জাতীয় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবস আজ
জন্মনিবন্ধনে গ্রামের চেয়ে পিছিয়ে মেগা সিটি ঢাকা!
- বিবিএস ও ওআরজির যৌথ উদ্যোগে ‘বাংলাদেশে নাগরিক নিবন্ধনে বৈষম্য মূল্যায়ন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চিত্র

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মেগা সিটি ঢাকা। রাজধানী হিসেবে দেশের অন্য এলাকার তুলনায় যেখানে সুযোগ-সুবিধা মেলে বেশি। আছে মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ছোট-বড় ফ্লাইওভার, চোখধাঁধানো শপিং মল, দেশসেরা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ও। কিন্তু দুরন্তগতিতে ছুটে চলা এ শহর পিছিয়ে পড়েছে জন্মনিবন্ধনে। সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, গ্রামের তুলনায় জন্মনিবন্ধনে পিছিয়ে ঢাকা। বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্মনিবন্ধনের গড়হার ৪৪ শতাংশ। ঢাকা বিভাগে যা মাত্র ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ অবকাঠামোগত সুবিধা বেশি থাকার পরও ঢাকার বিশালসংখ্যক শিশু নাগরিক পরিচয়পত্রের অধিকার থেকে এখনো বঞ্চিত।
জাতিসংঘের এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন (ইএসসিএপি), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের (ওআরজি) যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে নাগরিক নিবন্ধনে বৈষম্য মূল্যায়ন’ শীর্ষক জাতীয় মূল্যায়ন রিপোর্ট ২০২৬-এ উঠে এসেছে এ চিত্র।
যদিও জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে ৮০ শতাংশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ জন্মনিবন্ধনের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র উদ্বেগজনক। এমন বাস্তবতায় আজ মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে জাতীয় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবস।
জাতীয় মূল্যায়ন প্রতিবেদনে স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসভিআরএস) ২০২২-এর উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জাতীয়ভাবে যেখানে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্মনিবন্ধনের গড়হার ৪৪, সেখানে গ্রামীণ এলাকায় এই হার ৪৬ এবং শহরাঞ্চলে তা নেমে এসেছে মাত্র ৩৬ শতাংশে। বিভাগভিত্তিক চিত্রে দেখা যায়, দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ চিত্র ঢাকার, যেখানে জন্মনিবন্ধনের হার মাত্র ৩৪ শতাংশ। অথচ সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে এই হার ৫৩ শতাংশ।
পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতে। ২০২৪ সালের সরকারি প্রশাসনিক উপাত্ত অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্মনিবন্ধনের সার্বিক হার ৬০ হলেও সিটি করপোরেশন এলাকায় তা মাত্র ৭ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, আইনগত নির্ধারিত ৪৫ দিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন এলাকার হার মাত্র ১ দশমিক ৩, যেখানে জাতীয় গড় ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে জাতীয়ভাবে জন্মনিবন্ধনের প্রায় ৮০ শতাংশই ঘটে থাকে শিশুর বয়স ১ বছর পার হওয়ার পর।
ঢাকায় কম কেন?: সাধারণত শহর এগিয়ে থাকার কথা থাকলেও ঢাকায় জন্মনিবন্ধন কম হওয়ার পেছনে গবেষকরা কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। তারা বলছেন, ঢাকায় বসবাসকারী অধিকাংশ পরিবার সন্তান জন্মানোর পর প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে বা ভবিষ্যৎ জমিজমা ও স্থাবর সম্পত্তির সুবিধার কথা ভেবে স্থায়ী গ্রামে গিয়ে জন্মনিবন্ধন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ফলে শিশুটি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করলেও নগর কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক রেকর্ডে তা স্থান পায় না।
দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবার কল্যাণ সহকারী ও গ্রাম পুলিশের সমন্বয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহের একটি সক্রিয় ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু ঢাকা শহরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের তৃণমূল স্বাস্থ্যকর্মী বা সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা অনুপস্থিত।
তৃতীয়ত, ঢাকায় বস্তিবাসী, ভাসমান জনগোষ্ঠী এবং সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ অভিবাসীর সংখ্যা অনেক বেশি। উপাত্ত অনুযায়ী, স্থায়ী বাসিন্দাদের ৫৭ শতাংশের তুলনায় গত পাঁচ বছরের মধ্যে স্থানান্তরিত অভিবাসী পরিবারের শিশুদের জন্মনিবন্ধনের হার ৫০ শতাংশ— উল্লেখযোগ্যভাবে কম। কাগজপত্র জোগাড়ের জটিলতা ও সচেতনতার অভাবে তারা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. খয়বর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, ‘আগে অস্থায়ীভাবে ঢাকায় বা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বসবাসকারী অভিভাবকরা নিজ এলাকার বদলে ঢাকা থেকেই সন্তানদের জন্মসনদ সংগ্রহ করতেন। ফলে সিটি করপোরেশনগুলোকে অতিরিক্তসংখ্যক নিবন্ধনের দায়িত্ব সামলাতে হতো। নতুন আইনি বিধিমালার আওতায় শিশু যে স্থানে জন্মগ্রহণ করবে, সে এলাকার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষই শুধু জন্মসনদ প্রদান করতে পারবে।’
খয়বর রহমানের দাবি, এই নতুন ব্যবস্থার ফলে ঢাকা দক্ষিণ সিটিসহ বিভিন্ন নগর কর্তৃপক্ষের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমে এসেছে।
গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘প্রজ্ঞা’ জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন নিয়ে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের আগামীর সময়কে বলেছেন, ঢাকা শহরের মতো শহরাঞ্চলে ভুলত্রুটি এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষ নিবন্ধন করতে গিয়ে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বর্তমানে দেশে জন্মনিবন্ধনের হার ৫০ এবং মৃত্যুনিবন্ধনের হার ৪৭ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড় ও পাশের দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে। এ পরিস্থিতি উত্তরণে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন সংশোধনের দাবি জানানো হয়েছে। যেহেতু দেশে প্রায় ৬৭-৭০ শতাংশ শিশুর জন্ম হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হয়, তাই এই নিয়ম চালু হলে জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই বিপুলসংখ্যক শিশুর স্বয়ংক্রিয় নিবন্ধন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সময় মেনে নিবন্ধন মাত্র ৯ শতাংশ: বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন ব্যবস্থার উন্নয়নে গত এক দশকে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলেও সময়মতো নিবন্ধন ও সেবা প্রদানে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের নাগরিক নিবন্ধন ও জীবন পরিসংখ্যান ব্যবস্থার মূল্যায়ন, বিশ্লেষণ ও পুনর্নকশা’ শীর্ষক নীতিসংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বে তৈরি করা হয়েছে এবং দেশের জন্ম, মৃত্যু ও গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক তথ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা বিশ্লেষণ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে দেশে জন্মনিবন্ধনের পূর্ণতা ছিল মাত্র ১০ এবং মৃত্যুনিবন্ধন ৯ শতাংশ। ২০২৫ সালে এ হার বেড়ে যথাক্রমে ৬৩ ও ৫৯ শতাংশে পৌঁছেছে।
তবে নিবন্ধনের সময়ানুবর্তিতা এখনো খবই দুর্বল। আইন অনুযায়ী ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন করার কথা থাকলেও মাত্র ৯ শতাংশ জন্ম ওই সময়সীমার মধ্যে নিবন্ধিত হয়। প্রায় ৮০ শতাংশ নিবন্ধন এক বছর পর সম্পন্ন হয়। এই বিলম্বের জন্য পরিবারকে বারবার কার্যালয়ে যেতে হয়, অতিরিক্ত কাগজপত্র দিতে হয় এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে নিবন্ধন কাঠামোর দুর্বল সমন্বয়ের কারণে নাগরিকের ওপর চাপ পড়ে।
মৃত্যুনিবন্ধনে লিঙ্গবৈষম্যও প্রকট। নিবন্ধিত মৃত্যুর ৬৪ শতাংশ পুরুষ এবং মাত্র ৩৬ শতাংশ নারী। প্রতিবেদনটি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের অনুমোদিত তথ্যদাতা করার সুপারিশ করেছে। নবজাতকের ছাড়পত্রের আগে জন্মসনদ এবং মৃতদেহ হস্তান্তরের সময় মৃত্যুসনদ দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘প্রজ্ঞা’র নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের বললেন, বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে বিদ্যমান আইনের সংস্কার ও সঠিক বাস্তবায়ন ছাড়া এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই দ্রুত আইন সংশোধন এবং প্রশাসনিক হয়রানি কমানোর ওপর জোর দিতে হবে।



