্রতিমন্ত্রীর ভুয়া ডিও লেটার নিয়ে বদলির তদবির
- কখনও বিসিএস ক্যাডার, কখনও এপিএস বা যুগ্ম সচিব পরিচয়

মহিবুল্লাহ আটক করেছে পুলিশ—ছবি: আগামীর সময়
রাজধানীর প্রশাসনিক পাড়া সচিবালয় কিংবা শিক্ষা প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) করিডোর। সব জায়গায় অতি-পরিচিত মুখ মুহিব্বুল্লাহ। সবাই তাকে চিনে বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে। এর বাইরেও তার আরেকটি ভুয়া পরিচয় হলো তিনি প্রতিমন্ত্রীর এপিএস। কখনও আবার যুগ্ম সচিবও। অর্থাৎ একেক জায়গায় তার রূপ ছিল একেক রকম। যখন যেটি ব্যবহার করার প্রয়োজন সেটিই করতেন। এমন এক প্রতারককে হাতে নাতে ধরেছে মাউশি।
আজ সোমবার বিকালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের একটি ডিও লেটারে বদলির তদবির করতে আসলে মহিবুল্লাহকে হাতেনাতে ধরে মাউশি প্রশাসন। দপ্তরটির প্রশিক্ষণ পরিচালক ও প্রশাসন শাখার সহকারী পরিচালক তার ব্যাগ তল্লাশি করে ১৩টি ভুয়া ডিও লেটার, বদরুন্নেসা কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপকের ভুয়া আইডি কার্ড, লাখ টাকার চেক, সোনালি ব্যাংকের চেকবই, একটি নম্বরের লিস্ট এবং বিপুল ভিজিটিং কার্ড, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরসহ অন্যান্য সরকারি দপ্তরের বিভিন্ন পদের বদলি সংক্রান্ত জাল নথিপত্র উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাকে শাহবাগ থানায় সোর্পদ করা হয়।
মাউশির কর্মকর্তারা জানালেন, মুহিব্বুল্লাহ অনেক দিন ধরেই মাউশিতে বদলির তদবির করে আসছেন। সবাই তাকে চিনে বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে। আদৌতে তিনি একজন প্রতারক। তিনি কখনও ৩৬তম বিসিএস ক্যাডার, কখনও প্রতিমন্ত্রীর এপিএস, কখনও যুগ্ম সচিবের পরিচয় দিতেন। ব্যাগে থাকত একাধিক মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীর ডিও লেটার। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ভুয়া আইডি কার্ড। কখনো তিনি টাই-স্যুট চড়িয়ে বুক ফুলিয়ে হাঁটেন। পরিচয় দেন ৩৬তম বিসিএস ক্যাডার বদরুন্নেসা কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। নিজের বানিয়ে নেওয়া ভুয়া আইডি কার্ডটি সব সময় গলায় ঝুলিয়ে রাখতেন। সচিবালয়ের পরিচয় আমি অমুক প্রতিমন্ত্রীর এপিএস। কখনও যুগ্ম সচিব।
সোমবার মুক্তিযোদ্ধা প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের একটি ডিও লেটার নিয়ে মহিবুল্লাহ হাজির হন মাউশিতে। জামালপুরের এক স্কুলের হিসাব সহকারী আশেক মাহমুদ কলেজে ‘হিসাব রক্ষক’ হিসেবে পদায়ন করার তদবির। কিন্তু বিধি বাম। ডিও লেটারটি কয়েকটি টেবিল ঘুরে পৌঁছাল সহকারী পরিচালক, প্রশাসননের কাছে। সস্তা ফটোকপি অভিজ্ঞ কর্মকর্তার চোখ ফাঁকি দিতে পারেনি। চিঠির ভাষা, স্মারক নম্বর আর সইয়ের ধরনে খটকা লাগতেই খবর দেওয়া হলো মাউশির অন্যান্য কর্মকর্তাদের। তারা খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন বদরুন্নেসা কলেজের ইংরেজি বিভাগে মহিবুল্লাহ নামের কোনো সহকারী শিক্ষকের অস্তিত্বই নেই। এরপর বহুরূপী মহিবুল্লাহর ব্যাগ তল্লাশি বেরিয়ে এলো প্রতারণার আস্ত কারখানা।
ভুয়া ডিও লেটারগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মুহিবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে একই কৌশলে প্রতারণা করে আসছিলেন। একটি চিঠিতে তিনি প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের ভুয়া প্যাড ব্যবহার করে ফেনী সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোবাশ্বেরা আক্তারকে ঢাকার কবি নজরুল সরকারি কলেজে বদলির সুপারিশ করেন। এতে মোবাশ্বেরা আক্তারকে প্রতিমন্ত্রীর ছোট বোন হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। চিঠিতে বোনজামাইয়ের গুরুতর অসুস্থতা এবং সন্তানদের পড়াশোনার বিষয়টি তুলে ধরে আবেগঘন কারণ দেখিয়ে ঢাকায় বদলির অনুরোধ করা হয়।
আরেকটি ভুয়া ডিও লেটারে কবি নজরুল সরকারি কলেজের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ইউসুফকে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের পরিদর্শক পদে (প্রেষণে) নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। এ ক্ষেত্রে পারিবারিক কারণ নয়, রাজনৈতিক পরিচয়কে কাজে লাগানো হয়। চিঠিতে দাবি করা হয়, ওই অধ্যাপক প্রতিমন্ত্রীর এলাকার পরিচিত ব্যক্তি এবং ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি তাকে জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রতি বিশ্বস্ত ব্যক্তি বলেও উল্লেখ করা হয়।
পারিবারিক সংকট দেখিয়ে বদলির তদবির
ফকিরহাটের সহকারী শিক্ষক (জীববিজ্ঞান) ইউসুফ হাসানকে স্ত্রীর কর্মস্থল বগুড়ায় বদলির আবেদনে প্রতিমন্ত্রীর জাল সই ও ‘Take Necessary Action’ অনুশাসন ব্যবহার করা হয়। আবেদনে শ্যালিকার মেসে থাকা, শ্বশুর প্যারালাইসিস হয়ে শয্যাশায়ী হওয়া এবং দুই শিশুর লালন পালনের করুণ কাহিনী তুলে ধরে কর্মকর্তাদের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করা হয়। মুহিব্বুল্লাহ কেবল মাউশিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি নিয়মিত সচিবালয় ও প্রশাসনিক ভবনগুলোতে আনাগোনা করতেন। একেক স্থানে তিনি একেক রূপ ধারণ করতেন।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) প্রফেসর মো. নাজমুল হক আগামীর সময়কে বললেন, ‘বিকালে প্রতিমন্ত্রীর একটি ভুয়া ডিও লেটার নিয়ে বদলির তদবির করতে আসা এক ব্যক্তিকে আমরা আটক করেছি। আটক ব্যক্তি নিজেকে ৩৬তম বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন। এডি অ্যাডমিন এবং প্রশিক্ষণ পরিচালক তার জালিয়াতি নিশ্চিত হওয়ার পর তার ব্যাগ তল্লাশি করে বিভিন্ন সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ, শিক্ষাবোর্ডের কর্মকর্তা ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নামে তৈরি অসংখ্য জাল ডিও লেটার, বদলির আবেদন ও ভুয়া পরিচয়পত্র উদ্ধার করা হয়। জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ এই প্রতারককে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে শাহবাগ থানা পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছি।’
শাহবাগ থানা পুলিশ জানিয়েছে, আটক আসামির বিরুদ্ধে সরকারি নথি জালিয়াতি, ভুয়া পরিচয় প্রদান ও প্রতারণার অপরাধে মামলার প্রস্তুতি চলছে। এই চক্রের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত আছে কি-না তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত করা হচ্ছে।






