জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত রাখার কারণ সংসদে জানালেন অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। কিন্তু বাংলাদেশ সে পথে হাঁটেনি। কেন কঠিন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা, সে বিষয়ে আজ শুক্রবার সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে এ বিষয়ে বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বৈশ্বিক সংকট সত্ত্বেও জনগণের ওপর চাপ কমাতে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে জ্বালানির দাম।
অর্থমন্ত্রী বর্তমান সরকারের সাম্প্রতি কার্যক্রম তুলে ধরতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, সরকার দেশের অর্থনীতিকে একটি অগ্রসর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই রূপে গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একই সঙ্গে কাজ করছে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জন এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধসহ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষ্যে।
‘শক্তিশালী জনসমর্থন নিয়ে সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অর্থনীতি স্থিতিশীল করা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং সকল নাগরিকের জন্য সমতাভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে’, বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।
আমির খসরুর মতে, জনগণ আমাদের ওপর আস্থা রেখেছে। প্রতিদান হিসেবে বাংলাদেশকে একটি অগ্রসর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনীতিতে রূপান্তর করা আমাদের দায়িত্ব।
অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে এবং দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করে অর্থনৈতিক মুক্তির যাত্রা শুরু করে।
বিএনপির অন্যতম শীর্ষ এ নেতার মন্তব্য, আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়া পোশাকশিল্পের বিকাশ, বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান বিস্তৃত করা এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশের মাধ্যমে একটি দুর্বল অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করেছিলেন।
আমির খসরু ব্যাখ্যা করেন, ভ্যাট ব্যবস্থা প্রবর্তন, শুল্ক ও আমদানি কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগবান্ধব নীতির মাধ্যমে তিনি শক্তিশালী করেন অর্থনীতির ভিত।
এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বর্তমান সরকার স্বচ্ছতা, সততা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও তিনি জানান।
বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন, সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে একটি দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামো পেয়েছে। সেখানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক খাতে চাপ, বিনিয়োগের ধীরগতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে।
‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও নিয়ন্ত্রণমুক্তির মাধ্যমে উন্নয়নের সুফল প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই সরকারের মূল লক্ষ্য’, বলেছেন বিএনপির প্রবীণ এ নেতা।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অংশ হিসেবে সরকার ৫০ লাখ ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু করেছে এবং ধাপে ধাপে সব পরিবারকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রকৃত কৃষক, জেলে ও প্রাণিসম্পদ খামারিদের জন্য কৃষক কার্ড চালু করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে এবং গ্রামীণ উৎপাদকদের উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধিতে দেওয়া হচ্ছে সহায়তা।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে আইসিটি খাতের সম্প্রসারণ, যোগাযোগ অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, ব্লু ইকোনমি, ইকো-ট্যুরিজম ও আঞ্চলিক সৃজনশীল হাব গড়ে তুলে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান আমির খসরু।
মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছেন, ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড চালুর মাধ্যমে নেওয়া হচ্ছে রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ।
রাজস্ব খাতে স্বচ্ছতা ও অটোমেশন নিশ্চিত করে নেওয়া হয়েছে কর আদায় বাড়ানো এবং ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ। ২০৩৪ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ব্যাংকিং খাতে সংস্কার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং পুঁজিবাজার উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির এ সদস্য।
অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, এসএমই খাত শক্তিশালী করা, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন এবং সহজ ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেছেন, এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
‘আন্তর্জাতিক তেল ও এলএনজি মূল্য দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় চলতি অর্থবছরের মার্চ-জুন সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা বাজেটে চাপ সৃষ্টি করবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর প্রভাব ফেলবে’, জানান আমির খসরু।
‘এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি সাশ্রয়, অফিস সময় কমানো, বিদ্যুৎ ব্যবহার সীমিত করা, বিকল্প জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করা এবং মার্কেট আগে বন্ধ করার মত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’
বিএনপির অন্যতম শীর্ষ এ নেতা জোর দিয়ে বলেছেন, বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত সহায়তা চাওয়া হচ্ছে। আমদানি-নির্ভর অর্থনীতি হওয়ায় বাংলাদেশ বৈশ্বিক পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না, তবে বিচক্ষণ নীতি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা হবে।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
আমির খসরু আশা প্রকাশ করেন, জনগণ অতীতের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে সমর্থন দেবে। সরকার সুশাসন নিশ্চিত, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

