বিবিএসের ভুল তথ্যে ভুল নীতির শঙ্কা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আওয়ামী লীগ সরকার আমলের কথা। সেসময় বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। সেটির এক-তৃতীয়াংশই ছিল জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে। সেখানে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, কিন্তু তার হিসাবের সঙ্গে রেলিভেন্ট (সম্পর্কিত) অন্যান্য বিষয়ের মিল নেই। অর্থাৎ যেসব বিষয়ে উন্নতি হলে তার প্রভাবে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে, সেসব সূচকে উন্নতি হয়নি।
তাহলে প্রবৃদ্ধি এত বেশি হচ্ছে কীভাবে? এটি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তখনকার পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তার তোপের মুখে পড়েছিলেন ওই সময়ের বাংলাদেশ মিশনসংশ্লিষ্টরা। বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফানকে ডেকে দেড় ঘণ্টা রাগ ঝাড়েন মন্ত্রী। এমনকি প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে যুক্ত বিশ্বব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেনকে চাকরি থেকে অবসর বা বদলি করে দেওয়ারও চাপ দেওয়া হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি সেরকম নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা কতটুকু বেড়েছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্যের মান আন্তর্জাতিক মানের নয়। আছে অনেক ফাঁকফোকরও। তবে চেষ্টা আছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির। এমন পরিস্থিতিতে আজ বছর ঘুরে এসেছে জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস। যদিও দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন করা হবে সরকারি ছুটির পর।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন সেই ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমাকে অফিসিয়ালি কিছু বলা না হলেও অন্য উৎস থেকে শুনেছি, তখনকার পরিকল্পনামন্ত্রী আমাকে অবসরে দিতে বলেছিলেন। অথবা অন্য কোনো দেশে বদলির কথা বলেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়নি।’
প্রশ্নের জবাবে জাহিদ হোসেন বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ আমল থেকে বর্তমান সরকারের শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আছে। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পরিসংখ্যানে খুব বেশি এদিক-সেদিক করা হতো না। কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে শুরু হয় নগ্ন হস্তক্ষেপ। এই সরকারের সময় এখনো সেরকম কিছু ঘটেনি। কিন্তু আগামীতে যে ঘটবে না, সেটি নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিছু মানুষ অতিমাত্রায় চামচাগিরি করতে গিয়ে হয়তো পরামর্শ দিতে পারে পরিসংখ্যানে হস্তক্ষেপ করাটাই প্রয়োজন।’
জাহিদ হোসেন বললেন, ‘তবে সরকারের বর্তমান অবস্থান ধরে রাখতে হবে। এজন্য বিবিএসের সঙ্গে রাজনীতির দূরত্ব তৈরি করতে হবে। বিবিএসকে স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতা দিতে হবে। কেননা, তথ্য সঠিক না হলে সরকারি নীতিনির্ধারণ ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক।’
দেশে সরকারি তথ্যে আস্থা কম। বাস্তবতার সঙ্গে খুব বেশি মেলে না সংগ্রহ করা পরিসংখ্যান। ফলে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সরকারের একমাত্র তথ্য সংগ্রহকারী সংস্থা হিসেবে তাদের তৈরি তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই সরকার করে নীতিনির্ধারণ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উদ্যোগ থাকলেও পরিসংখ্যান ব্যুরো সংস্কারের একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হয় অবহেলায় ও অজ্ঞাত কারণে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।
পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. ফিরোজ সরকার আগামীর সময়কে বলেছেন, এ-সংক্রান্ত নীতিমালার খসড়াটিতে বর্তমানে স্টেকহোল্ডারদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। এটি হলে অবাধ তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত হবে। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতির তথ্য সংগ্রহে পণ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে রিবেইজিং চলছে, পাশাপাশি চলছে ফরেনসিক অডিট। এটি হলে স্পষ্ট হবে কীভাবে, কোন তথ্যে হস্তক্ষেপ করা হয়েছিল। এখন সবগুলো জরিপ বা শুমারি ট্যাবের মাধ্যমে করা হচ্ছে, ফলে গণনাকারীদের ফাঁকি দেওয়ার দিন শেষ। সেই সঙ্গে বিবিএস প্রধান কার্যালয়ে স্থাপিত ‘নক রুম’ থেকে আমরা মাঠপর্যায়ের গণনাকারীর অবস্থান ও কার্যক্রম মনিটরিং করছি। ফলে তথ্য নিয়ে প্রশ্ন অনেকটাই কমে আসবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসন আমলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, মূল্যস্ফীতি, প্রত্যাশিত গড় আয়, বেকারত্বের হার, জনসংখ্যার চিত্র, দরিদ্রতার হার, বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের চিত্রসহ সামাজিক অনেক সূচক ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছিল তথ্য-উপাত্ত। এমনকি সংস্থাটির নিজের করা জরিপেও উঠে আসে আস্থাহীনতার চিত্র।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির কাছে খোদ ব্যুরোর কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছিলেন, রাজনৈতিক চাপে সঠিক তথ্য দিতে অসহায় ছিলেন তারা। ওই সময় দুর্নাম ঘোচানোর একটি বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্স সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমানকে সভাপতি করে একটি কমিটিও গঠন করা হয়। ওই কমিটি সংস্কারের নানা সুপারিশ দিলেও সেগুলো চাপা পড়ে যায়।
এর আগে প্রকাশিত বিবিএসের নিজের করা এক জরিপের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিবিএসের তথ্য ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশই পরিসংখ্যান বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না।
অন্তর্বর্তী সরকারের ভেস্তে যাওয়া উদ্যোগ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত টাস্ক ফোর্স বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর নাম বদলে ‘স্ট্যাটিসটিকস বাংলাদেশ’ (স্ট্যাট) এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধানের (বর্তমান ডিজি) পদ পরিবর্তন করে ‘চিফ স্ট্যাটিসটিশিয়ান’ করাসহ নানা সুপারিশ দেয়। এ ছাড়া একটি কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হয়। এর সদস্য হবে সাতজন। এই কাউন্সিল পরিসংখ্যানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি চিফ স্ট্যাটিসটিশিয়ানসহ ক্যাডার কর্মকর্তাদের নিয়োগের বিষয়টি দেখবে। এ ছাড়া ব্যয় নিরীক্ষা তদারক করবে। এর নেতৃত্বে থাকবেন পরিকল্পনামন্ত্রী।
টাস্ক ফোর্সের দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, তথ্যের গরমিল এবং যেকোনো তথ্য প্রকাশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে পরিসংখ্যান আইন-২০১৩ সংশোধন করা হবে। সুপারিশে বলা হয়, দীর্ঘস্থায়ী কর্মী নিয়োগের অপব্যবহার এবং সব দুর্বলতা দূর করতে সাংগঠনিক কর্তৃপক্ষকে ১৬টি শাখায় সম্প্রসারণ এবং ৪৩৭টি নতুন উপজেলা-স্তরের পদ তৈরি করতে হবে। এরকম আরও অনেক সুপারিশ ছিল। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি।
তথ্যের দুয়ার খুলছে বিবিএস
এতদিন সরকারি অনেক তথ্যই ছিল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বিগডেটা ও মাইক্রোডেটার ক্ষেত্রে ছিল নানা বিধিনিষেধ। মোটা অঙ্কের টাকা ফি হিসেবে দিয়ে নিতে হতো ডেটা সেট। তথ্য পেতে এরকম নানা হয়রানি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তৈরি করা হচ্ছে ‘ডেটা ও মাইক্রোডেটা প্রকাশ ও প্রবেশাধিকার নীতিমালা ২০২৬’। এটির খসড়ার ওপর বর্তমানে নেওয়া হচ্ছে মতামত।
পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় ১৫ চ্যালেঞ্জ
সরকারি তথ্যের নির্ভরযোগ্যতার অভাবসহ ১৫টি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দেশের পরিসংখ্যান ব্যবস্থা। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) করা ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কে চিহ্নিত এই চ্যালেঞ্জগুলোর উল্লেখযোগ্য হলো— আইনগত আদেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃেত্ব অস্পষ্টতা, পেশাগত স্বাধীনতা ও শাসনব্যবস্থা সমস্যা, মূল জরিপ কার্যক্রমে অর্থায়ন সংকট, প্রতিবেদন প্রকাশের সময়সূচি ও সময়ানুবর্তিতা, গুণমান নিশ্চিতকরণ সিস্টেম উন্নয়ন এবং সমন্বয় করা। এ ছাড়া জিডিপি ও পরিসংখ্যানের জন্য গুণগত প্রশাসনিক তথ্যপ্রাপ্তি, সমন্বিত রেজিস্ট্রার ও ফ্রেম, ডিজিটাল ডেটা অবকাঠামোর অভাব এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ও পরিধি বৃদ্ধি।



