বাজেটে সুখবর
১ লাখ শিক্ষকের কান্না থামাতে ৩ হাজার কোটি
- প্রয়োজন ৯ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা
- সংকট কাটাতে বিশেষ বরাদ্দ চায় দুই বোর্ড

নিজের জমানো টাকা পাওয়ার আকুলতায় বছরের পর বছর কান্নায় কাটছে লাখো অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের। কেউ প্রাপ্য টাকা হাত ছোঁয়ার আগেই চলে যাচ্ছেন না ফেরার দেশে। কেউ টাকার অভাবে বিবাহযোগ্যা কন্যার বিয়ে দিতে পারছেন না। টাকার অভাবে চিকিৎসা নিতে পারছে না কেউ কেউ। শিক্ষকদের এই দুর্ভোগ লাঘবের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ৩ হাজার কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দের আশ্বাস মিলেছে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে।
সোমবার এ বিষয়ে বিস্তর আলোচনা হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট পর্যালোচনা সভায়। এতে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, শিক্ষকদের জমানো টাকার সংকট কাটাতে বিশেষ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে এবং অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দের আশ্বাসও মিলেছে। এর আগে ২১ এপ্রিল অর্থ বিভাগে অবসরে যাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ চেয়ে আধাসরকারি পত্র (ডিও লেটার) দেন শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দুই বোর্ডে ঝুলে থাকা ১ লাখ ৫ হাজার ৬৪৪টি আবেদন নিষ্পত্তিতে মোট ৯ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা প্রয়োজন। এর মধ্যে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অবসর সুবিধা বোর্ডে ৫৯ হাজার ৮২০টি আবেদনের বিপরীতে প্রয়োজন ৭ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত কল্যাণ ট্রাস্টে ৪৫ হাজার ৮২৪টি আবেদনের বিপরীতে প্রয়োজন ২ হাজার ৫৮১ কোটি টাকা।
ডিও লেটারে অর্থ বিভাগকে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, দুটি বোর্ডে আবেদন নিষ্পত্তির দীঘসূত্রতার কারণে মানবেতর জীবনযাপন করছেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। শারীরিক অসুস্থতা ও জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েও চিকিৎসা করাতে পারছে না তারা। মানবিক বিবেচনায় দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনা প্রয়োজন। এজন্য আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দুটি বোর্ডের অনুকূলে অর্থ বিভাগের সুপারিশকৃত ৩০০ কোটি টাকার পরিবর্তে অবসর সুবিধা বোর্ডের জন্য ২ হাজার কোটি এবং কল্যাণ ট্রাস্ট্রের অনুকূলে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন।
জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘গতকাল বাজেট আলোচনায় বিষয়টি উত্থাপন করা হলে গুরুত্বসহকারে আলোচনায় অংশ নেন শিক্ষামন্ত্রী। অর্থ বিভাগ থেকে এ খাতের জন্য বরাদ্দ পাওয়ার আশ্বাসের কথাও জানান তিনি।’
বোর্ডের কর্মকর্তারা এ সংকটের মোটাদাগে যে কয়টি কারণ চিহ্নিত করেছেন তারমধ্যে রয়েছে আয় ও ব্যয়ের বড় ব্যবধান। একজন শিক্ষক তার মূল বেতন থেকে প্রতি মাসে মোট ১০ শতাংশ (৬ শতাংশ অবসর ও ৪ শতাংশ কল্যাণ) কেটে রাখা এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা বাৎসরিক ১০০ টাকাসহ প্রতি মাসে জমা হয় ৭৬ কোটি টাকা। অথচ প্রতি মাসে আবেদন নিষ্পত্তিতে প্রয়োজন গড়ে ১২৫ কোটি টাকা। প্রতি মাসের এই বিশাল ব্যবধানই তৈরি করেছে হাজার কোটি টাকার ঘাটতি। এ ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকে আটকেপড়া টাকা তুলতে না পারায় বৃদ্ধি পেয়েছে সংকট। শুধু কল্যাণ ট্রাস্ট্রের ২২৯ কোটি টাকা আটকে আছে ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, উচ্চ আদালত থেকে ৬ মাসের মধ্যে অবসর সুবিধা পরিশোধের নির্দেশনা থাকলেও তহবিল সংকটের কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকার ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা বন্ড হিসাবে দিলেও তার মুনাফা দিয়েও উত্তরণ করা যায়নি এই মহাসংকট।
বোর্ড দুটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিক্ষকদের অবসরোত্তর কান্না থামাতে হলে বাজেটে স্থায়ী বরাদ্দ রাখতে হবে। অভ্যন্তরীণ ব্যয় বা পরিচালনা ব্যয়ের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা, ফাস্ট সিকিউরিটিসহ বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় আটকে থাকা অর্থ দ্রুত ছাড় করলেও সংকট কিছুটা কাটবে। বেসরকারি ব্যাংক থেকে তহবিল সরকারি ব্যাংকে স্থানান্তর করার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে।
শুধু কল্যাণ ট্রাস্টের নথি অনুযায়ী, এককালীন ৫০০ কোটি টাকা পেলে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পেন্ডিং আবেদন নিষ্পত্তি করা সম্ভব। একইভাবে ১ হাজার কোটি টাকা পেলে ২০২৪ সালের জুন এবং ২ হাজার ৫৮১ কোটি টাকা পুরোটা পেলে পুরোপুরি নিষ্পত্তি করা যাবে সব পেন্ডিং আবেদন।




