গাড়ির চাকা ঘুরতেই বদলে গেল জাপানের অর্থনীতি

সংগৃহীত ছবি
একসময় জাপানের রাস্তায় গাড়ি ছিল বিরল দৃশ্য। বিদেশ থেকে আমদানি হতো গাড়ি, আর যুক্তরাষ্ট্রের বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করত দেশটির বাজার। সেই জাপানই একদিন ব্যক্তিগত গাড়ি উৎপাদনে চমকে দেয় বিশ্বকে। ছোট ও জ্বালানিসাশ্রয়ী গাড়ি তৈরি, উৎপাদনে নিখুঁত ব্যবস্থাপনা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা মাথায় রেখে গাড়ি নির্মাণ— এমন কয়েকটি কৌশল জাপানের গাড়িশিল্পকে নিয়ে যায় নতুন উচ্চতায়।
টয়োটা মোটর করপোরেশন, নিসান মোটর ও হোন্ডা মোটরের মতো প্রতিষ্ঠান বিশ্ব জুড়ে পরিচিত আজ। কিন্তু এই সাফল্য এক দিনে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে শত বছরের উদ্ভাবন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের সংগ্রাম, সরকারি নীতিসহায়তা, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি সহজলভ্য করার দীর্ঘ ইতিহাস।
শুরু যেভাবে: বিদেশি গাড়ি থেকে নিজস্ব উৎপাদন
জাপানে প্রথম গাড়ি আসে ১৮৯৮ সালে। ফ্রান্স থেকে আমদানি করা একটি গাড়ি টোকিওর সুকিজি থেকে উয়েনো পর্যন্ত চলেছিল বলে উল্লেখ রয়েছে ইতিহাসে। গাড়ির এই নতুন প্রযুক্তি জাপানি প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তাদের আগ্রহী করে তোলে। তারা নিজস্ব প্রযুক্তিতে শুরু করেন গাড়ি তৈরির চেষ্টা।
১৯০৪ সালে উদ্যোগ নেওয়া হয় বাষ্পচালিত গাড়ি তৈরির। ১৯০৭ সালে জাপানে তৈরি ‘টাকরি’ নামের গাড়ির আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরে ১৯১৪ সালে তৈরি হয় ‘ড্যাট’ গাড়ি, যা পরবর্তী সময়ে জাপানের গাড়িশিল্পের বিকাশে রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তবে তখনকার জাপানে নিজস্ব গাড়ি উৎপাদন ছিল সীমিত। আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রকৌশলগত দক্ষতা এবং ব্যাপক উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল না পর্যাপ্ত। ফলে বাজারের বড় অংশ দখল করে নেয় বিদেশি গাড়ি।
১৯২০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্ড ও জেনারেল মোটরস কারখানা স্থাপন করে জাপানে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, স্থানীয় গাড়ি নির্মাতারা পিছিয়ে পড়েন প্রতিযোগিতায়। ১৯৩২ সালে জাপানের বাজারে সরবরাহ করা মোট গাড়ির মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল দেশীয়ভাবে তৈরি। এ পরিস্থিতিই জাপানকে নিজস্ব গাড়িশিল্প গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করায়।
টয়োটার যাত্রা: তাঁতকল থেকে গাড়ি নির্মাণ
জাপানের গাড়িশিল্পের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম কিইচিরো তোয়োদা। তার বাবা সাকিচি তোয়োদা স্বয়ংক্রিয় তাঁতযন্ত্র উদ্ভাবন ও উৎপাদনের মাধ্যমে শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন। সেই শিল্পপ্রযুক্তির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কিইচিরো আগ্রহী হয়ে ওঠেন গাড়ি নির্মাণে। ১৯৩০-এর দশকে তোয়োদা পরিবার গাড়ি উৎপাদনের জন্য গবেষণা ও পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করে। ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় তোয়োদা অটোমেটিক লুম ওয়ার্কসের অধীনে গাড়ি নির্মাণ বিভাগ। পরে ১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় টয়োটা মোটর কোম্পানি। প্রথম দিকে টয়োটার লক্ষ্য ছিল বিদেশি নির্মাতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মতো নিজস্ব গাড়ি তৈরি। এর জন্য প্রয়োজন ছিল ইঞ্জিন নির্মাণ, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, নকশা প্রণয়ন এবং একসঙ্গে অনেক গাড়ি তৈরির সক্ষমতা অর্জন। ১৯৩৮ সালে টয়োটার কোরোমো কারখানায় শুরু হয় উৎপাদন। তবে সে সময় জাপানের গাড়িশিল্পের বড় অংশ জুড়ে ছিল ট্রাক ও সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত যানবাহন। সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ির বাজার বিকশিত হয়নি তখনো।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানো
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর জাপানের শিল্প ও অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়ে। গাড়ি উৎপাদনের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কাঁচামালের সংকট দেখা দেয় এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। তবু দেশটির নীতিনির্ধারক ও শিল্পোদ্যোক্তারা গাড়িশিল্পকে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করেন।
যুদ্ধের পর প্রথমদিকে ট্রাক ও বাস উৎপাদনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ, শিল্পকারখানা আবার চালু, পণ্য পরিবহন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচলের জন্য এসব যানবাহন ছিল জরুরি। ১৯৪৯ সালে জাপানে ব্যক্তিগত গাড়ি উৎপাদনের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়। এরপর টয়োটা, নিসানসহ দেশীয় নির্মাতারা যাত্রীবাহী গাড়ি উৎপাদনে নতুন করে মনোযোগ দেন। ১৯৫০-এর দশকে জাপানের গাড়িশিল্পের সামনে বড় প্রশ্ন ছিল— দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে ভালো মানের ব্যক্তিগত গাড়ি তৈরি করা সম্ভব কি না। জাপানি নির্মাতারা উৎপাদনব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রযুক্তি অর্জন এবং ধীরে ধীরে দেশীয় যন্ত্রাংশের ব্যবহার বাড়িয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। ১৯৫৫ সালে টয়োটা বাজারে আনে ‘টয়োপেট ক্রাউন’। জাপানে নিজস্ব প্রযুক্তিতে পূর্ণাঙ্গ যাত্রীবাহী গাড়ি তৈরির পথে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
ব্যক্তিগত গাড়িতে বিপ্লব: সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে গাড়ি
জাপানের গাড়িশিল্পের প্রকৃত বিপ্লব ঘটে ১৯৬০-এর দশকে। এ সময় দেশটির অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছিল। মানুষের আয় বাড়ছিল, শহর ও শিল্পাঞ্চল বিস্তৃত হচ্ছিল এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির আকার বড় হচ্ছিল। আগে টেলিভিশন, ফ্রিজ ও ওয়াশিং মেশিনকে আধুনিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে দেখা হতো। ষাটের দশকে গাড়ি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও রঙিন টেলিভিশন মানুষের নতুন আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়। জাপানি গাড়ি নির্মাতারা বুঝতে পারেন, ব্যক্তিগত গাড়ির বাজার বড় করতে হলে শুধু ধনীদের জন্য বিলাসবহুল গাড়ি তৈরি করলে চলবে না। বরং এমন গাড়ি তৈরি করতে হবে, যা মধ্যবিত্ত পরিবারও কিনতে পারবে।
টয়োটার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৫ সালে জাপানে ব্যক্তিগত যাত্রীবাহী গাড়ি বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ লাখ ৯০ হাজার। ১৯৭০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৩ লাখ ৭০ হাজারে। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরে বিক্রি চার গুণেরও বেশি হয়। একই সময়ে জাপানে গাড়ি উৎপাদন দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯৬৭ সালে দেশটি পশ্চিম জার্মানিকে ছাড়িয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গাড়ি উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়।
টয়োটা উৎপাদনব্যবস্থা: কম অপচয়ে বেশি উৎপাদন
জাপানের গাড়িবিপ্লবের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন। এক্ষেত্রে টয়োটা একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, যা বিশ্ব জুড়ে ‘টয়োটা প্রোডাকশন সিস্টেম’ নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থার মূল কথা হলো— অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন ও অপচয় কমানো, প্রয়োজন অনুযায়ী যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে গুণগত মান নিশ্চিত। ব্যবস্থাটির দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রয়েছে। প্রথমত, জাস্ট ইন টাইম। অর্থাৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ প্রয়োজনের সময়েই সরবরাহ করা হবে। এতে কারখানায় অতিরিক্ত মজুদ রাখার প্রয়োজন কমে এবং অর্থ আটকে থাকার ঝুঁকিও হ্রাস পায়। দ্বিতীয়ত, জিদোকা। উৎপাদনের সময় কোনো ত্রুটি দেখা দিলে তা শনাক্ত করে কাজ থামানো এবং সমস্যার সমাধান করা। এর ফলে ত্রুটিপূর্ণ পণ্য উৎপাদনের ধারায় এগিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।
জ্বালানি সংকট যেভাবে এগিয়ে দেয় জাপানের গাড়িকে
১৯৭৩ সালের তেল সংকট বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেয়। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বড় ইঞ্জিনের বেশি জ্বালানি খরচের গাড়ি ব্যবহার ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে জাপানের ছোট ও জ্বালানিসাশ্রয়ী গাড়ি নতুন গুরুত্ব পায়। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের ক্রেতারা এমন গাড়ির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন, যেগুলো তুলনামূলক কম জ্বালানিতে চলতে পারে। জাপানি কোম্পানিগুলো এই চাহিদাকে কাজে লাগায়। তারা ইঞ্জিনের দক্ষতা, গাড়ির ওজন, বায়ুগতিবিদ্যা এবং উৎপাদনমান উন্নত করার দিকে মনোযোগ দেয়। ফলে জাপানের গাড়ি শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেই জনপ্রিয় হয়নি, আন্তর্জাতিক বাজারেও শক্ত অবস্থান তৈরি করে।
শুধু টয়োটা নয়, অন্য কোম্পানিগুলোও বদলে দেয় বাজার
জাপানের গাড়িবিপ্লব কোনো একটি কোম্পানির একক সাফল্য ছিল না। টয়োটা: নির্ভরযোগ্যতা, উৎপাদনশীলতা এবং বিভিন্ন শ্রেণির ক্রেতার জন্য গাড়ি তৈরিতে শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তোলে। নিসান: নিজস্ব গাড়ি উৎপাদন ও বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে জাপানের শিল্পায়নে ভূমিকা রাখে। তাদের ড্যাটসান ব্র্যান্ডের ছোট গাড়ি বিদেশেও পরিচিতি পায়। হোন্ডা: মোটরসাইকেল উৎপাদনে সাফল্যের পর চার চাকার গাড়ির বাজারে প্রবেশ করে। ১৯৬৩ সালে এস৫০০ নামের স্পোর্টস কার এবং টি৩৬০ হালকা ট্রাক বাজারে আনে। পরবর্তী সময়ে ছোট ও জ্বালানিসাশ্রয়ী গাড়ির বাজারেও শক্ত অবস্থান তৈরি করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা প্রযুক্তির উন্নয়ন, উৎপাদন দক্ষতা এবং ক্রেতার চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে যন্ত্রাংশ নির্মাতা, প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান ও সরবরাহকারী কোম্পানির বিস্তৃত শিল্পব্যবস্থাও গড়ে ওঠে।
সরকারের ভূমিকা: শিল্পনীতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা
জাপানের গাড়িশিল্পের বিকাশে সরকারের নীতিগত ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা, শিল্পের মান নির্ধারণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং উৎপাদন অবকাঠামো সম্প্রসারণে বিভিন্ন সময়ে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৩০-এর দশকে দেশীয় গাড়ি উৎপাদনে উৎসাহ দিতে সরকার উদ্যোগ নেয়। পরবর্তী সময়ে শিল্পের সম্প্রসারণের সঙ্গে সড়ক অবকাঠামোরও উন্নয়ন ঘটে। ১৯৫৪ সালে শুরু হওয়া সড়ক উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো পরবর্তী সময়ে জাপানের সড়কব্যবস্থা সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখে। ১৯৬০-এর দশকে মহাসড়ক নির্মাণের ফলে বড় শহর ও শিল্পাঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ সহজ হয়। এতে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার এবং পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়ে।
জাপানের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা কী?
বাংলাদেশেও গাড়ি সংযোজন, যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং পরিবহনশিল্পে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু জাপানের অভিজ্ঞতা দেখায়, গাড়িশিল্প গড়ে তুলতে শুধু বিদেশ থেকে গাড়ি এনে বিক্রি বা যন্ত্রাংশ জোড়া লাগানোর কারখানা স্থাপন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তি হস্তান্তর, যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা।
বাংলাদেশ যদি জাপানের সঙ্গে শিল্প ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাকে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে গাড়ি আমদানির বাজার থেকে ধাপে ধাপে নিজস্ব উৎপাদন ও যন্ত্রাংশশিল্প গড়ে তোলার পথে এগোনোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন এ খাতের সংশ্লিষ্টরা।



