নিম্ন আয়ের বড় অংশ থাকে ডেঙ্গু পরীক্ষার বাইরে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারি পরিসংখ্যান কি ডেঙ্গুর প্রকৃত চিত্র তুলে ধরছে? স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে চলতি বছর এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ২২ হাজার ৪৪৩ এবং মৃত্যু হয়েছে ৬৫ জনের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতাল ও রোগ নির্ণয় কেন্দ্র থেকে তথ্য না আসা, তথ্য পাঠাতে বিলম্ব এবং মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের দুর্বলতার কারণে সরকারি হিসাবে ডেঙ্গুর পুরো চিত্র উঠে আসে না। শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক তথ্যের ওপর নির্ভর করায় একটি বড় জনগোষ্ঠী হিসাবের বাইরে থেকে যায়। বিশেষ করে বস্তি ও নিম্ন আয়ের এলাকায় জ্বরে আক্রান্ত অনেকেই হাসপাতালে যান না। সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষা বিনামূল্যে হলেও অনেকে জানেন না।
আবু জামিল ফয়সালের পরিবার পরিকল্পনা, প্রজনন স্বাস্থ্য, মাতৃস্বাস্থ্য এবং টিকাদান কর্মসূচিসহ জনস্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তিন দশকের। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, অনেক হাসপাতাল থেকে দিনের তথ্য দু-তিন দিন পর কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পৌঁছায়। ফলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য যথাসময়ে সরকারি হিসাবে যুক্ত না হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তার ভাষ্য, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও তথ্য প্রবেশ করানোর দায়িত্বে থাকা কর্মীদের
প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং গাফিলতিও সমস্যাকে জটিল করছে। নির্দিষ্ট কয়েকটি হাসপাতাল থেকে নিয়মিত তথ্য আসায় সরকারি তালিকায় বারবার সেসব প্রতিষ্ঠানের নামই দেখা যায়। অন্য হাসপাতাল থেকে তথ্য না এলে সেখানে কতজন রোগী ভর্তি হয়েছেন বা কতজন মারা গেছেন, তার পূর্ণ হিসাব পাওয়া কঠিন।
বেসরকারি হাসপাতাল ও রোগ নির্ণয় কেন্দ্রের তথ্য নিয়েও রয়েছে বড় ঘাটতি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বললেন, অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যথাযথভাবে তথ্য না দেওয়ায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তালিকায় প্রকৃত রোগীর সংখ্যা পুরোপুরি প্রতিফলিত হচ্ছে না। এর সঙ্গে জনবল ও পরিসংখ্যান কর্মীর সংকটও দুর্বল করছে তথ্য ব্যবস্থাপনাকে।
তার মতে, শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোকে তথ্য দিতে বললেই হবে না; তথ্য দেওয়ার প্রক্রিয়াও সহজ করতে হবে। নিয়মিত ও সময়মতো তথ্য দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহ এবং স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে লাইসেন্সপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য দেওয়ার আইনগত বাধ্যবাধকতাও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বর্তমানে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের তথ্য সিভিল সার্জনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে যায়। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সরকারি পরিসংখ্যানে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল এবং হাসপাতালের ধরন আলাদাভাবে উল্লেখ করা হলে কোথায় কত রোগী শনাক্ত ও ভর্তি হচ্ছেন, তা আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যাবে।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানেও উদ্বেগ বাড়ছে। জুনে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯০৭। জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬। আগস্টের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৭ হাজার ১৩৩ জন। জুনে মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের, জুলাইয়ে ৩৬ এবং আগস্টে ১১ জনের। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন— সরকারি হিসাবে যে সংখ্যা পাওয়া যাচ্ছে, তার বাইরে কত রোগী রয়ে যাচ্ছেন?
ডেঙ্গুর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আক্রান্ত ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের পার্থক্য। পুরুষরা আক্রান্ত হচ্ছেন বেশি, কিন্তু মৃত্যুর হার নারীদের মধ্যে বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে চলতি বছর আক্রান্ত ২২ হাজার ৪৪৩ জনের মধ্যে পুরুষ ১৩ হাজার ৮৮৬ এবং নারী ৮ হাজার ৫৫২ জন। অর্থাৎ আক্রান্তদের প্রায় ৬২ শতাংশ পুরুষ। কিন্তু মৃত্যুর ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ৬৫ মৃত্যুর মধ্যে নারী ৪১ এবং পুরুষ ২৪ জন। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর ৬৩ দশমিক ১ শতাংশ নারী।
ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, এর পেছনে নারীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা নিতে দেরি করা, সামাজিক অবহেলা এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি ভূমিকা রাখতে পারে। পুরুষদের বাইরে চলাচল বেশি হওয়ায় মশার সংস্পর্শে আসার সুযোগও বেশি। অন্যদিকে, অনেক নারী জ্বর বা অসুস্থতার শুরুতে চিকিৎসা না নিয়ে ঘরের কাজ চালিয়ে যান। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্তও পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর নির্ভর করে। ফলে হাসপাতালে যেতে দেরি হলে রোগ জটিল হয়ে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।
ডা. মুশতাক হোসেন বললেন, ডেঙ্গুর প্রকৃত চিত্র জানতে হলে শুধু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ করলেই হবে না। কোথায় কতজন পরীক্ষা করেছেন, কতজনের ফল পজিটিভ এসেছে, কতজন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, কতজন বাড়িতে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং কোন এলাকায় কত মৃত্যু হয়েছে— এসব তথ্যও নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
পরিসংখ্যান বলছে, তরুণদের মধ্যেই ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বেশি। চলতি বছর ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ১৩১ এবং ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে ৩ হাজার ১৪০ জন। ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৯৬৯ জন। অর্থাৎ ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যেই আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। বিভাগভিত্তিক হিসাবেও ঢাকায় সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছেন— ৮ হাজার ৭৪৮ জন। এরপর বরিশালে ৪ হাজার ১৭২, চট্টগ্রামে ৩ হাজার ৭৫১ এবং খুলনায় ২ হাজার জন। ময়মনসিংহে ১ হাজার ১৯, রাজশাহীতে ১ হাজার ১২, রংপুরে ৬৫১ এবং সিলেটে ১৩১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যুতেও ঢাকা এগিয়ে। এ বিভাগে মারা গেছেন ৩০ জন। খুলনায় ১১, বরিশালে ৮, ময়মনসিংহে ৬, চট্টগ্রামে ৫, রাজশাহীতে ৩ এবং রংপুর ও সিলেটে একজন করে মারা গেছেন।






