জ্বরে বিপর্যস্ত জীবন, কারণ এল নিনো!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অফিস শেষে গত বৃহস্পতিবার বাড়ি ফিরতেই শরীর কাঁপিয়ে জ্বর আসে রাজধানীর পুরান ঢাকার তামজিদ হোসেনের (২৭)। তিন দিনের তীব্র জ্বরের পুরো সময়ে তার শরীরে ছিল প্রচণ্ড ব্যথা, সঙ্গে মাথা ঝিমঝিম ও দুর্বলতা। তামজিদের জ্বর কমতেই বিছানায় পড়েন স্ত্রী জাহিদা আক্তার (২৫)।
ঢাকায় যখন জ্বরে কাতর এই দম্পতি, ঠিক সে সময়ই গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে খবর আসে তামজিদের মা এবং নানির জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার কথা। যাদের লক্ষণগুলোও ছিল একই ধরনের।
শুধু তামজিদ-জাহিদার পরিবার নয়, দেশের অসংখ্য মানুষ এ ধরনের লক্ষণ নিয়ে জ্বরে আক্রান্ত। স্কুলগুলোয় অনুপস্থিত শিশুরা, অফিস থেকে ছুটি নিতে হয়েছে অনেক কর্মজীবীকে। বিশেষ করে জ্বরের সঙ্গে শরীর ব্যথার যে লক্ষণ, সেটি রোগীদের বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, পরিবারের সদস্যদের কাউকে দিয়ে শুরু হলে একে একে বাড়ির সবাই আক্রান্ত হচ্ছেন। কারও জ্বর নেমে যাচ্ছে তিন দিনেই, কাউকে ভর্তি হতে হচ্ছে হাসপাতালে। সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় শিশু ও বয়স্করা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এ বছর এল নিনোর প্রভাবে তাপমাত্রা বেশি, যা বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস ছড়ানোর উপযোগী আবহাওয়া। সেটিও জ্বরাক্রান্তের সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার অন্যতম কারণ।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগর এবং তার ওপরের বায়ুমণ্ডলীয় অঞ্চলে তৈরি হওয়া আবহাওয়ার বিশেষ চক্র। এতে প্রশান্ত মহাসাগরের উপরিভাগের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ বছর এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বহু অঞ্চলে চরম আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক অঞ্চলে দেখা দিতে পারে খরাও। দেশে এখন যে উষ্ণ তাপমাত্রা বিরাজ করছে, তাও সেই এল নিনোরই ফলাফল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক লেলিন চৌধুরী বললেন, ‘এ বছর জ্বরের রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এল নিনোর প্রভাবে তাপমাত্রা বেশি থাকায় মৌসুমি জ্বরে তুলনামূলক বেশিসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। আবার বায়ুদূষণের কারণে অতি সংবেদনশীল শ্বাসতন্ত্রে সহজেই সংক্রমণ হচ্ছে। পাশাপাশি হামের প্রকোপের কারণে সৃষ্ট ইমুইন অ্যামনেশিয়ার আক্রান্ত মানুষের মধ্যেও বাড়ছে ইনফ্লুয়েঞ্জায় সংক্রমিত হওয়ার শঙ্কা।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একাধিক প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশ জুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। তাপপ্রবাহের ঘটনা বাড়ায় সেই ঝুঁকি হয়ে উঠছে আরও তীব্র। যাতে তাপজনিত শারীরিক চাপ, অসুস্থতা, পানিশূন্যতা এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে।
সময় অনুযায়ী এখন ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম, যেটির ব্যাপ্তি এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর। পাশাপাশি এল নিনোর কারণে গরম আবহাওয়ায় সুবিধাজনক পরিবেশ পেয়ে সংক্রমণ ঘটাচ্ছে বেশ কিছু ভাইরাসও। দেশে আগে থেকেই ছিল হাম-ডেঙ্গুর প্রকোপ, পাশাপাশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে অনেকে। সব মিলিয়ে দেশের বিশাল অংশের মানুষ নাজুক অবস্থায় রয়েছে। সবগুলোই জ্বরাক্রান্তের সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার কারণ।
বর্তমান বাংলাদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জাকে গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা বলে উল্লেখ করলেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন। তিনি বলছিলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস (আরএসভি) সক্রিয় হয়ে ওঠে, যার প্রভাবে জ্বরে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে যায়। এবার অ্যাডেনো ভাইরাসের দেখাও মিলেছে, যদিওবা এর ব্যাপকতা এখনই বলা যাচ্ছে না। এ সময় শ্বাসতন্ত্রের নানান রোগও বেড়ে যায়।’
২০০৭ সাল থেকে হাসপাতালভিত্তিক ইনফ্লুয়েঞ্জা নজরদারি করে আইইডিসিআর। ২০২৫ সালে প্রকাশিত আইইডিসিআরের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইনফ্লুয়েঞ্জার লক্ষণ আছে এমন ১০০টি নমুনার মধ্যে ১৬ শতাংশ ইনফ্লুয়েঞ্জা ছিল। ইনফ্লুয়েঞ্জা মৌসুমে এ হার ২৭ শতাংশ, জুন থেকে জুলাইয়ে মাসভেদে সর্বোচ্চ ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। এ বিশ্লেষণে মে ২০০৭ থেকে জুলাই ২০২৪ পর্যন্ত পরীক্ষিত ১৮ হাজার ৯০৫টি নমুনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ইনফ্লুয়েঞ্জা আক্রান্ত রোগীদের ২১ দশমিক ৭ শতাংশের বয়স ছিল ৫ থেকে ২৫ বছর।
একই সময়ে ৪৮ হাজার ৩৬২ জন তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের (এসএআরআই) রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা হয়। তাদের মধ্যে ১৫ দশমিক ৬ শতাংশে ইনফ্লুয়েঞ্জা শনাক্ত হয়েছে। ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুমে এসএআরআই রোগীদের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা শনাক্তের হার ছিল ২৩ শতাংশ আর সর্বোচ্চ মাসিক হার ৫৭ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে।
বরিশালের গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার মোহাম্মদ টিপু সুলতান জানালেন রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ার কথা। সব রোগীকে দেখতে গিয়ে গতকাল বিকাল সোয়া ৪টা পর্যন্ত অফিস করতে হয়েছে তাকে। পুরো দিনে কমবেশি ১৫০ রোগী দেখেছেন। এ চিকিৎসক বলছিলেন, ‘রোগীদের বড় অংশই এসেছে জ্বর-হাঁচি-কাশি নিয়ে।
এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই হবে কমন ভাইরাল জ্বরের রোগী। হাম-ডেঙ্গু-টাইফয়েডের রোগীও আছে।’ কাছাকাছি রকমের অভিজ্ঞতার কথা জানালেন রাজধানী শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলামও। তিনি বললেন, ‘হাম-ডেঙ্গুর দ্বৈত চাপ সামলাতে দিশাহারা। এর মধ্যেই জ্বরের কারণে নতুন করে রোগীর চাপ বাড়ছে। শয্যা সংকটের কারণে অনেক রোগী ভর্তি নেওয়া যাচ্ছে না।’
গত ২৪ ঘণ্টায় এ হাসপাতালের বহির্বিভাগে ১ হাজার ৫০৫ রোগী এসেছে। এর মধ্যে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে ৩৭৯ শিশু, সার্জারিতে ২১০ এবং ৮৬৩ মেডিসিনে। মেডিসিনের রোগীদের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু জ্বর-কাশিতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এসেছে বলে জানালেন এ পরিচালক।
আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, আগে ইনফ্লুয়েঞ্জাকে মূলত নভেম্বর থেকে জানুয়ারির শীতকালীন রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে সাম্প্রতিক হাসপাতালভিত্তিক নজরদারি তথ্য সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। বর্তমানে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরকে বাংলাদেশের প্রধান ইনফ্লুয়েঞ্জা মৌসুম হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর পেছনের অন্যতম কারণ জলবায়ুর পরিবর্তন। অবশ্য ২০০০ সালের পর থেকেই ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী আসতে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়ে আসছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫ দশমিক ৮ এবং সর্বনিম্ন ২৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি েসলসিয়াস। আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম জানালেন, দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য আগের তুলনায় বেড়েছে। এ অবস্থায় জ্বর এড়াতে খুব গরম পরিবেশ থেকে হুট করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রবেশ না করা ও ঠান্ডা পানি গলায় ঢেলে ঢকঢক করে না খাওয়ার পরামর্শ দিলেন ডা. লেলিন চৌধুরী। জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি বিশ্রাম ও বেশি বেশি তরল খাবার গ্রহণেরও পরামর্শ তার।
হামে মৃত্যু ১০২২: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে হামে আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ২২ জন মারা গেছে। মৃতের বেশিরভাগই শিশু। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে তিনজন, যাদের দুজনই ঢাকায়। এ সময়ে হাম নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ৯৬৮ জন। আর মার্চ থেকে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এসেছে ১ লাখ ৯১ হাজার ৬১২ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যু সবচেয়ে বেশি ঢাকায়।
ডেঙ্গুতে মৃত্যু ১৪৯: চলতি বছরে মশাবাহিত এ রোগে মারা গেছে ১৪৯ জন, এর মধ্যে নারী ৭৬ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে ৬ জন, হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৫৬১ জন। চলতি বছরে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৫১ হাজার ৮৩৭ জন। হামের মতো ডেঙ্গুতেও আক্রান্ত ও মৃত্যু বেশি ঢাকায়।



