ডেঙ্গুর ছায়ায় ফিরছে চিকুনগুনিয়া
- চলতি বছর কোনো সরকারি তালিকা করা হয়নি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ডেঙ্গুর প্রকোপ যখন সারা দেশে বাড়ছেই, তখন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরেকটি নীরব বিপদের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন— চিকুনগুনিয়া। দুটি রোগই এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে খুব সহজেই চিকুনগুনিয়ার নতুন ঢেউ দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, তখন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে একসঙ্গে দুটি মশাবাহিত রোগের চাপ সামলাতে হবে।
এই যখন অবস্থা, তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বছরে চিকুনগুনিয়ার কোনো সমন্বিত তথ্যভাণ্ডারই তৈরি করা হয়নি। বর্তমানে নিয়মিত শুধু ডেঙ্গুর তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এখন পর্যন্ত কোনো হাসপাতাল বা জেলা থেকে চিকুনগুনিয়া শনাক্তকরণ কিটের চাহিদাও আসেনি বলে অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার উপপরিচালক ডা. মাকসুদা খানম আগামীর সময়কে বলেছেন, এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে চিকুনগুনিয়া আক্রান্তের কোনো সমন্বিত তালিকা তাদের কাছে আসেনি। তিনি বিষয়টি নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। ওই কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, বর্তমানে ডেঙ্গু আক্রান্তের তথ্য নিয়মিতভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আসছে এবং তা নথিভুক্ত করা হচ্ছে। তবে চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে এখনো সেভাবে কোনো তথ্য সংগ্রহ বা নথিভুক্ত করা হচ্ছে না।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে ডিসেম্বর— মাত্র ৮ মাসে দেশে ১৯ হাজার ৪৯০ জন চিকুনগুনিয়া রোগী শনাক্ত হন। সবচেয়ে বেশি রোগী ছিলেন ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে। বর্ষাকালে পরিষ্কার জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার বাড়ায় ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বাংলাদেশে ২০১৭ সালের বড় প্রাদুর্ভাবের পর কয়েক বছর রোগটি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে ২০২৪ সালে ৭ বছর পর ঢাকায় আবার চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হয়। এরপর ২০২৫ সালে সংক্রমণ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এবারও কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ না হলে গত বছরের পরিস্থিতি ফিরে আসতে পারে।
তবে সরকারি হিসাবই পুরো বাস্তবতা তুলে ধরে না বলে মনে করেন কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার। তার মতে, সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরীক্ষার কিট না থাকায় অনেক রোগী শনাক্তই হননি। সহজলভ্য পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু হলে প্রকৃত সংক্রমণের চিত্র জানা যাবে এবং রোগীরাও দ্রুত চিকিৎসা পাবেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় জানিয়েছে, ওই বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সন্দেহভাজন ৩৯৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১৩৮ জনের শরীরে চিকুনগুনিয়া ভাইরাস নিশ্চিত করা হয়। আক্রান্তদের প্রায় সবার জ্বর ছিল। ৯৭ দশমিক ৮ শতাংশের তীব্র গিঁটে ব্যথা, ৮৩ দশমিক ২ শতাংশের পেশিতে ব্যথা এবং ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশের মাথাব্যথা ছিল। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, আক্রান্তদের ৯৬ শতাংশের গিঁটের ব্যথা তিন থেকে চার সপ্তাহ পরও কমেনি; অনেকেই দীর্ঘদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রথম চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হয় ২০০৮ সালে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে। পরে কয়েক দফা ছোট প্রাদুর্ভাবের পর ২০১৭ সালে ১৭ জেলায় বড় আকারে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। গবেষকদের ধারণা, সরকারি হিসাবের বাইরেও তখন বিপুলসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী বলেছেন, চিকুনগুনিয়ায় মৃত্যুহার কম হলেও ভোগান্তি দীর্ঘস্থায়ী। শিশু, বয়স্ক এবং ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া বা খেতে না পারার মতো জটিল উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
এদিকে গত মাসে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে ৩১ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটি পুনর্গঠন করেছে সরকার। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, কমিটি গঠনের পরও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল বললেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া একই মশার মাধ্যমে ছড়ায়। তাই ডেঙ্গু বাড়লে চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। বর্তমানে কার্যকর ভ্যাকসিনের সীমাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা।
তার মতে, শুধু ফগিং করে এডিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বছর জুড়ে লার্ভা ধ্বংস, নিয়মিত এডিস জরিপ, নির্মাণাধীন ভবন ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি এবং জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। মশা নিধনের ওষুধ কার্যকর কি না— সেটিও নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়াও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে।




