উষ্ণ রাতে অনিদ্রার মহামারী
বছরে ৮৪ ঘণ্টা ঘুম হারাচ্ছেন নগরবাসী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জলবায়ু পরিবর্তনের বিষাক্ত ছোবলে শুধু পরিবেশের ভারসাম্যই নষ্ট হচ্ছে না, বরং কেড়ে নেওয়া হচ্ছে মানুষের রাতের প্রশান্তির ঘুম। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ক্লাইমেট সেন্ট্রাল’-এর সাম্প্রতিক সময়ের এক প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের বড় শহরগুলোর বাসিন্দারা এখন বছরে ৭২ থেকে ৮৪ ঘণ্টা পর্যন্ত স্বাভাবিক ঘুম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। গত পাঁচ দশকে তাপমাত্রাজনিত এই ঘুমের ক্ষতি বেড়েছে অন্তত দ্বিগুণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের ক্ষতির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। সেখানকার বাসিন্দারা বছরে গড়ে ৮৪ ঘণ্টা ঘুম হারাচ্ছেন। তালিকার পরবর্তী শহরগুলোর মধ্যে খুলনা (৭৯ ঘণ্টা), ঢাকা ও রাজশাহী (৭৬ ঘণ্টা), গাজীপুর ও কুমিল্লা (৭৪ ঘণ্টা) এবং রংপুর (৭২ ঘণ্টা)। ঢাকার ভেতরের চিত্রও বেশ উদ্বেগজনক; মিরপুর ও পল্লবী এলাকার মানুষ বছরে ৭৭ ঘণ্টা এবং মোহাম্মদপুরের বাসিন্দারা ৭৩ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুমের ঘাটতিতে ভুগছেন।
অতীতের তুলনায় দ্বিগুণ ক্ষতি
বিশ্লেষণ বলছে, ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫ সালের তুলনায় বর্তমানে পরিস্থিতি ভয়াবহ। সেই সময়ে ঢাকায় ও রাজশাহীতে তাপমাত্রাজনিত ঘুমের ক্ষতির মাত্র ৩ শতাংশ ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। ২০২০-২০২৫ সময়ে তা বেড়ে ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কুমিল্লা ও রংপুরের পরিস্থিতি আরও শোচনীয়। সেখানে এই হার ১৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
জনস্বাস্থ্যে নীরব বিপর্যয়
গবেষকদের মতে, রাতে তাপমাত্রা বেশি থাকলে শরীর দিনের তাপ থেকে সেরে ওঠার সুযোগ পায় না। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে হৃদরোগ, স্ট্রোক, মানসিক অস্থিরতা ও কর্মক্ষমতা হ্রাসের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু, গর্ভবতী নারী এবং নিম্ন আয়ের মানুষ যাদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে থাকার সুযোগ নেই, তারাই সবচেয়ে ঝুঁকিতে।
গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ অ্যালায়েন্সের চেয়ারম্যান ডা. কোর্টনি হাওয়ার্ড বলেছেন, ‘সুস্থ থাকতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম অপরিহার্য। উষ্ণ রাত বাড়তে থাকায় ঘুমের ব্যাঘাত এখন জাতীয় জনস্বাস্থ্য সমস্যা।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতির উত্তরণে কেবল অভিযোজন ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো, নগর পরিকল্পনায় ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব হ্রাস করা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য শীতলীকরণ সুবিধা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। জীবাশ্ম জ্বালানি পরিহার করে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর না হলে, আগামী দিনগুলোতে ঘুমের এই সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।




