স্বাস্থ্য নাকি স্বাদ, প্যাকেটই বলে দেবে সুস্বাস্থ্যের সিদ্ধান্ত
- অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারে ‘ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) চালুর দাবি

ছবি- আগামীর সময়
বাংলাদেশে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণের ফলে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে- এমন প্রেক্ষাপটে খাদ্যপণ্যের প্যাকেটের সামনের অংশে সহজবোধ্য সতর্কবার্তা বা ‘ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল)’ চালুর দাবি উঠে এসেছে জোরালোভাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থা চালু হলে ভোক্তারা সহজেই বুঝতে পারবেন কোন খাদ্যে অতিরিক্ত লবণ, চিনি বা ক্ষতিকর চর্বি রয়েছে, ফলে তারা স্বাস্থ্যকর খাদ্য বেছে নিতে সক্ষম হবেন।
রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ভবনে অনুষ্ঠিত “ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) বাংলাদেশে : প্রয়োজনীয়তা, অগ্রগতি ও করণীয়” শীর্ষক দুই দিনব্যাপী সাংবাদিক কর্মশালায় (১৫-১৬ এপ্রিল) তুলে ধরা হয় এসব তথ্য। গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)-এর সহযোগিতায় প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) আয়োজিত এ কর্মশালায় অংশ নেন দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের ২৯ জন সাংবাদিক।
কর্মশালায় বক্তারা জানান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণের কারণে। অতিরিক্ত চিনি, লবণ, স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। দেশে প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার মানুষ অসংক্রামক রোগে মারা যান, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ১৯ শতাংশই অকাল মৃত্যু। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে অন্যতম কারণ অনিরাপদ ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস।
কর্মশালায় আরও জানানো হয়, দেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার প্যাকেটজাত খাবার গ্রহণ করেন। কিন্তু এসব খাবারের পেছনের জটিল পুষ্টি তথ্য অধিকাংশ ভোক্তার পক্ষে বোঝা কঠিন। ফলে তারা খাদ্যের প্রকৃত পুষ্টিমান ও ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন না। এই প্রেক্ষাপটে প্যাকেটের সামনে স্পষ্ট সতর্কবার্তা সংযুক্ত করা হলে ভোক্তারা দ্রুত ও সহজে নিতে পারবেন সঠিক সিদ্ধান্ত।
দ্বিতীয় দিনের কর্মশালায়
বিশ্বের ৪৪টি দেশে ইতোমধ্যে এফওপিএল চালু হয়েছে, যার মধ্যে ১০টি দেশে এটি বাধ্যতামূলক। এসব দেশে গবেষণায় দেখা গেছে, ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে এবং কমেছে অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব জানান, সরকার ইতোমধ্যে ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুতই এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর অ্যাসোসিয়েট সায়েন্টিস্ট আবু আহমেদ শামীম বলেছেন, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ওপর নির্ভরতা কমাতে এফওপিএল কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এটি ভোক্তাদের স্বাস্থ্যকর খাদ্য বেছে নিতে সহায়তা করবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রোগ্রাম অফিসার সামিনা ইসরাতের ভাষ্য, এফওপিএল চালু হলে তা দেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্য পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমদ মনে করেন, এই নীতি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত গণমাধ্যমকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করে নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে।
জিএইচএআই-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুসের মতে, এফওপিএল বাস্তবায়ন করা গেলে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ কমবে এবং স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তি ও সরকারের ব্যয় হ্রাস পাবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রভাব ভবিষ্যতে আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত এফওপিএল বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।


