লবণাক্ততায় বিপন্ন নারীস্বাস্থ্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দিনের আলো ফুটতেই উপকূলের নারীরা নেমে পড়েন দৈনন্দিন কাজে। কারও হাতে কাপড় ধোয়ার ঝুড়ি, কেউ গোসলের জন্য যাচ্ছেন পুকুরে, আবার কেউ জীবিকার তাগিদে নামছেন নদীতে। কিন্তু যে পানি তাদের জীবন ও জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেই পানিই নীরবে হয়ে উঠছে তাদের শরীরের জন্য এক অদৃশ্য হুমকি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বাড়তে থাকা লবণাক্ততা শুধু পরিবেশ ও কৃষির জন্য নয়, নারীদের স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতের জন্যও বড় সংকট তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন উপকূলের নারী ও কিশোরীরা।
গত মার্চে স্কোপাস র্যাংকিংভুক্ত হেলথ সায়েন্স রিপোর্ট জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ নারী ঋতুস্রাবজনিত বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। এসব সমস্যা তাদের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, কর্মক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।
‘এক্সপ্লোরিং দ্য ইনফ্লুয়েন্স অব স্যালিনিটি ইনট্রুশন অন দ্য ফিজিক্যাল অ্যান্ড মেনস্ট্রুয়াল হেলথ প্রবলেম অব উইমেন ইন কোস্টাল বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি করেছে রিসার্চ অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটেড থটস (আরআইটি) বাংলাদেশ। গবেষণার জন্য চাঁদপুর সদর ও খুলনার পাইকগাছা উপজেলার ২৮০ নারী এবং কিশোরীর ওপর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৬১ দশমিক ৪ শতাংশ ছিলেন প্রাপ্তবয়স্ক নারী এবং ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ কিশোরী।
গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত লবণাক্ততা শরীরে পানিশূন্যতা সৃষ্টি করতে পারে, যা হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্যকে ব্যাহত করে। এর ফলে ঋতুচক্র অনিয়মিত হয়ে পড়া, ব্যথা ও অস্বস্তি বৃদ্ধি পাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে এসব সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করার আশঙ্কাও রয়েছে।
গবেষণার তথ্য বলছে, লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে অংশগ্রহণকারী নারীদের ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ চুল পড়ার সমস্যায় ভুগছেন। এ ছাড়া লবণাক্ত পানি পান করার ফলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে, অন্তঃসত্তা নারীদের ক্ষেত্রে প্রি-এক্লাম্পসিয়া ও জেসটেশনাল হাইপারটেনশনের মতো জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বেশি। একই সঙ্গে ডায়রিয়া, আমাশয় ও কলেরার মতো পানিবাহিত রোগও উপকূলীয় অঞ্চলে তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ নারী তাদের ঋতুস্রাবজনিত সমস্যার জন্য কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ নেন না। সচেতনতার অভাব, সামাজিক সংকোচ এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ এর অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন গবেষকরা।
কিন্তু লবণাক্ততা ও ঋতুস্রাবজনিত সমস্যার সরাসরি সম্পর্ক নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে। পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গাইনোকোলজিস্ট সুজন কুমার সরকার বলেছেন, লবণাক্ততার কারণে সরাসরি ঋতুস্রাব সমস্যা হয়— এমন সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক জিএম তারিকুল ইসলাম মনে করেন, লবণাক্ত পানির দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ নারীদের বিভিন্ন প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
আরআইটির সহকারী গবেষক মোহাম্মদ শাহীন আলম বলেছেন, নিরাপদ পানির ঘাটতি দূর করার পাশাপাশি নারীস্বাস্থ্য সেবা, মোবাইল ক্লিনিক এবং মাসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, অতিরিক্ত লবণযুক্ত পানি পান ও ব্যবহার করায় স্থানীয়দের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, হরমোনজনিত সমস্যা এবং পেটের নানা রোগ দেখা দিচ্ছে। এ সংকট মোকাবিলায় শুধু পান করার জন্য নয়, বরং ধোয়ামোছা, গোসলসহ দৈনন্দিন সব কাজে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।




