পিজিসিবিতে ডিজিটাল অনিয়ম : সফটওয়্যার থেকে ২৬০ ভাউচার গায়েব
- নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ভাউচার মুছে ফেলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য নেই
- আলোচ্য বছরে প্রতিষ্ঠানটি লোকসান করেছে ২১০ কোটি টাকা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালনকারী সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) প্রধান হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার থেকে ২৬০টি ভাউচার স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা হয়েছে। ডিজিটাল পদ্ধতির অপব্যবহার করে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ নিচ্ছে একটি চক্র। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বৃহৎ এই সরকারি প্রতিষ্ঠানের এমন অনিয়মের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা।
অ্যাকাউন্টস সফটওয়্যার থেকে ভাউচার মুছে ফেলার ঘটনায় পিজিসিবি কর্তৃপক্ষ এবং অডিট কর্মকর্তার বক্তব্যে ফুটে উঠেছে চরম বৈপরীত্য।
পিজিসিবির নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) মো. মনিরুজ্জামান সরাসরি দাবি করেছেন, তাদের ব্যবহার করা ‘বস’ সফটওয়্যার থেকে কোনো তথ্যই ডিলিট হয় না। অথচ অডিট ফার্ম একনাবিনের পরিচালক মাহমুদুর রহমান স্বীকার করেছেন, অডিটের সময় ভাউচার ডিলিট করার মতো নিয়ন্ত্রণগত দুর্বলতা তাদের নজরে এসেছে এবং সে বিষয়ে তারা ‘লেটার টু ম্যানেজমেন্ট’-এর মাধ্যমে কোম্পানি কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিতও করেছেন। একই ঘটনা নিয়ে কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তার সরাসরি অস্বীকৃতি আর অডিটরদের নথিপত্রে তা চিহ্নিত করার এই বিপরীতমুখী অবস্থান পুরো হিসাব প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সুশাসনকে দাঁড় করিয়েছে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে।
তবে পিজিসিবির চূড়ান্ত নিরীক্ষিত বার্ষিক আর্থিক বিবরণীতে অডিটর এই বিপুলসংখ্যক ভাউচার ডিলিট বা এর আইটি অডিট ট্রেইলের দুর্বলতা নিয়ে সরাসরি কোনো পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করেননি। যদিও আন্তর্জাতিক হিসাবরক্ষণ মান (আইএএস) ৩১৫ ধারা অনুযায়ী আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আইটি নিরীক্ষার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক। ফলে সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সামনে প্রকাশ করা মূল রিপোর্টে নীরব থেকে শুধু অভ্যন্তরীণ ‘লেটার টু ম্যানেজমেন্ট’-এর আড়ালে বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য ও সংগৃহীত সুনির্দিষ্ট উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বিভিন্ন তারিখে পিজিসিবির নিয়মিত ব্যবহৃত ‘বস’ অ্যাকাউন্টস সফটওয়্যার থেকে ২৬০টি ভাউচার ডিলিট করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯৮টি ছিল ডুপ্লিকেট। সংগৃহীত উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই এক দিনেই সর্বোচ্চ ৮৩টি ভাউচার ডিলিট করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি ৭৪টি এবং ১৩ এপ্রিল এক দিনে আরও ৭৩টি ভাউচার মুছে ফেলা হয়। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই দুটি, ১১ আগস্ট তিনটি, ১৩ আগস্ট একটি, ১৭ নভেম্বর তিনটি, ১৮ নভেম্বর দুটি এবং ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি তিনটি, ২১ জানুয়ারি পাঁচটি, ৮ এপ্রিল পাঁচটি, ১৫ এপ্রিল তিনটি ও ২১ এপ্রিল তিনটি ভাউচার মুছে ফেলা হয়।
হিসাববিজ্ঞানের মৌলিক নিয়মানুযায়ী সফটওয়্যার থেকে ভাউচার মুছে ফেলা আর্থিক অনিয়ম ও খরচ আড়াল করার প্রাথমিক আলামত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পিজিসিবির মোট রাজস্ব বা লেনদেন ছিল প্রায় ৩০৯৯ কোটি টাকা এবং প্রতিষ্ঠানটি করের পর প্রায় ২১০ কোটি টাকা নিট লোকসানের মধ্যে রয়েছে, যেখানে প্রতি শেয়ারে লোকসান (ইপিএস) ছিল ২ দশমিক ৩০ টাকা। আগের অর্থবছরে ৬ হাজার ১০৯ কোটি টাকা লোকসানের তুলনায় ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমলেও, হাজার কোটি টাকার লেনদেন ও লোকসানে থাকা এমন সংস্থায় হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার থেকে ভাউচার মুছে ফেলার ঘটনা পুরো হিসাবব্যবস্থার স্বচ্ছতাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে।
পিজিসিবির অডিট পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, সংস্থাটির ২০২১-২২ অর্থবছরে নিরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে মাবস অ্যান্ড জে পার্টনার্স ও এমজে আবেদীন অ্যান্ড কোম্পানি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে অডিটর ছিল হুদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি এবং এমজে আবেদীন অ্যান্ড কোম্পানি। পরে ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যৌথ নিরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে হুদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি এবং একনাবিন।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, টানা দুই অর্থবছরের প্রতিবেদনে আইটি অডিট মন্তব্য হুবহু একই রাখা হয়েছিল এবং পরবর্তী বছরগুলোতে মূল প্রতিবেদনে আইটি অডিটের বিষয়ে নীরবতা পালন করা হয়েছে। এ বিষয়ে এমজে আবেদীন অ্যান্ড কোম্পানির পার্টনার কামরুল আবেদীন জানিয়েছেন, আইটি অডিটে নিরীক্ষক যদি একই ধরনের পরিবেশ পান, তবে মন্তব্য মিলে যাওয়া স্বাভাবিক।
তবে নিরীক্ষকের এই মন্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা ও কম্পিউটার নেটওয়ার্ক প্রকৌশলী সৈয়দ জাহিদ হোসেন বলেছেন, ‘আইটি অডিট কোনো স্থির বিষয় নয়; প্রতি বছর সিস্টেম, কনফিগারেশন ও ঝুঁকি বদলে যাওয়ার পরও পরপর দুই অর্থবছরের অডিট মন্তব্য হুবহু এক থাকা প্রমাণ করে স্বাধীন পরীক্ষা ছাড়াই আগের বছরের প্রতিবেদন কপি পেস্ট করা হয়েছে, যা নিরীক্ষকের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বর্তমানের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর হিসাবব্যবস্থায় অডিট রিপোর্টে আইটি অডিট নিয়ে শব্দও না থাকা বড় ঘাটতি; আর সিস্টেমে বিপরীত এন্ট্রি বা অডিট ট্রেইল না রেখে সরাসরি ভাউচার ডিলিট করা কোম্পানি আইন ও করবিধির মারাত্মক লঙ্ঘন, যা প্রকৃত চিত্র আড়ালের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকলে হিসাব জালিয়াতি এবং ফৌজদারি অপরাধের শামিল। জাতীয় গ্রিড পরিচালনাকারী ও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পিজিসিবির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সাইবার নিরাপত্তা এবং সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ অডিটের আওতায় না আনা সুশাসনের চরম ব্যর্থতা ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির সংকেত।’
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি দেশের প্রধান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত একটি অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, যার বর্তমান শেয়ারদর ৩৮ টাকার কাছাকাছি এবং পরিশোধিত মূলধন প্রায় ৯ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। দেশের হাজার হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারীর পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মিউচুয়াল ফান্ডের বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা রয়েছে এই কোম্পানিতে। কিন্তু হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার থেকে ভাউচার গায়েব হওয়া, অডিটরদের পক্ষ থেকে ম্যানেজমেন্টকে চিঠির মাধ্যমে জানানোর পরও তা বার্ষিক রিপোর্টে আড়াল করা এবং এক্সেলনির্ভর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অডিট চালানোর কারণে প্রকৃত আর্থিক চিত্র ঢাকা পড়ছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্তিকর বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এই কোম্পানির এমন আর্থিক অনিয়ম ও সফটওয়্যার থেকে ভাউচার গায়েব হওয়ার বিষয়টি নিয়ে কথা হলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বললেন, ‘আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’



