রাজনীতিতে নারীদের জন্য আরও জায়গা চান শামা ওবায়েদ

ছবি: পিআইডি
ভাষা আন্দোলন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ—দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নারীদের অবদান রয়েছে। তারপরও সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে এসে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
তিনি বলেন, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সামাজিক পরিবর্তনও। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরে নারী-পুরুষের সমতার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। রাষ্ট্র একা এ সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক সিডও দিবস-২০২৬ উপলক্ষে এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আয়োজনে এ সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম।
‘যোগ্যতা অনুযায়ী নারীদের রাজনীতিতে জায়গা দিতে হবে’
রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে নারীদের ত্যাগ, তিতিক্ষা ও রাজনীতি জড়িয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধসহ সব ক্ষেত্রেই নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীদের সরাসরি অংশগ্রহণ এখনো যথেষ্ট নয়।
‘যোগ্যতা অনুযায়ী নারীদের রাজনীতিতে জায়গা দিতে হবে। নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা রাজনীতিতে আসছে, যা ইতিবাচক। তবে মাঠের রাজনীতিতে তরুণীদের অংশগ্রহণ এখনো তুলনামূলকভাবে কম। এ ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের মধ্যে নারী-পুরুষের সমতা নিয়ে আরও সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন’—যোগ করেন শামা ওবায়েদ।
ডিজিটাল হয়রানি বন্ধে উদ্যোগ প্রয়োজন
ডিজিটাল পরিসরে নারীদের হয়রানি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। বললেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন মূলধারার গণমাধ্যমের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ প্রচলিত গণমাধ্যমের চেয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি মনোযোগ দেয়। একই সঙ্গে এ পরিসরে নারীদের বিরুদ্ধে হয়রানিও ব্যাপক বেড়েছে।
কসমেটিকস মেলায় রিমার্কের পণ্যের প্রশংসা করলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শামা ওবায়েদ বলেন, ডিজিটাল হয়রানি এখন কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অনেক সময় দেশের সীমানা পেরিয়ে এ ধরনের হয়রানি ছড়িয়ে পড়ে। তাই এটি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
ডিজিটাল পরিসরে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে ঢাকায় একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। পরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের সময় বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট নারী সংগঠনগুলোর সহযোগিতা চান শামা ওবায়েদ।
শুধু অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নয়, নিরাপত্তাও জরুরি
নারীর ক্ষমতায়নকে শুধু অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না সরকার—এ কথা উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, নারীর নিরাপদ চলাচল ও জীবনযাপনও নিশ্চিত করতে হবে। নারীর উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তারা নিরাপদে বাঁচতে পারবেন এবং অন্যায়ের শিকার হলে দ্রুত ন্যায়সংগত বিচার পাবেন।
নারী ও শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান দৃঢ় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সম্প্রতি শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ১৯ দিনের মধ্যে রায় দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামে চার বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের মামলায়ও আট কর্মদিবসে বিচার সম্পন্ন হয়েছে।
তবে শুধু আলোচিত কয়েকটি মামলায় দ্রুত বিচার নয়, প্রতিটি নারী ও শিশুর জন্য দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
জেন্ডার বাজেটে ৩ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, এবারের জেন্ডার বাজেটে ৩ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের প্রায় ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ। নারী শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কর্মসংস্থান ও নারীদের জন্য সহায়ক সেবা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো এতে গুরুত্ব পাবে।
ফ্যামিলি কার্ডের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গ্রামীণ নারীরা কৃষিকাজসহ পরিবারের নানা কাজে যুক্ত থাকলেও অনেক সময় তাদের হাতে সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা থাকে না। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সরকারি সহায়তা সরাসরি নারীর হাতে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে তারা পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি সংকটের সময় অর্থটি নিজেদের প্রয়োজনেও ব্যবহার করতে পারবেন।
নারীর নিরাপত্তায় আলাদা বাস চালুর উদ্যোগের সমালোচনার প্রসঙ্গ তুলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, নারীদের নিরাপত্তার জন্য সরকারকে নতুন নতুন ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে। শুধু অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করাই যথেষ্ট নয়, নিরাপদ পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রবাসী নারীদের বিষয়ে সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে আন্তঃমন্ত্রণালয় ফোকাল টিম গঠন করা হয়েছে। বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি নিবেদিত অভিবাসন শাখাও খোলা হয়েছে।
বিদেশে নারীদের জন্য দক্ষ শ্রমিক তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, নার্সিং, পরিচর্যাসহ বিভিন্ন পেশায় দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারীরা যেন সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বিদেশে গিয়ে কাজ করতে পারেন, সেটিই সরকারের লক্ষ্য।
সিডও বাস্তবায়নে সরকার-নাগরিক সমাজের প্রচেষ্টা জরুরি
কনভেনশন অন দ্য ইলিমিনেশন অব অল ফরমস অব ডিসক্রিমিনেশন এগেইনস্ট উইমেন (সিডও) সনদের বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে শামা ওবায়েদ বলেন, এ সনদের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার দীর্ঘদিনের। আগামী বছর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিবেদন পর্যালোচনা হবে। এর মাধ্যমে দেশের অর্জন তুলে ধরার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হবে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিবেদনের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের স্বাধীন ও গঠনমূলক মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার ও নাগরিক সমাজের অংশীদারত্বমূলক প্রচেষ্টায় নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সিডও সনদের বাস্তবায়ন আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
সভায় বক্তব্য দেন, উইমেন ফর উইমেনের সভাপতি ও দীপ্ত ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জাকিয়া কে হাসান, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সালমা আলী, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের পরিচালক শাহনাজ সুমী, স্টেপস টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর চন্দন লাহিড়ী এবং উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিস ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আশরাফুন নাহার মিষ্টি প্রমুখ।







