ঈদুল আজহা বৃহস্পতিবার
দেরি, ভাড়া আর যানজটের চাপ

যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে আগামী বৃহস্পতিবার দেশে উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদুল আজহা। ঈদ উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আলাদা বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ঈদের আনন্দ প্রিয়জনের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে এরই মধ্যে ঢাকা ছাড়ছেন মানুষ। এ যাওয়া যেন স্রোতের মতো। রাজধানীর প্রধান বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনে যাত্রীর চাপ যেন ঢলে পরিণত হয়েছে। যদিও বৃষ্টির কারণে যাত্রীর চাপ ঈদ অনুযায়ী কম ছিল লঞ্চ টার্মিনালে। এ ছাড়া বিলম্বের কারণে ভোগান্তি হয়েছে ট্রেনযাত্রায়।
সকাল থেকে ঢাকার প্রবেশমুখগুলোয় মানুষের ঢল লক্ষ করা যায়। বিকালের পর আরও বাড়ে এই চাপ। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মহাসড়কগুলোয়ই বাড়তে থাকে গাড়ির সংখ্যা। কোথাও কোথাও তৈরি হয় লম্বা যানজট। এতে মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কমে আসে গাড়ির গতি। মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ও টার্মিনালগুলোয় নিরাপত্তা জোরদারে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ।
তবে এবার নতুন ছিল আন্তঃনগর ট্রেনে নারীদের জন্য বিশেষ কোচ। ঢাকা-সিলেট-ঢাকা রুটে চলাচলকারী জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে ননস্টপ চলাচলকারী সোনার বাংলা এক্সপ্রেসে নারী যাত্রীদের জন্য বিশেষ কোচ চালু করা হয়। গতকাল সোমবার থেকে আগামীকাল বুধবার পর্যন্ত চালু থাকবে এই সেবা।
দেরিতে ছাড়ল উত্তরের ট্রেনগুলো: ট্রেনে ঈদযাত্রার তৃতীয় দিনে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে ঘরমুখো মানুষের। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে সকাল থেকেই স্টেশনে জড়ো হন হাজারো মানুষ। যদিও ঈদযাত্রার এই চিরচেনা ব্যস্ততার মধ্যেই বাদ সেধেছে ট্রেনের সূচি বিপর্যয়। বিশেষ করে, উত্তরাঞ্চল ও রাজশাহীগামী ট্রেনের যাত্রীদের পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি।
স্টেশন ব্যবস্থাপকের দপ্তর থেকে জানানো হয়, গতকাল ঢাকা থেকে ৪৪টি আন্তঃনগর এবং ২৩টি মেইল, কমিউটারসহ ৬৭টি ট্রেন দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। সকাল থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ২৪টি ট্রেন স্টেশন ছেড়ে গেছে। বেশ কিছু ট্রেনের বিলম্বের কারণে অন্যগুলোর সঠিক সময় ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। নীলসাগর এক্সপ্রেস সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও সেটি ছেড়েছে ৮টা ৫ মিনিটে। ৭টা ৪৫ মিনিটের মহানগর প্রভাতী ছেড়েছে ৮টা ১৫ মিনিটে। রংপুর এক্সপ্রেস স্টেশন ছাড়ে নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই ঘণ্টা পর। আড়াইটার সিল্কসিটি এক ঘণ্টা দেরিতে ছাড়ে বেলা সাড়ে ৩টায়।
ট্রেনের এই বিলম্বের কারণে প্ল্যাটফর্মেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে সময় পার করতে হচ্ছে যাত্রীদের। তীব্র গরম এবং উপচেপড়া ভিড়ে বিশেষ করে, নারী ও শিশুরা চরম অস্বস্তিতে। ট্রেনে আসন না পেয়ে অনেক যাত্রীকে দাঁড়িয়ে থাকতেও দেখা যায়। রংপুর এক্সপ্রেসের যাত্রী কামাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বসে আছি, ট্রেনের দেখা নেই। এই তীব্র গরমে স্টেশনে এতক্ষণ বসে থাকা যে কতটা অস্বস্তিকর, তা বলে বোঝানো যাবে না। তার ওপর আবার অনেকে সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।’
ভোগান্তির এখানেই শেষ নয়, দুপুরের দিকে হঠাৎ নামা বৃষ্টিতে স্টেশনে আসা যাত্রীদের বেশ বিপাকে পড়তে হয়। তবে এই ভোগান্তির মধ্যেও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এবার কোনো যাত্রীকে ট্রেনের ছাদে চড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভ্রমণ করতে দিচ্ছে না। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্টেশনে কড়া নজরদারি। সব মিলিয়ে সূচি বিপর্যয়, গরম আর বৃষ্টিতে ঈদযাত্রা কিছুটা মলিন হলেও, দিনশেষে নিরাপদে বাড়ি ফিরে পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে পারবেন— এ আনন্দেই সব কষ্ট ভুলে হাসিমুখে অপেক্ষা করছেন ঘরমুখো মানুষ।
বাসে ‘বকশিশের’ নামে বাড়তি ভাড়া: রাজধানীর গাবতলী, গুলিস্তান, মহাখালী, সায়েদাবাদের মতো বড় বাস টার্মিনালগুলোয় যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। এই ভিড়ের সুযোগে বকশিশের নামে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
গাবতলী টার্মিনালে নওগাঁগামী যাত্রী রাকিবুল ইসলাম অভিযোগ করেন, বাসের নির্ধারিত ভাড়া ৭৫০ টাকা হলেও, তার কাছ থেকে ৮৫০ টাকা নেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে কাউন্টার মাস্টার তাকে বলেছেন, ‘আমি জোর করে টাকা নিইনি। বলেছি, খুশি হয়ে যা দেন।’ পরে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নিয়মিত অভিযানে বিষয়টি সামনে এলে ওই কাউন্টারকে অতিরিক্ত টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়— যোগ করেন রাকিবুল।
বৃষ্টিতে সদরঘাটে যাত্রী কম: বৈরী আবহাওয়ার কারণে ঢাকার প্রধান নদীবন্দর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে শেষ বিকাল পর্যন্ত যাত্রীর চাপ কম ছিল। যদিও নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল কড়াকড়ি। লঞ্চ মালিকদের আশা ছিল, সন্ধ্যার পর আকাশ ভালো হলে যাত্রীর চাপ বাড়বে।
সদরঘাটে দায়িত্ব পালনরত বিআইডব্লিউটিএর ট্রাফিক ইন্সপেক্টর জহিরুল ইসলাম জানালেন, গতকাল ৮০টিরও বেশি লঞ্চ সদরঘাট টার্মিনাল ছেড়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। চাঁদপুর, শরীয়তপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের ৩৩টি রুটে এসব লঞ্চ চলাচল করবে। এখনো যাত্রীর চাপ কম থাকলেও সন্ধ্যার পর চাপ বাড়তে পারে।
গতকাল রাত সাড়ে ৮টায় লঞ্চ মালিক সমিতির মহাসচিব সিদ্দিকুর রহমান পাটুয়ারীর আক্ষেপ, আকাশ ভালো না হওয়ায় যাত্রী বাড়েনি। বৃষ্টি হলে এমনই হবে।
খুলনার ১৮ কিমি সড়কে দুশ্চিন্তা: ঈদযাত্রায় খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কে যানবাহনের চাপ কয়েক গুণ। যাত্রীদের দুর্ভোগ-ভোগান্তি ও দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ কিলোমিটার। ১০ কিলোমিটারের কোথাও পিচ সরে তৈরি হয়েছে ঢেউ, কোথাও গেছে দেবে, কোথাও উঁচু, আবার কিছু অংশ খানাখন্দে ভরা। বাকি আট কিলোমিটারে মেরামতের নামে ইটের সোলিং বসালেও তৈরি হয়েছে ছোট-বড় গর্ত। এতে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে যানবাহন এবং গর্ত এড়াতে গিয়ে চলে যাচ্ছে ভুল লেনে, ঘটছে দুর্ঘটনা।
যাত্রী সোহাগ হোসেন ও রাজিউল বারী সৈকতের বর্ণনা, ঢাকা থেকে খুলনার জিরোপয়েন্ট পর্যন্ত যাত্রা স্বস্তিদায়ক। তবে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের খুলনা পল্লীবিদ্যুৎ অফিস থেকে চুকনগর বাজার পর্যন্ত ভোগান্তি ও দুর্ভোগের অন্ত নেই। তবে ইটের সোলিং দিয়েই দুর্ভোগ লাঘব হয়েছে বলে দাবি খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমূল হকের।
বরিশালে লঞ্চ-বাসে জিম্মি ঘরে ফেরা মানুষ: দক্ষিণাঞ্চলের নৌ ও সড়কপথে ঘরে ফেরা মানুষদের জিম্মি করছেন লঞ্চ এবং বাস মালিকরা। প্রতিদিনই উঠছে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ। নিয়মিত ভাড়ার তুলনায় কোনো বাসে দ্বিগুণ ভাড়াও নেওয়া হচ্ছে বলে যাত্রীদের আক্ষেপ। এ ছাড়া লঞ্চে বেশি নেওয়া হচ্ছে কেবিনপ্রতি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা।
ঈদের ছুটিতে বরিশালের চরবাড়িয়ায় নিজ বাড়িতে আসতে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে হানিফ পরিবহনে কোনো টিকিট ছাড়াই রওনা হন জগলুল হায়দার। বাসের সব সিটই পূর্ণ ছিল। ভাঙা পর্যন্ত আসার পর তার কাছে ৬০০ টাকার আসনের ভাড়া নেওয়া হয় ১০০০ টাকা। একই অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন আরও কয়েক যাত্রী।
‘ঈদে আমাদের বাড়তি বেতন নেই। পরিবার ছেড়ে রাস্তায় থাকছি, তাই একটু বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। ঢাকা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ১৪০০ টাকা নিচ্ছি, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি’— সরল স্বীকারোক্তি খান পরিবহনের বাসচালক মো. সুলতানের।
লঞ্চেও একই চিত্র। মানামী লঞ্চের যাত্রী আলিসা ও জ্যাকব দম্পতির অভিযোগ— ডাবল কেবিনের ভাড়া ২২০০ টাকা হলেও আদায় করা হয়েছে ২৮০০ টাকা।
গাজীপুরে শ্রমিকদের ভোগাচ্ছে যানজট-বৃষ্টি: গতকাল সকাল থেকে গাজীপুরের ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহন এবং যাত্রীদের চাপ বাড়তে থাকে। দুপুরের দিকে তৈরি হয় যানজট। বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে দুর্বিষহ হতে থাকে পরিস্থিতি।
শেরপুরগামী যাত্রী রাসেল মিয়া জানালেন, ঈদে যানজট এবং দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে এক সপ্তাহ আগেই পরিবারের সদস্যদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। গত রবিবার কারখানা ছুটি হওয়ার পর গতকাল দুপুরে তিনি গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
রাজধানীতে কখন কোথায় ঈদের জামাত: রাজধানীতে ঈদের প্রধান জামাত হবে সকাল সাড়ে ৭টায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। সেখানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ঈদের নামাজ আদায় করবেন। আবহাওয়া প্রতিকূল হলে জাতীয় ঈদগাহের পরিবর্তে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে সকাল ৮টায় প্রধান জামাত হবে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, জাতীয় ঈদগাহ ছাড়াও জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে পাঁচটি জামাত হবে। প্রথম জামাত সকাল ৭টায়, দ্বিতীয় জামাত সকাল ৮টায়, তৃতীয় জামাত সকাল ৯টায়, চতুর্থ জামাত সকাল ১০টায় এবং পঞ্চম ও শেষ জামাত হবে বেলা পৌনে ১১টায়। এ ছাড়া রাজধানীর গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদ, ধানমন্ডি ঈদগাহ ময়দান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে সকাল সাড়ে ৭টায় ঈদের জামাত হবে। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জামাত হবে সকাল ৮টায়।
দেশের ঐতিহ্যবাহী বড় জামাতগুলোর মধ্যে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে এবার হবে ঈদুল আজহার ১৯৯তম বড় জামাত। সকাল ৯টায় শুরু হওয়া এই জামাতে অংশ নিতে দূরদূরান্ত থেকে মুসল্লিরা আসবেন। তাদের যাতায়াতের সুবিধার্থে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস’ নামে দুটি বিশেষ ট্রেন চালু করেছে। জামাতকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
অন্যদিকে দিনাজপুরের ঐতিহাসিক গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানেও হবে ঈদুল আজহার প্রধান জামাত। সকাল ৯টায় শুরু হওয়া এই জামাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মুসল্লির সমাগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ৫২ গম্বুজের দৃষ্টিনন্দন এই ঈদগাহে রংপুর বিভাগসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ অংশ নেবেন। মুসল্লিদের যাতায়াত সহজ করতে এ রুটেও বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এদিকে ঈদের দিন বঙ্গভবনেও থাকবে বিশেষ আয়োজন। বেলা ১১টা ২০ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বঙ্গভবনের দরবার হলে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
ঈদের দিন যেমন থাকবে আবহাওয়া : আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঈদের দিন সারা দেশে গরম ও ভ্যাপসা আবহাওয়া থাকতে পারে। তবে দেশের কিছু কিছু অঞ্চলে বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে বৃষ্টির সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।
প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন আগামীর সময় প্রতিবেদক— ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও গাজীপুর






